রবিবার ১২ জুলাই ২০২৬ - ১০:৩৮
শতাব্দীর এক অনন্য ঘটনা থেকে সাতটি কৌশলগত বার্তা / কেন শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া উম্মাহর অবিসংবাদিত অধিকার?

ইরানের সংবিধান রক্ষক পরিষদের (শুরায়ে নেগাহবান) ফকীহ সদস্য আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ আহমাদ খাতামি শহীদ ইমামের শোকানুষ্ঠানকে ‘শতাব্দীর এক অনন্য ঘটনা’ এবং ‘দ্বীন ও জাতির বন্ধনের প্রতিফলন’ বলে অভিহিত করেছেন। এক বার্তায় তিনি ইরান ও ইরাকে অনুষ্ঠিত এ শোকানুষ্ঠানে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের প্রশংসা জানিয়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর দৃষ্টিতে সাতটি কৌশলগত বার্তা তুলে ধরেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোমের হাওযা ইলমিয়ার শিক্ষক পরিষদের (জামে'আয়ে মোদাররেসিন) সদস্য আয়াতুল্লাহ খাতামি তাঁর এ ব্যাখ্যায় মৌলিক নীতিসমূহে ঐক্য রক্ষা এবং শত্রুর প্রতি বিরাগ ও বেলায়েতের উত্তরসূরির প্রতি আনুগত্যের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

আয়াতুল্লাহ খাতামির বার্তার পূর্ণপাঠ নিম্নরূপ:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ کُنْتُمْ مُؤْمِنِینَ. (آل‌عمران ۱۳۹)

তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৯)

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও ইরাকের জনগণের অংশগ্রহণে শহীদ ইমাম ও তাঁর পরিবারের মরদেহকে কেন্দ্র করে যে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা সত্যিই ‘শতাব্দীর এক অনন্য ঘটনা’ এবং দুই জাতির পারস্পরিক বন্ধনের এক চিরস্থায়ী প্রতিচ্ছবি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনাকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে নজিরবিহীন শোকযাত্রা’, ‘এক অতুলনীয় মহাকাব্যিক গণসমাবেশ’, ‘বিজয়ের কুচকাওয়াজ’, ‘দুই কোটিরও বেশি মানুষের উপস্থিতি’, ‘সমীকরণ পরিবর্তনকারী ঘটনা’ এবং ‘শত্রুর প্রচারযন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথের নির্ভীক উচ্চারণ’—এমন নানা অভিব্যক্তিতে বর্ণনা করা হয়েছে। এসবই ইসলামী ইরানে সংঘটিত এক বিস্ময়কর ঘটনার প্রতিফলন।

আমি এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অনন্য ঘটনার অন্তর্নিহিত বার্তাগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করা এবং সেগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষা করা। কারণ, এসব বার্তা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং সেগুলোর যথাযথ হেফাজত করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের প্রিয় দেশে যা ঘটেছে, তা ছিল এক ব্যাপক মহড়া—দ্বীনদারিত্ব, বেলায়েতের প্রতি আনুগত্য এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার মহড়া। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শত্রুপক্ষ বিকৃতি, মিথ্যাচার ও বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে এই প্রশংসনীয় পরিবেশকে নষ্ট করতে চায়। তাই এ ক্ষেত্রেও শত্রুকে ব্যর্থ করে দিতে হবে এবং এই পবিত্র পরিবেশের বার্তাগুলোর রক্ষক হতে হবে।

এই বার্তাগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ভালোবাসার বার্তা: জনগণ তাদের কথা ও কর্মের মাধ্যমে ঘোষণা করেছে যে, তারা দ্বীনের পতাকার নিচে অবিচল রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও অবিচল থাকবে।

২. মারজাইয়াত ও ইসলামী ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পৃক্ততার বার্তা: সম্মানিত মারজায়ে তাকলীদগণ বার্তা প্রদান এবং শহীদ ইমাম ও তাঁর পরিবারের মরদেহের ওপর জানাজার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে এ পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

৩. দ্বীন ও ইসলামী স্বদেশপ্রেমের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বার্তা: জনগণ সর্বান্তকরণে এমন এক মহান ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানিয়েছে, যিনি এ দুটি মূল্যবোধের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁকে দেশের প্রতি সর্বাধিক অনুরাগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করেছেন।

৪. বিপ্লবের প্রতি বিদ্বেষপোষণকারী শত্রুদের প্রতি ঘৃণা ও প্রতিশোধের বার্তা: এই অনুষ্ঠান ছিল শত্রুদের প্রতি জনগণের ঘৃণা ও অসন্তোষের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি। প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে উত্তোলিত লাল পতাকাগুলো এ বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করেছে যে, এই দাবি শুধু কুরআন ও ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতেই নয়, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও একটি স্বীকৃত ও অবিসংবাদিত অধিকার বলে বিবেচিত হয়।

৫. বেলায়েতের উত্তরসূরির প্রতি আনুগত্য পুনর্নবায়নের বার্তা—হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী; ‘সালিহের পর সালিহ’: তিনি এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ইসলামী বিপ্লবের দুই ইমামের পথ অব্যাহত রেখেছেন এবং এই পবিত্র পতাকাকে সর্বদা সমুন্নত রেখেছেন।

৬. মৌলিক নীতিতে ঐক্য—ইসলামী বিপ্লবের দুই ইমামের উত্তরাধিকার: ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রকৃত অর্থ কেবল মৌলিক নীতির ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হয়। মতপার্থক্য যতক্ষণ বিভেদ সৃষ্টি না করে, ততক্ষণ তা ক্ষতিকর নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমরা যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছি, তা হলো ‘মৌলিক নীতিতে ঐক্য’। এটাই সেই ঐক্য, যার প্রতি ইমাম খোমেনী এবং শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) সর্বদা আহ্বান জানিয়েছেন। তাই সর্বশক্তি দিয়ে এই ঐক্য রক্ষা করা উচিত।

৭. শহীদ ইমামকে সম্মান জানানোর অনুষ্ঠানে কুরআন ও আহলুল বাইতের (আ.) নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন: সাম্প্রতিক মাসগুলোর পবিত্র সমাবেশগুলোতে এবং শহীদ ইমামকে সম্মান জানানোর এই অনুষ্ঠানেও জনগণের প্রতিরোধ, অবিচলতা ও ক্লান্তিহীন মনোভাব এ সত্যকেই পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, এটাই কুরআন ও আহলুল বাইতের (আ.) শিক্ষা। নিঃসন্দেহে যে উম্মাহ ক্লান্তিকেও ক্লান্ত করে দিয়েছে এবং সুউচ্চ সারু বৃক্ষের মতো অবিচল দাঁড়িয়ে আছে, তারাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে।

পরিশেষে, আমি গভীর গর্বের সঙ্গে সেই উম্মাহর প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করছি, যারা ইসলাম ও আহলুল বাইতের (আ.) মাযহাবকে সম্মানিত ও সমুন্নত করেছে।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সাইয়্যিদ আহমাদ খাতামি

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha