মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬ - ১১:১৭
কেন শহীদ ইমামের প্রতিশোধ ও রক্তের পতাকা মাটিতে পড়ে থাকতে দেওয়া উচিত নয়?

অবশ্যম্ভাবী প্রতিশোধ কোনো হুমকি নয়; এটি নিপীড়িত মানুষের জন্য সুসংবাদ এবং সেই অপমানিত হত্যাকারীদের জন্য এক নিরবচ্ছিন্ন সতর্কবার্তা, যারা এখন থেকে প্রতিটি ভোরে নিজেদের টলোমলো ক্ষমতার দোলনার ওপর ‘ইয়া লিসারাত আল-খামেনেই’ (খামেনেইর রক্তের প্রতিশোধের আহ্বান) ধ্বনি শুনতে বাধ্য হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার সাম্প্রতিক বার্তায় গভীর কৌশলগত দিক রয়েছে। বিশেষ করে "জনগণের দাবি" এবং শহীদ নেতার পবিত্র রক্তসহ ১২ দিনের ও ৪০ দিনের আরোপিত যুদ্ধে নিহত সকল শহীদের রক্তের প্রতিশোধ "অবশ্যম্ভাবী" এই বিষয়ে তাঁর জোরালো বক্তব্য একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও সতর্কতামূলক। এই বার্তা আরও নির্দেশ করে যে বিদেশি শক্তি ও আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ কোনো ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সেই সরাসরি পথ, যা আমাদের শহীদ ইমাম ও নেতা নির্ধারণ করেছেন এবং যে পথে তাঁর অনুসারী ও প্রতিশোধপ্রত্যাশী উম্মাহ অঙ্গীকারবদ্ধ।

শহীদ ইমামের প্রতিশোধ: জাতীয় ঐক্যের শক্তি

সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ মোতাওয়ালিয়ান বলেন, এই বার্তার বাস্তবায়ন সর্বাগ্রে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদার করবে। সাম্প্রতিক বিদায় ও জানাজা অনুষ্ঠানে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে আমাদের জাতি হুসাইনি আদর্শ এবং জাতীয় ও বিপ্লবী মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সংহতির অবস্থানে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই বিষয়টি শত্রুদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা-অপরাধীরা "শান্ত মৃত্যুর স্বপ্ন নিয়ে কবরে যাবে।" এই সতর্কতার শিকড় শিয়া ইতিহাসে নিহিত। কারবালা থেকে আজ পর্যন্ত, নির্যাতিতের রক্ত উম্মাহকে আন্দোলিত করেছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ নেতার বার্তা প্রতিরোধের কৌশলও ব্যাখ্যা করে। শহীদের আদর্শ রক্ষা, কঠিন সময়ে অবিচল থাকা এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা-এসবই নতুন প্রজন্মের জন্য একটি স্পষ্ট পথনির্দেশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বার্তা ইসলামী উম্মাহর ঐক্যকে জাতীয় সীমানারও ঊর্ধ্বে গুরুত্ব দেয়।

চূড়ান্ত বিজয় আসন্ন

তিনি বলেন, যে দুষ্ট ও আগ্রাসী শত্রু সন্ত্রাস, নিষেধাজ্ঞা ও অপমানের মাধ্যমে এগিয়ে এসেছিল, সে আজ কোটি কোটি শোকাহত ও স্বাধীনতাকামী মানুষের পবিত্র ক্রোধের বেষ্টনীতে রয়েছে। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ নেতার বার্তা আজকের ইসলামী ইরানের প্রেক্ষাপটে আশুরার পুনরপাঠ। যেমন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর আন্দোলন বিশ্বকে প্রভাবিত করেছিল, তেমনি "ইরানের শহীদ নেতা"-র রক্তও শেষ পর্যন্ত বিজয় নিশ্চিত করবে।

মোতাওয়ালিয়ান বলেন, এই অবশ্যম্ভাবী প্রতিশোধ কোনো হুমকি নয়; এটি নিপীড়িতদের জন্য সুসংবাদ এবং অপমানিত হত্যাকারীদের জন্য এক নির্দয় সতর্কবার্তা। শত্রুদের জানা উচিত, এই জাতি তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ও বীরোচিত উপস্থিতির মাধ্যমে নিকটবর্তী বিজয় অর্জন করবে।

শহীদ নেতার দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করার প্রয়োজন

মোহাম্মদ মেইসাম নাদ্দাফপুর বলেন, গত এক দশকে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা বহুবার বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জোর দিয়ে বলেছেন যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের উচিত কেবল রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমের নিন্দায় সন্তুষ্ট না থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব আইনি সক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি অতীতের কিছু মামলায় অবহেলার কথাও উল্লেখ করেছিলেন এবং আইনি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এখন, যখন তিনি নিজেই জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অপরাধের শিকার হয়েছেন, তখন তাঁর সেই দাবির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এই শিক্ষক আরও বলেন, কেউ কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধের আইনি অনুসরণকে আনুষ্ঠানিক ও ফলহীন মনে করতে পারেন, কারণ এই প্রক্রিয়া বহু বছর সময় নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের দণ্ডিত নাও করতে পারে। কিন্তু তাঁর মতে, এই ধারণা আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির ফল। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আইনি পদক্ষেপ শুধু রায় পাওয়ার জন্য নয়; এটি ক্ষমতা প্রয়োগ, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি ঠেকানোরও একটি মাধ্যম। কোনো অপরাধ আইনি জবাব ছাড়া থেকে গেলে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হতে পারে এবং অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

নেতার হত্যাকারী ও ইরানের শহীদদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা

তিনি বলেন, যদি প্রতিশোধকে অপরাধীর ওপর অপরাধের মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা কেবল সামরিক উপায়ে অর্জিত হয় না; আইনও রাষ্ট্রের হাতে একটি কার্যকর অস্ত্র। অভিযোগ দায়ের, মামলা পরিচালনা, প্রমাণ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গঠন এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ও আইনি মূল্য বাড়ানো-এসবই আইনি প্রতিশোধের অংশ, যা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এবং অপরাধমূলক আচরণের বৈধতা অর্জন রোধ করতে পারে।

নাদ্দাফপুর বলেন, এই পদ্ধতির গুরুত্ব জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। অপরাধবিজ্ঞানের একটি স্বীকৃত নীতি হলো-শাস্তিহীনতা অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে তার কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য আইনি বা রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে না, তবে সে আবারও একই কাজ করতে উৎসাহিত হতে পারে। পাশাপাশি, দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের কার্যক্রমও আরও সংকুচিত হতে পারে। তাই আইনি অনুসরণ শুধু ন্যায়বিচারের দাবি নয়; এটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থারও একটি অংশ।

আমাদের নীরবতা অপরাধকে স্বাভাবিক করে তুলবে

তিনি আরও বলেন, এই আইনি অনুসরণের আন্তর্জাতিক প্রভাবও অভ্যন্তরীণ প্রভাবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, আন্তর্জাতিক আইন কেবল স্থির নিয়মের সমষ্টি নয়; এর বড় একটি অংশ রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রম ও ধারাবাহিক দাবির মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যখন আন্তর্জাতিক আইনের কিছু প্রচলিত কাঠামোর অকার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তখন বিশেষ করে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সক্রিয় ভূমিকা আরও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে, দেশের সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তার হত্যার ঘটনায় নীরবতা এই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তিকে দুর্বল করবে।

শেষে তিনি বলেন, এমন একটি মামলার কার্যকর অনুসরণ একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল ছাড়া সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে আইনি কর্তৃপক্ষ, কূটনৈতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, ধারাবাহিক জনদাবি এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ অত্যন্ত জরুরি। যদি এই অপরাধ কার্যকরভাবে অনুসরণ না করা হয়, তবে শাস্তিহীনতা আরও শক্তিশালী হবে, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা অধিক ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং রাষ্ট্রনেতাদের হত্যাকে স্বাভাবিক করার প্রবণতা আরও প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ধৈর্য, পরিকল্পনা ও শক্তিশালী আইনি ভিত্তির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া গেলে, শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, আইনের অঙ্গনেও একটি স্থায়ী দাবিতে পরিণত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha