মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬ - ১৪:৫০
আলোচনায় শত্রু শত্রুতা পরিত্যাগ করে না

ইরানের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও তেহরানের সাবেক জুমার ইমাম হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজেম সিদ্দিকী বলেছেন, তাকওয়াবান মানুষ কখনো দুনিয়ার মোহ ও চাকচিক্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ইরানের জাতি একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সব ধরনের চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও শত্রুদের মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থাই বিজয়ের একমাত্র পথ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তেহরানের ওজগল জামে মসজিদে নৈতিকতা বিষয়ক সাপ্তাহিক দরসে আখলাকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি নাহজুল বালাগার ১৯৩ নম্বর খুতবা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুত্তাকিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি। এ প্রসঙ্গে তিনি আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী (আ.)-এর বাণী উদ্ধৃত করেন: "দুনিয়া তাদের দিকে এগিয়ে আসে, কিন্তু তারা দুনিয়াকে কামনা করে না।"

তিনি বলেন, তাকওয়াবানরা উপলব্ধি করেন যে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সম্পদ, পদ-পদবি বা পার্থিব ভোগ-বিলাসে নির্ধারিত হয় না। বরং কেউ যদি অবৈধ সম্পদ, অবৈধ ক্ষমতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ কিংবা শয়তানি প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে সে নিজের চিরস্থায়ী কল্যাণকে বিসর্জন দেয়।

ধর্মীয় আদর্শের বিনিময়ে ক্ষমতা নয়
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, অনেক সময় মানুষকে দায়িত্ব, সম্পদ বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তার বিনিময়ে ধর্মীয় আদর্শ বিসর্জন দিতে হয়। আবার কখনো হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনার মতো প্রবৃত্তির ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রকৃত মুত্তাকিরা এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

তিনি বেহলুল, জাবির ইবনে ইয়াজিদ জুফি, সাইয়্যেদ আহমদ কারবালায়ী, আবু যার গিফারি এবং ফিরআউনের দরবারের মুমিন ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে বলেন, তারা প্রত্যেকেই দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন। কেউ ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করেছেন, কেউ অবৈধ সম্পদ প্রত্যাখ্যান করেছেন, কেউ সত্যের পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন, আবার কেউ জুলুমের কাছে মাথা নত করেননি।

জালিমের সঙ্গে সামান্য স্বার্থের সম্পর্কও অনুচিত
তিনি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এক ব্যক্তি হারুনুর রশীদের দরবারে হজযাত্রী পরিবহনের জন্য নিজের উট ভাড়া দিতেন। ইমাম মুসা কাজিম (আ.) তাকে বলেছিলেন, "তুমি যদি পাওনা আদায়ের আশায় এটুকুও কামনা কর যে জালিম শাসক আরও কিছুদিন বেঁচে থাকুক, তবে সেটিও জুলুমের প্রতি এক ধরনের ঝোঁক।" এ কথা শোনার পর ওই ব্যক্তি তার সব উট বিক্রি করে দেন এবং জালিম শাসকের কোনো কাজে আর নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেননি।

কখন দায়িত্ব গ্রহণ ইবাদত
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, আল্লাহর ওলিরা নেতৃত্ব ও খ্যাতি থেকে এমনভাবে দূরে থাকতেন, যেমন মানুষ বিষধর সাপকে ভয় পায়। কারণ তারা আশঙ্কা করতেন, এসব তাদের আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

তবে তিনি বলেন, সব ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ নিন্দনীয় নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি আলী ইবনে ইয়াকতিনের কথা উল্লেখ করেন, যিনি ইমামের নির্দেশে হারুনের প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যাতে মানুষের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন। এ ধরনের দায়িত্ব ইবাদতের শামিল। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অবৈধ সুবিধা অর্জন, তবে তা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর আগে আয়াতুল্লাহ আল-উজমা বুরুজার্দি তাঁর সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নামে ওয়াকফ করে যান। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পথে ব্যয় করা পরকালে মহান প্রতিদানের কারণ হবে।

"আলোচনায় শত্রু শত্রুতা ছাড়ে না"
দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সিদ্দিকী বলেন, আজ আবার যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি ঈমান ও ধৈর্যেরও একটি পরীক্ষা।

তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত—"আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে" (সুরা আল-বাকারা: ১৫৫)—উদ্ধৃত করে বলেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নানাভাবে পরীক্ষা করেন। মানুষের মর্যাদা যত উঁচু হয়, তার পরীক্ষাও তত কঠিন হয়।

অতীতের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আলোচনা করলেও শত্রু তার শত্রুতা পরিত্যাগ করবে না।" তার দাবি, পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ/বারজাম)-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নানা ধরনের ছাড় দেওয়ার পরও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়নি; বরং চাপ আরও বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, "ইহুদি ও খ্রিস্টানরা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের পথ অনুসরণ করো।" (সুরা আল-বাকারা: ১২০)

আল্লাহর সাহায্যই চূড়ান্ত বিজয়ের উৎস
উহুদের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে সিদ্দিকী বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলমানদের বলেছিলেন, "আল্লাহ আমাদের অভিভাবক; আর তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই।"

তিনি বলেন, মানুষ যদি আল্লাহর পথে অবিচল থাকে, তবে আল্লাহও তাকে সাহায্য করবেন এবং কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারবে না।

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, ইরানের শত্রুরা চাপ সৃষ্টি ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নীতি অনুসরণ করে। তাই আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, ইমাম মাহদি (আ.)-এর প্রতি আনুগত্য, দোয়া, প্রতিরোধ এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল আস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, "বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।" তাই আল্লাহ সাহায্য করলে কোনো শক্তিই একটি ঈমানদার জাতিকে পরাজিত করতে পারবে না।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha