হাওজা নিউজ এজেন্সি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হাওজায়ে ইলমিয়ার পরিচালক আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এক বিশ্লেষণধর্মী বিবৃতিতে ইরান ও ইরাকে শহীদ ইমামের বিদায়, শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।
দেশের হাওজায়ে ইলমিয়ার পরিচালক তাঁর এই বিশ্লেষণধর্মী বিবৃতিতে শহীদ ইমামের প্রতিশোধ ও রক্তের বিচার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জোর দিয়ে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার সাম্প্রতিক বার্তার আলোকে শহীদ ইমাম এবং সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী অন্যান্য শহীদদের প্রতিশোধ ও রক্তের বিচার দাবি করা একটি অবশ্যম্ভাবী ও চূড়ান্ত বিষয়; এটি সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আসা-যাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতেই এটি বাস্তবায়িত হবে এবং এসব অপরাধের পরিকল্পনাকারী ও হোতারা আজ থেকে আর কখনো নিরাপদ বোধ করবে না; নিঃসন্দেহে তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজ শয্যায় মৃত্যুবরণের আকাঙ্ক্ষাও অপূর্ণ রেখেই কবরে যাবে। এই প্রতিশোধ আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক পরিসরে বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনুসৃত হবে।
সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ / আলোচনা আর চালিয়ে যাবেন না
সংবিধান রক্ষক পরিষদের (গার্ডিয়ান কাউন্সিল) ফকীহ সদস্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘনের বিষয়টিও উল্লেখ করে বলেন, এখন যখন অপরাধী শত্রু হুমকি, অপমান, সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা, ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করা, দেশের সম্পদ ফিরিয়ে না দেওয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকর না করা, দখলদার ইসরায়েলের লেবাননের ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার না হওয়া এবং পরবর্তীতে ইরানের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ পুনর্বহালের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের সব ধারাই লঙ্ঘন করেছে, এবং যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তখন সমঝোতা স্মারক মেনে চলা এবং আলোচনা অব্যাহত রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা অবশিষ্ট থাকে না।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি একটি কৌশলগত সুপারিশ
সম্মানিত রাষ্ট্রপতি, যিনি শীর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানের সাহসী ও প্রতিরোধী জনগণের সামনে সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁর পাশাপাশি শামের অন্যান্য সদস্য, দেশের সামরিক কমান্ডার এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের উচিত সমঝোতা স্মারককে সমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা, জিহাদ ও প্রতিরোধের পথ বেছে নেওয়া এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করে তিনি যে পথ নির্ধারণ করেছেন, সেই পথেই ফিরে আসা।
আয়াতুল্লাহ আরাফি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, মহান ইরানি জাতি অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে শত্রুর কাছে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় এবং আবির্ভাবের (জুহুরের) ক্ষেত্র প্রস্তুত করা ও বিজয়ের শিখরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আত্মত্যাগে প্রস্তুত। সুতরাং, অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধের ব্যয় কিংবা অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কাকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরে দায়িত্বশীলদের ইসলামি উম্মাহর ন্যায্য অধিকার থেকে সরে আসা উচিত নয়। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, যারা কোনো অঙ্গীকারই রক্ষা করে না—«لَا أَيْمَانَ لَهُمْ»—এমন কাফিরদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা স্মারকের পথ আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়।
নিচে দেশটির হাওজায়ে ইলমিয়ার পরিচালকের বিশ্লেষণধর্মী বিবৃতির পূর্ণ পাঠ তুলে ধরা হলো:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
مِنَ الْمُؤْمِنِینَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَیْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَیٰ نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ یَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِیلًا
মুমিনদের মধ্যে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে পূরণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ (শাহাদাতের মাধ্যমে) নিজেদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন, আর কেউ অপেক্ষমাণ আছেন; তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন আনেননি।
তেহরান, কোম, পবিত্র নাজাফ, কারবালায়ে মুয়াল্লা ও পবিত্র মাশহাদে বিশ্ব ইসলামের মহান নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা ইমাম খামেনেয়ী (রিযওয়ানুল্লাহি তা'আলা আলাইহি)-এর পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন শোকযাত্রা এবং বিশ্বের বহু দেশ ও অঞ্চলে প্রতীকী শোকযাত্রা ও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন আধুনিক ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা এবং হযরত মাহদী মাওউদের (আজ্জালাল্লাহু তা'আলা ফারাজাহুশ শরীফ) আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতের অভিযাত্রায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করেছে। রক্তের প্রতিশোধের প্রতীক লাল পতাকা হাতে এবং প্রতিশোধের স্লোগানে মুখর কয়েক কোটি মানুষের উপস্থিতি এই শোকযাত্রাকে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ও নজিরবিহীন শোকযাত্রায় পরিণত করেছে।
এই শোকযাত্রা ছিল জনগণের তাদের অভিভাবক-নেতার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ—যে ভালোবাসা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্য বলেছেন,
إِنَّ الَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَیَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম করুণাময় তাদের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করবেন।”
শোকযাত্রার সামগ্রিক পরিবেশ ছিল গভীর শোক ও মহান বীরত্বগাথার এক অনন্য সমন্বয়। জনগণ তাদের শহীদ ইমামকে বিদায় জানানোর সময় হুসাইনি ও আশুরায়ি চেতনা, আবেগ এবং প্রজ্ঞার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই উত্তাল আবেগ জনগণের ঈমানি ও বিপ্লবী পরিচয়ের গভীরতম স্তরের বহিঃপ্রকাশ এবং ইসলামি ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট পুঁজি, যা বিপ্লবী অগ্রযাত্রা ও তার মহান লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের পথে যথাযথভাবে কাজে লাগানো উচিত।
এই বিশাল শোকযাত্রা, যা ইসলামি উম্মাহ ও প্রতিরোধ অক্ষের পক্ষ থেকে কুফর ও ঔদ্ধত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের রূপ নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ও অসভ্য রাষ্ট্রপতিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি অসহায়ত্ব থেকে অর্থহীন বক্তব্য, হুমকি ও ইরানের মহান জাতির বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করতে শুরু করেন। একই সময়ে, এই বিশাল শোকযাত্রার মধ্যেই তিনি সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আবারও ভঙ্গ করে ইসলামি ইরানের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালান। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশের বহু অঞ্চলে নৃশংস আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। এর জবাবে ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে তিনি কঠোর ও বিধ্বংসী আঘাতের সম্মুখীন হয়েছেন। এই শোকযাত্রা আবারও বিশ্ববাসীর সামনে রক্তের তরবারির ওপর বিজয়ের দর্শন এবং ইরানি জাতি ও প্রতিরোধ অক্ষের মৃত্যু ও শাহাদাতকে সাদরে বরণ করার আদর্শকে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি ‘আমরা পারি’—এই দর্শনকে আরও সুদৃঢ় করেছে; দেশের স্থিতিশীলতা, বিকাশ ও অগ্রগতিতে জনগণের ইচ্ছাশক্তি, উপস্থিতি ও জাগরণের অতুলনীয় ভূমিকা স্পষ্ট করেছে এবং বিশ্বকে দেখিয়েছে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমীকরণ পরিবর্তিত হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে শহীদ ইমামের শোকযাত্রায় ইসলামি উম্মাহর এই শক্তির প্রদর্শন, জাগরণ ও বিস্ময়কর মহাকাব্যিক উপস্থিতি—বর্তমান জটিল সম্মিলিত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে—কর্মকর্তা, জনগণ, হাওজায়ে ইলমিয়া, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আলেমসমাজ, প্রতিরোধ অক্ষ এবং সমগ্র ইসলামি বিশ্বের জন্য গভীর ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।
এখন, যখন শহীদ ইমাম এই পবিত্র দেহগুলোর সঙ্গে ইমাম রউফ হযরত আলী ইবনে মুসা আর-রিযা (আলাইহিস সালাম)-এর সান্নিধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন, তখন আবির্ভাবের শিখরে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ অভিযাত্রার গুরুদায়িত্ব আমাদের সবার কাঁধে বর্তেছে। তাই এই কৌশলগত বার্তাগুলোর ব্যাখ্যা এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রযাত্রার পথ সুস্পষ্ট করা আজ অপরিহার্য।
আমি জনগণের এই কোটি মানুষের মহাকাব্যিক উপস্থিতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং ইমাম মাহদী (আজ্জালাল্লাহু তা'আলা ফারাজাহুশ শরীফ) ও মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক হযরত আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ মুজতবা হুসাইনি খামেনেয়ী (দামাত বারাকাতুহু)-এর দরবারে গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। একই সঙ্গে এই মহান ঐতিহাসিক আন্দোলনের কৌশলগত বার্তাগুলো তুলে ধরছি এবং আজ থেকে আমাদের যে দায়িত্বগুলো পালন করা উচিত, সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ইসলামি বিপ্লবের শহীদ ইমামের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও রক্তের বিচারের বার্তা
শহীদ ইমামের শোকযাত্রা এবং জনগণের হাতে উত্তোলিত আশুরার লাল পতাকাগুলো এই সত্যের প্রতীক ছিল যে, শহীদ ইমামের প্রতিশোধ ও রক্তের বিচার এই জাতি এবং বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী মানুষের বৈধ ও শরিয়তসম্মত অধিকার। শোকযাত্রায় অংশগ্রহণকারী জনসমুদ্রের মধ্যে ‘প্রতিশোধ’, ‘ইয়া লি-ছারাতিল খামেনেয়ী’ (হে খামেনেয়ীর রক্তের প্রতিশোধপ্রার্থীরা) এবং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হত্যার দাবির স্লোগান অন্য সব স্লোগানের চেয়ে অধিক জোরালোভাবে ধ্বনিত হচ্ছিল।
ধর্মীয় সংস্কৃতিতে রক্তের বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত লাল পতাকার উত্তোলন শত্রু ও আগ্রাসীদের উদ্দেশে এই সুস্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা বহন করেছে যে, শহীদ ইমাম এবং সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী সব শহীদের পবিত্র রক্তের প্রতিশোধ তাদের অপরাধী ও কলঙ্কিত হত্যাকারীদের কাছ থেকে নিতে জাতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
শহীদ ইমামের প্রতিশোধ ও রক্তের বিচার সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়
আমাদের প্রিয় নেতা যেমন সম্প্রতি শহীদে ইরানের দাফন ও শোকযাত্রা উপলক্ষে তাঁর বার্তায় বলেছেন, হুসাইনি আদর্শে জীবনযাপনকারী এবং হুসাইনি আদর্শেই শাহাদাতবরণকারী শহীদ ইমামের রক্তের বিচার, এবং সাম্প্রতিক দুই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পথে শাহাদাতবরণকারী শহীদদের রক্তের বিচার, ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের রক্তের বিচারেরই ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ—যা বিশেষভাবে দোয়ায়ে নুদবা ও জিয়ারতে আশুরায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কারণেই সর্বোচ্চ নেতার সাম্প্রতিক বার্তার ভিত্তিতে, শহীদ ইমাম এবং সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী অন্যান্য শহীদের প্রতিশোধ ও রক্তের বিচার একটি অবশ্যম্ভাবী ও চূড়ান্ত বিষয়। এটি সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতেই এই প্রতিশোধ বাস্তবায়িত হবে। এই অপরাধের হোতা ও অপরাধীরা আজ থেকে আর কখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারবে না এবং নিঃসন্দেহে তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজ শয্যায় মৃত্যুবরণের আকাঙ্ক্ষাও অপূর্ণ রেখেই কবরে যাবে। এই প্রতিশোধ আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক পরিসরে বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রচেষ্টায় অনুসৃত হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইসলামি উম্মাহর এই উচ্চকণ্ঠ আহ্বানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করেছে এবং একে ‘জাতীয় সংকল্পের মহড়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, যা শত্রুদের হিসাব-নিকাশ বদলে দেবে। অপরাধী শত্রু এবং বর্তমান যুগের ইয়াজিদও এই বার্তায় ভীত হয়ে তাদের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে।
নিঃসন্দেহে এই অপরাধের জন্য শত্রুকে মূল্য দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা আর কখনো এমন দুঃসাহস দেখানোর সাহস না পায়। এখন থেকে জনগণের উচিত এই প্রতিশোধের অগ্নিশিখাকে বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত নিজেদের অন্তরে জাগ্রত রাখা এবং একে সেই পথ অতিক্রমের অটল অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করা, যে পথ শহীদ ইমাম তাঁর রক্ত দিয়ে সিঞ্চিত করে গেছেন।
আমরাও আমাদের নেতার মতো অঙ্গীকার করছি যে, শহীদ ইমাম এবং সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী সব শহীদের পবিত্র রক্তের প্রতিশোধ অপরাধী হত্যাকারীদের কাছ থেকে গ্রহণ করব। একই সঙ্গে আমরা দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, সশস্ত্র বাহিনী, বিশ্বের সব শিয়া, মুসলিম ও স্বাধীনচেতা মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা ইসলামি উম্মাহর এই ন্যায়সঙ্গত দাবিকে বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিক ও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসে। সুতরাং রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা, শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জনভিত্তিক সংগঠন, আলেম-ওলামা, হাওযার ছাত্র, ধর্মপ্রচারক, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং বিশ্বের সাহসী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষকে এই গুরুত্বপূর্ণ আহ্বানে সাড়া দিয়ে এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
জিহাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা এবং নেতৃত্বের মূল অবস্থানে প্রত্যাবর্তনের বার্তা / সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি
জনগণের এই মহাকাব্যিক উপস্থিতির সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা ছিল—জিহাদ ও প্রতিরোধের পথ অব্যাহত রাখা এবং নেতৃত্বের মূল অবস্থানে ফিরে যাওয়া। এখন, যখন শত্রু হুমকি, অপমান, সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা, ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করা, দেশের সম্পদ ফিরিয়ে না দেওয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকর না করা, দখলদার ইসরায়েলের লেবাননের ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার না হওয়া এবং পরবর্তীতে ইরানের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ পুনর্বহালের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের সব ধারাই লঙ্ঘন করেছে, এবং যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তখন সমঝোতা স্মারক মেনে চলা এবং আলোচনা অব্যাহত রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা অবশিষ্ট থাকে না।
সম্মানিত রাষ্ট্রপতি, যিনি শীর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের (শাম) সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানের সাহসী ও প্রতিরোধী জনগণের সামনে সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁর পাশাপাশি শামের অন্যান্য সদস্য, দেশের সামরিক কমান্ডার এবং কূটনৈতিক দায়িত্বশীলদের উচিত সমঝোতা স্মারককে সমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা, জিহাদ ও অবিচল প্রতিরোধের পথ বেছে নেওয়া এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করে তিনি যে পথ নির্ধারণ করেছেন, সেই পথেই ফিরে আসা।
মহান ইরানি জাতি শত্রুকে কোনো ছাড় দেবে না / যুদ্ধের ব্যয়ের ভয়ে আলোচনার পথ অব্যাহত রাখবেন না
সম্মানিত কর্মকর্তাদের স্মরণ রাখা উচিত, আজ যে জনগণ যুদ্ধ এবং কিছু অর্থনৈতিক কর্মকর্তার অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে জীবনযাপন করছে, সেই জনগণই এই দাবি জানাচ্ছে। এর অর্থ হলো, মহান ইরানি জাতি অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শত্রুর কাছে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় এবং আবির্ভাবের (জুহুরের) ক্ষেত্র প্রস্তুত করা ও বিজয়ের শিখরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আত্মত্যাগে প্রস্তুত।
অতএব, অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধের ব্যয়, অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কা কিংবা অনুরূপ অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্বশীলদের ইসলামি উম্মাহর ন্যায্য অধিকার থেকে সরে আসা উচিত নয় এবং পবিত্র কোরআনের ভাষায়—যারা কোনো অঙ্গীকারই রক্ষা করে না—«لَا أَيْمَانَ لَهُمْ»—এমন কাফিরদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা স্মারকের পথ আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়। বরং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর চিরন্তন বিধান ও প্রতিশ্রুতির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে—যেমন তিনি ঘোষণা করেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ.
“হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্য কর, তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপ সুদৃঢ় করবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:৭)
>قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ.
“তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; আল্লাহ তোমাদের হাতেই তাদের শাস্তি দেবেন, তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের বিজয় দান করবেন এবং মুমিনদের অন্তর প্রশান্ত করবেন।” (সূরা তাওবা, ৯:১৪)
كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ.
“কত ক্ষুদ্র দলই না আল্লাহর অনুমতিতে বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা বাকারা, ২:২৪৯)
এছাড়া সূরা ফুসসিলাত (৪১:৩০), সূরা আহকাফ (৪৬:১৩), সূরা জিন (৭২:১৬), সূরা আলে ইমরান (৩:১৬০) এবং এ ধরনের আরও বহু আয়াতে ঘোষিত আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে, এবং এই ঈমানদার, বিপ্লবী, দূরদর্শী, নেতৃত্বনিষ্ঠ, আত্মত্যাগী ও প্রতিরোধী জাতির সমর্থনকে ভিত্তি করে শক্তির অবস্থান থেকে জিহাদের পথ অব্যাহত রাখতে হবে—যতক্ষণ না শত্রু সম্পূর্ণভাবে পরাভূত হয়, প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়, ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়, দেশের অবরুদ্ধ সম্পদ পুনরুদ্ধার করা হয় এবং হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ নেতৃত্বের নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিরোধ অক্ষ ও ইসলামি বিশ্বের ঐক্য ও মহিমার বার্তা
এই শোকযাত্রা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, গত দুই-তিন বছরে মার্কিন ও জায়নবাদী শত্রুর ধারাবাহিক আগ্রাসন ও নৃশংসতার মধ্যেও প্রতিরোধ অক্ষের প্রাণশক্তি ও বিকাশ আগের চেয়ে আরও শক্তিশালীভাবে অব্যাহত রয়েছে। প্রতিরোধ অক্ষ শুধু দুর্বলই হয়নি তা নয়; বরং এর নতুন শক্তি ও সম্ভাবনার উন্মেষ আরও সুস্পষ্ট হয়েছে এবং গত দুই বছরের তুলনায় এতে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী ঐক্যের বন্ধন গড়ে উঠেছে।
কুফর ও ঔদ্ধত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অক্ষের ঐক্যবদ্ধ ও অভিন্ন শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার বার্তাই ছিল এই বিশাল শোকযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তেহরান, কোম ও মাশহাদে অনুষ্ঠিত শোকযাত্রায় ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং অন্যান্য ইসলামি দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি, পাশাপাশি নাজাফ ও কারবালায় শহীদ ইমাম ও তাঁর পরিবারের পবিত্র মরদেহের জাঁকজমকপূর্ণ ও অভূতপূর্ব শোকযাত্রা, ইরাকের বিপুলসংখ্যক শোকাহত মানুষের অংশগ্রহণ এবং ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ার বহু কর্মকর্তা ও নাগরিকের উপস্থিতি বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিরোধ অক্ষের ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
এই শোকযাত্রা প্রমাণ করেছে যে, সমগ্র ইসলামি উম্মাহর হৃদয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত এবং সমগ্র ইসলামি বিশ্বের সাহসী ও সংগ্রামী মানুষের হৃদয় ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে এক অভিন্ন আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি নিবেদিত। প্রকৃতপক্ষে, এটি বিশ্বে ইসলামি উম্মাহর অভিন্ন পরিচয়ের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে, বৈরিতায় জড়িত নয়—এমন বিভিন্ন ইসলামি দেশের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই শহীদদের পবিত্র মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বহু ইসলামি দেশে প্রতীকী শোকযাত্রা ও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন ইসলামি বিশ্বের ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের কাছে বিপ্লবের শহীদ নেতার অতিরাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক মর্যাদাও আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই ঐক্য ইসলামি বিশ্বের জন্য এক অমূল্য সম্পদ এবং শত্রুদের বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জবাব। এই ঐক্যকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং দিন দিন আরও বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করে তুলতে হবে। সামরিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীলদের উচিত বিশেষ করে ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি প্রয়োজনীয় সমর্থন অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে জনগণেরও উচিত রাজপথে এই ঐক্যের দাবিকে আরও জোরালো ও ব্যাপক করে তোলা।
নেতৃত্ব ও জনগণের সঙ্গে আলেমসমাজের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বার্তা
এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় সেবক, পথপ্রদর্শক ও সহযাত্রীর ভূমিকায় আলেমসমাজের প্রাণবন্ত ও ব্যাপক উপস্থিতি নেতৃত্ব, ইসলামি উম্মাহ এবং প্রতিরোধ অক্ষের সঙ্গে আলেমসমাজের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে কোম ও পবিত্র নাজাফের হাওযা ইলমিয়ার শীর্ষ মারজায়ে তাকলিদ, বিশিষ্ট আলেম ও অধ্যাপকদের শোকযাত্রায় অংশগ্রহণ বিপ্লবের নেতৃত্ব, জনগণ এবং প্রতিরোধ অক্ষের সঙ্গে মারজাইয়াত ও আলেমসমাজের গভীর ও অটুট সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
শত্রু বহু বছর ধরেই ইসলামি বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শীর্ষ মারজায়ে তাকলিদ ও আলেমসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। সে কারণেই বিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকেই তারা শারীরিক হত্যাকাণ্ড, চরিত্রহনন, অনুপ্রবেশ, বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে মারজাইয়াত ও আলেমসমাজের অবস্থান দুর্বল করা এবং আলেম, মারজা ও নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু নামাজ ও শোকযাত্রায় আলেমসমাজ, বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং শীর্ষ মারজায়ে তাকলিদের এই ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, শত্রুর এসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে; বরং আলেমসমাজ আজ আরও দৃঢ়ভাবে জনগণের পাশে, তাদের সেবায় নিয়োজিত এবং নেতৃত্বের প্রতি আরও নিবেদিত।
ঈমানদার জনগণ ও সম্মানিত আলেমসমাজের উচিত এই পবিত্র বন্ধনকে সংরক্ষণ করা। একই সঙ্গে আলেমসমাজের কর্তব্য হলো আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মুজাহিদসুলভ চেতনায় জনগণের সেবা করে এই সম্পর্ককে দিন দিন আরও সুদৃঢ় ও বিস্তৃত করা।
বিচক্ষণ বিপ্লবী নেতার প্রতি পুনরায় আনুগত্যের অঙ্গীকার এবং ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের বার্তা
এই মহাকাব্যিক ঘটনার অন্তরে এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ‘গণভোট’ সংঘটিত হয়েছে। ইরান ও বিশ্বের মুসলিম এবং বিপ্লবী জনগণ এই বিশাল সমাবেশে নতুন নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ মুজতবা খামেনেয়ীর প্রতি পুনরায় আনুগত্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। শোকযাত্রার পুরো পথজুড়ে ধ্বনিত ‘জানাম ফিদায়ে রাহবার’ (আমার প্রাণ নেতার জন্য উৎসর্গিত) এবং ‘লাব্বাইক, ইয়া খামেনেয়ী’ স্লোগান প্রমাণ করেছে যে, নতুন নেতৃত্ব শুরু থেকেই ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছে এবং জনগণ ‘ওয়িলায়াতে ফকিহ’-ভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের আনুগত্য অটুট রেখেছে।
শহীদ ইমামের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার নেতার প্রতি উম্মাহর এই আনুগত্যের অঙ্গীকার শিয়া ঐতিহ্যে ‘ওয়িলায়াত’ ও ‘ইমামত’-চিন্তার প্রতি গভীর ও অনন্য উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। এই চেতনা উম্মাহকে মহত্ত্ব ও গৌরবের শিখরে পৌঁছানোর পথে পথপ্রদর্শক হবে।
এই আনুগত্যের অঙ্গীকার, যা নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও সর্বাত্মক সমর্থনের দাবি করে, ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতাকে বিপ্লবের নৌযান পরিচালনা করে তা আবির্ভাবের (জুহুরের) কাঙ্ক্ষিত তীরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সক্ষমতা প্রদান করবে।
নিঃসন্দেহে শত্রু এই সম্মিলিত ও জ্ঞানগত যুদ্ধে এই আনুগত্যের বন্ধন ছিন্ন বা দুর্বল করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। তাই সম্মানিত আলেমসমাজ এবং ওয়িলায়াতনিষ্ঠ জনগণের কর্তব্য হলো ‘জিহাদে তাবইন’ (সত্য ও বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সংগ্রাম)-এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও দূরদর্শিতা বৃদ্ধি করা এবং এভাবেই শত্রুর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়া।
ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি উম্মাহর অটল অঙ্গীকারের বার্তা
হুসাইনি আদর্শে বিশ্বাসী, হুসাইনি চিন্তায় উদ্বুদ্ধ, হুসাইনি পথে অগ্রসর, হুসাইনি চেতনায় জিহাদ ও প্রতিরোধে অবিচল, হুসাইনি আদর্শে জীবনযাপনকারী এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের পথে নিজের রক্ত উৎসর্গকারী সেই শহীদ ইমামের শোকযাত্রায় জনগণের ব্যাপক, আবেগময় ও মহাকাব্যিক উপস্থিতি—যেখানে ছিল গভীর শোক, দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রু—বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, জনগণ ইসলাম এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও বিধিবিধানের প্রতি অটল এবং ইসলামকে রক্ষার জন্য তারা তাদের ইমামের মতো নিজেদের জীবন ও সন্তানদের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত।
শত্রু দীর্ঘ বছর ধরে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, লাগামহীনতা, নৈতিক শিথিলতা ও ভোগবাদকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটানো, পাশ্চাত্য জীবনধারা বিস্তার এবং জনগণকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে তারা কিছুটা সফলও হয়েছে। শহীদ ইমাম বহুবার এ বিপদের বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং এ নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু জনগণের এই ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী শহীদদের রক্ত, বিশেষ করে মজলুম শহীদ ইমামের পবিত্র রক্তের বরকতে জনগণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীরভাবে এবং সর্বান্তকরণে ইসলামের দিকে ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে এই পবিত্র রক্ত অনেকাংশে শত্রুর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
তবে এই হুমকি এখনো বিদ্যমান। তাই দেশের সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, সম্মানিত আলেমসমাজ এবং সব ঈমানদার ও বিপ্লবী শক্তির উচিত এ বড় হুমকির ব্যাপারে নিজেদের দায়িত্বশীল মনে করা। একই সঙ্গে এই পবিত্র রক্ত যে ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক ও কার্যকর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতিনির্ধারণ, ‘জিহাদে তাবইন’ এবং ফলপ্রসূ ও হৃদয়গ্রাহী ‘বালাগে মুবিন’ (দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া)-এর মাধ্যমে শত্রুর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা এবং ইসলামি উম্মাহ ও ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করা।
শত্রুর পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের অপমানজনক ব্যর্থতার বার্তা
এই শোকযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—মার্কিন ও জায়নবাদী ঔদ্ধত্যবাদী শত্রু উপলব্ধি করেছে যে, ইরানি জাতির বিরুদ্ধে তারা যত বড় পরিকল্পনাই করে থাকুক এবং ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরাজিত করার যত স্বপ্নই দেখে থাকুক না কেন, নেতৃত্বের দৃঢ়তা, ইরানের সাহসী জনগণ এবং শক্তিশালী ও বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র বাহিনীর অবিচল অবস্থানের ফলে তাদের সব পরিকল্পনাই অপমানজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানি জাতির মহিমা ও শক্তির সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অবক্ষয় ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চল থেকে তাদের উপস্থিতি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে; ফলে পশ্চিম এশিয়া তাদের উপস্থিতিমুক্ত হবে। অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোও শিগগিরই উপলব্ধি করবে যে তাদের কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়া উচিত নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত থাকা বা তার ওপর নির্ভরশীলতা তাদের কোনো কল্যাণ বা স্বার্থ বয়ে আনবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীলতা ছিন্ন করা ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।
পরবর্তী অংশে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:
ক) জনগণের রাজপথে উপস্থিতি অতীতের তুলনায় আরও বেশি সচেতনতা ও উদ্দীপনার সঙ্গে অব্যাহত থাকা উচিত এবং ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই উপস্থিতি বন্ধ হওয়া উচিত নয়।
এছাড়া সম্মানিত কর্মকর্তাদেরও এই উপস্থিতির জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত এবং মনে রাখা উচিত যে, জনগণের এই উপস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর, সেবাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে দেশের দায়িত্বশীলদের জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে, এই উপস্থিতি ইসলামি বিধান ও মূল্যবোধ প্রচার, জনগণের অন্তরে সেগুলো প্রোথিত করা, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সমাধানে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রকৃত অর্থে ধর্মভিত্তিক গণতন্ত্র বাস্তবায়নের ক্ষেত্রও সৃষ্টি করে।
এখানে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি জাতির এই ব্যাপক গণজাগরণ ইসলামি বিপ্লবের মহিমা, গৌরব ও শক্তির এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। শহীদ ইমামের শোকযাত্রা ও দাফন উপলক্ষে সর্বোচ্চ নেতার বার্তায়ও এই সর্বজনীন গণজাগরণের উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কারবালার আশুরা ছিল নববী রিসালতের প্রতিধ্বনি, যার ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিপ্লবের জন্ম হয়েছে এবং সেই প্রতিধ্বনিরই ফল হিসেবে জনগণের এই জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এই গণঅংশগ্রহণ ও গণজাগরণের প্রভাব ও ব্যাপ্তি, ইনশাআল্লাহ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তার উচ্চ লক্ষ্য ও আদর্শে পৌঁছাতে সহায়ক হবে।
খ) বিশেষত বর্তমান জটিল সম্মিলিত যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সত্য ও বৈধ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলোর একটি। তাই কর্মকর্তা, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি এবং সম্মানিত আলেমসমাজের উচিত সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ অনুসরণ করে এই অতুলনীয় আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত রক্ষা করা এবং এমন কোনো কাজ, বক্তব্য বা লেখা থেকে বিরত থাকা, যা এই সংহতিকে দুর্বল করে।
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করার অর্থ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তগত বা কার্যগত ভুলের ব্যাপারে নীরব থাকা নয়। বরং অপবাদ, অসম্মান বা ব্যক্তিগত আক্রমণ ছাড়া গঠনমূলক সমালোচনা এবং ন্যায্য দাবি উত্থাপন এই ঐক্য ও সংহতিকে আরও শক্তিশালী করে।
দেশের কর্মকর্তারা সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছেন এবং সমঝোতা ও আলোচনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনার প্রতি আরও বেশি অনুগত থেকে তাঁদের মূল্যায়নগত ভুল সংশোধন করবেন এবং নেতৃত্ব ও জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন—এমন আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
গ) ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সব কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর উচিত তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোকে ইসলামের দৃঢ় নীতি, শীর্ষ মারজায়ে তাকলিদদের নির্দেশনা, বিপ্লবের দুই ইমামের চিন্তা ও মূলনীতি, বর্তমান নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা, প্রতিরোধের সংস্কৃতি এবং বিপ্লবী প্রজ্ঞার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা, যাতে ঔদ্ধত্যবাদী শত্রুর যেকোনো ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার পথ রুদ্ধ করা যায়।
বিবৃতিতে ইসলামি বিপ্লবের শহীদ ইমাম, তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সাম্প্রতিক দুই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে নিহতদের শাহাদাতের ঘটনায় ইমাম মাহদী (আ.) এবং তাঁর প্রতিনিধির প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিপ্লবী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আলেমসমাজের পক্ষ থেকে ইরানের জনগণের সঙ্গে থেকে তাদের আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ.
“বিজয় তো কেবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।”
আলীরেজা আরাফি
পরিচালক, হাওযা ইলমিয়া
আপনার কমেন্ট