বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২৬ - ১১:১৭
আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিস্তানির কার্যালয়ে ‘শহীদ ইমাম’-এর স্মরণসভা

আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিস্তানির কার্যালয়ে ‘শহীদ ইমাম’-এর স্মরণসভা

‘শহীদ নেতা’ ছিলেন উৎকৃষ্ট কর্ম ও নিষ্ঠাবান জনসেবার আদর্শ

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন রাফিয়ী বলেন, আধ্যাত্মিকতা ও আল্লাহকেন্দ্রিকতা শহীদ নেতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি আল্লাহর জন্যই আন্দোলন করতেন, আল্লাহর জন্যই কথা বলতেন এবং আল্লাহর জন্যই সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি তাহাজ্জুদ, দোয়া, দীর্ঘ সিজদা, পবিত্র কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং তাওয়াস্সুলের অনুশীলনকারী ছিলেন এবং সর্বদা ব্যবহারিক আধ্যাত্মিকতার (ইরফান) গুরুত্বের ওপর জোর দিতেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন নাসের রাফিয়ী কোমে আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিস্তানির কার্যালয়ে তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত ‘শহীদ ইমাম’ হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)-এর স্মরণসভায় বক্তব্য দেন।

তিনি শহীদ নেতার জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে বলেন, এই নূরানি সমাবেশ এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের সেবা, সংগ্রাম ও উচ্চ মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যিনি তাঁর সম্মানিত জীবন ইসলাম, কুরআন, জিহাদ এবং দ্বীনি মূল্যবোধ রক্ষায় উৎসর্গ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত একই পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

তিনি আরও বলেন, এই অনুষ্ঠান আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যিদ আলী সিস্তানির উদ্যোগে এবং এই মহান নেতার স্মৃতি ও শহীদ পরিবারের সম্মানে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যাতে ইসলাম ও শিয়া বিশ্বের এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি অম্লান থাকে।

রাফিয়ী শহীদ নেতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, তিনি ছিলেন একজন মহান মারজা, কুরআন বিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবিদ, বিশিষ্ট ফকিহ ও উসূলবিদ, ক্লান্তিহীন সংগ্রামী এবং নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদ। তিনি তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও কর্মক্ষমতা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাতের মহান মর্যাদা লাভ করেন।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মাশহাদ, কোম, কেরমান ও ইয়াজদসহ বিভিন্ন শহরে তিনি শহীদ নেতার ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তাঁর কুরআন-জ্ঞান, ইতিহাসচর্চা, শিল্পবোধ, সমাজবোধ, শত্রু-চেতনা এবং সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।

ইরাকের জনগণ ও নাজাফ হাওযার প্রতি কৃতজ্ঞতা

তিনি ইরাকের জনগণ, আলেমসমাজ এবং নাজাফ আশরাফের হাওযার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এর আগেও তিনি নাজাফ ও কারবালায় আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ জানাজার আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে লাখো ইরাকি নাগরিক ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করেন এবং নাজাফ ও কারবালার পবিত্র নগরীতে আমাদের প্রিয় নেতার জানাজায় অংশ নেন। এই ব্যাপক উপস্থিতি প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার যোগ্য। তিনি দোয়া করেন, মহান আল্লাহ যেন শিয়া ও বিশ্বের সকল মুসলমানকে সম্মান ও বিজয় দান করেন এবং জায়নবাদীদের পতাকা পতিত করেন।

আধ্যাত্মিকতা, ইবাদত ও শাহাদাতের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা

রাফিয়ী বলেন, শহীদ নেতার প্রথম বৈশিষ্ট্য ছিল ইবাদত, তাওয়াস্সুল এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। তিনি নিজেই বলতেন যে, বালেগ হওয়ার আগেও তিনি রোজা রাখতেন এবং মায়ের সঙ্গে হারামের প্রাঙ্গণে দীর্ঘ সময় দোয়া ও আরাফার আমল পাঠ করতেন।

তিনি আরও বলেন, ইসলামি বিপ্লবের পর এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালেও তিনি একই আধ্যাত্মিক মনোভাব বজায় রেখেছিলেন এবং সর্বদা দোয়া, তাওয়াস্সুল ও কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করতেন।

রাফিয়ী বলেন, শহীদ নেতা শাহাদাতকে “একজন ব্যবসায়ীর মৃত্যু” বলে অভিহিত করতেন এবং বহুবার উল্লেখ করেছেন যে, মাশহাদে তাফসির পাঠদানকাল থেকেই তিনি শাহাদাত কামনা করতেন।

তিনি আরও বলেন, ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর কাছ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি নেওয়ার সময় এবং শহীদ মুস্তফা চামরানের সঙ্গে যাওয়ার প্রাক্কালে স্ত্রীকে বিদায় জানানোর সময় তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আর ফিরে আসবেন না; তাই যেন শেষ বিদায়ের মতো বিদায় নিয়েছিলেন।

রাফিয়ী বলেন, শহীদ নেতা শাহাদাতকে “নশ্বর সম্পদকে চিরস্থায়ী আল্লাহপ্রদত্ত পুরস্কারের বিনিময়ে বিক্রি করা” বলে বর্ণনা করতেন এবং কুরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করতেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করেছেন-এর বিনিময়ে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের দেহ একদিন বিলীন হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে এই লেনদেন মুমিনদের জন্য চিরস্থায়ী পুরস্কার ও জান্নাত নিশ্চিত করে।

সাহস ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য

রাফিয়ী বলেন, শহীদ নেতার দ্বিতীয় বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাহস। এ প্রসঙ্গে তিনি নেতার নিজের বর্ণনাই তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (Non-Aligned Movement) সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে সময় সম্মেলনের পরিবেশ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নমুখী বামপন্থী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবাধীন। রবার্ট মুগাবে ও ফিদেল কাস্ত্রোর মতো নেতারা সোভিয়েত-ঘনিষ্ঠ এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত-উভয়ের সমালোচনা

রাফিয়ী বলেন, শহীদ নেতা স্মৃতিচারণ করে বলতেন যে, তিনি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ বক্তব্য দেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন, যা উপস্থিত প্রতিনিধিদের প্রশংসা পায়।

তিনি বলেন, বক্তব্যের শেষে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণেরও কঠোর সমালোচনা করেন এবং সেটিকেও অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এই অংশটি উপস্থিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আগের মতো সমর্থন পায়নি, কারণ সম্মেলনের অধিকাংশ দেশ সোভিয়েতপন্থী ছিল।

রাফিয়ী বলেন, বক্তৃতা শেষে এক রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে বলেন: এখানে উপস্থিত দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত নিরপেক্ষ আপনি। কারণ অনেকেই হয় পশ্চিমের, নয়তো পূর্বের প্রতি অনুগত; কিন্তু আপনি স্বাধীনতা ও সাহসের সঙ্গে পশ্চিমের অপরাধ যেমন বলেছেন, তেমনি পূর্বের অপরাধও সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শহীদ নেতা সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব গ্রহণ করতেন না; বরং স্বাধীনতা ও সাহসের সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন।

উৎকৃষ্ট কর্ম ও নিষ্ঠাবান জনসেবার আদর্শ

রাফিয়ী বলেন, মহান আল্লাহ তাঁর সর্বোচ্চ পুরস্কার-শাহাদাত-সৎকর্মশীলদের দান করেন। শাহাদাত শহীদ নেতার জন্য যথার্থ ছিল, যদিও তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপূরণীয় ক্ষতি এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সমাজে রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের কাছে শুধু বেশি কাজ নয়, বরং উত্তম কাজ (আমাল-এ আহসান) প্রত্যাশা করেন। উত্তম কাজ হলো গুণগত, দৃঢ়, নির্ভুল এবং জ্ঞানভিত্তিক কাজ। শহীদ নেতা সেবা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি বিভিন্ন দায়িত্বে জনগণের সেবা করেছেন। বহু বছর দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, আট বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং তারও আগে ইসলামি বিপ্লব ও সংগ্রামের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আধ্যাত্মিকতা, আল্লাহকেন্দ্রিকতা ও নৈতিকতা

রাফিয়ী বলেন, আধ্যাত্মিকতা ও আল্লাহকেন্দ্রিকতা ছিল শহীদ নেতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি আল্লাহর জন্যই আন্দোলন করতেন, আল্লাহর জন্যই কথা বলতেন এবং আল্লাহর জন্যই সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি তাহাজ্জুদ, দোয়া, দীর্ঘ সিজদা, কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং তাওয়াস্সুলে অভ্যস্ত ছিলেন এবং সর্বদা ব্যবহারিক আধ্যাত্মিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন।

শেষে তিনি বলেন, সাহস, নৈতিকতা, বিনয়, উদারচিত্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা ছিল শহীদ নেতার আরও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, যা তাঁর দায়িত্ব পালন ও জনসেবার পুরো সময়জুড়ে তাঁর আচরণ ও চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha