বুধবার ২২ জুলাই ২০২৬ - ১১:৪৬
জাদুঘরগুলোকে সভ্যতাভিত্তিক সংলাপের কেন্দ্রে পরিণত করা উচিত

ইসলামি ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র (ইরসিকা)-এর মহাপরিচালক অভিন্ন সভ্যতাগত ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, জাদুঘরগুলোকে ইরান ও তুরস্ক-দুই জাতির সাংস্কৃতিক বন্ধনের নতুন সেতুবন্ধন এবং সভ্যতাভিত্তিক সংলাপের কেন্দ্রে পরিণত করা উচিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আজ দুপুরে ‘জাদুঘরভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংলাপ; ইরান-তুরস্ক সাংস্কৃতিক সম্পর্কে জাদুঘর কূটনীতি’ শীর্ষক একটি বিশেষজ্ঞ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের বিভিন্ন জাদুঘরের পরিচালক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতি শক্তিশালী করা, অভিন্ন ঐতিহ্য পুনর্মূল্যায়ন এবং তেহরান ও আঙ্কারার মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে জাদুঘরের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

ইসলামি সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থার কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংলাপ সচিবালয় এবং দিয়ারে কোহান ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট-এর যৌথ উদ্যোগে এই বৈজ্ঞানিক সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় ইরান ও তুরস্কের জাদুঘর পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষকরা জাদুঘর কূটনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে অভিন্ন ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত ঐতিহ্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইরান ও আনাতোলিয়ার সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস

ইরসিকার সভাপতি ও মহাপরিচালক মাহমুদ এরওল কিলিচ ইরান ও আনাতোলিয়ার দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, দুই জাতির সাংস্কৃতিক সম্পর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলমান সভ্যতাগত আদান-প্রদানের ফল। জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো এই অভিন্ন ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে।

তিনি আরও বলেন, উসমানীয় সংস্কৃতির বিকাশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরান ও তুরস্কে সংরক্ষিত শিল্পকর্ম, পাণ্ডুলিপি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দুই দেশের শিল্পী ও চিন্তাবিদদের ধারাবাহিক পারস্পরিক সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে। তাঁর মতে, এই অভিন্ন ঐতিহ্য নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

জাদুঘর সাংস্কৃতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম

ইস্তাম্বুলের তুর্কি ও ইসলামি শিল্পকর্ম জাদুঘরের পরিচালক মুহাররেম খায়ের বলেন, বর্তমান বিশ্বে জাদুঘর সাংস্কৃতিক কূটনীতির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

তিনি বলেন, যৌথ প্রদর্শনী আয়োজন, ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা এবং ইরান ও তুরস্কের জাদুঘরগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি দুই দেশের অভিন্ন সভ্যতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।

তুরস্কের জাদুঘরে সংরক্ষিত ফারসি সাহিত্যের অমূল্য পাণ্ডুলিপি

ইস্তাম্বুলের তুর্কি ও ইসলামি শিল্পকর্ম জাদুঘরের জ্যেষ্ঠ পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ সেলমা কায়া বলেন, তুরস্কের জাদুঘরগুলোতে ফেরদৌসীর শাহনামা, মাওলানা রুমির মসনভি, সাদীর বুস্তান এবং নিজামীর খামসা-সহ ফারসি সাহিত্যের বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।

তিনি বলেন, এসব পাণ্ডুলিপি ইরান ও তুরস্কের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক।

জাদুঘর এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ

ইস্তাম্বুলে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি বাহরাম কিয়ান ‘অভিন্ন ঐতিহ্য কূটনীতি’ ধারণা তুলে ধরে বলেন, জাদুঘর আর শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের স্থান নয়; বরং এগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং অর্থবহ বর্ণনা ও সামষ্টিক স্মৃতি নির্মাণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং জাদুঘরভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ অভিন্ন ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক সংলাপ জোরদার এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি কৌশলগত প্রয়োজন।

তাঁর মতে, অভিন্ন সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয় শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

২০২৫: ইরান-তুরস্ক সাংস্কৃতিক বর্ষ

ইরানের পশ্চিম এশিয়া গবেষণা সমিতির সভাপতি এবং মধ্যপ্রাচ্য কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের তুরস্ক বিভাগের পরিচালক সাইয়্যেদ আসাদুল্লাহ আতহারি বলেন, ২০২৫ সালকে ‘ইরান-তুরস্ক সাংস্কৃতিক বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও জাদুঘরভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

তিনি বলেন, জাদুঘর কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত আস্থা গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

তাবরিজের আজারবাইজান জাদুঘরের সহযোগিতার প্রস্তাব

তাবরিজের আজারবাইজান জাদুঘরের পরিচালক ফাতেমেহ আসল সারিরাই তুরস্কের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে বিশেষায়িত প্রদর্শনী, প্রত্নবস্তু সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মতো যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উসমানীয় যুগে ইরানিদের ভূমিকা

সভার আরেকটি অধিবেশনে উনবিংশ শতাব্দীর উসমানীয় সাম্রাজ্যে অভিন্ন লিখিত ঐতিহ্য গঠনে ইরানিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

বক্তারা বলেন, উসমানীয় সাম্রাজ্যে ইরানি চিন্তাবিদ ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের উপস্থিতির ফলে চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যবান এক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, যা আজ দুই জাতির অভিন্ন ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উল্লেখ্য, এই আলোচনা ইসলামি সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থার সাংস্কৃতিক সংলাপ উন্নয়ন বিভাগ-এর উদ্যোগে পরিচালিত ধারাবাহিক সংলাপভিত্তিক কর্মসূচির অংশ। বিভাগের প্রধান আমির রেজায়ি-পানাহের তত্ত্বাবধানে এবং ইরান ও বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় জাদুঘর কূটনীতিকে কেন্দ্র করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha