হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোমের পারদিসান এলাকার ইমাম হাসান আসকারী (আ.) মসজিদে এক বক্তব্যে তিনি ইমাম যায়নুল আবিদীন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জীবন ও কর্মধারা বুঝতে হলে তাঁর সময়কার সমাজকে জানতে হবে। সে সময়ের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণভাবে আহলুল বাইত (আ.)-বিরোধী। সমাজের বৃহৎ অংশ শুধু তাঁদের সমর্থনই করেনি, বরং তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন— “আল্লাহর শপথ! মক্কা ও মদিনায়—যা ছিল ইসলামের কেন্দ্র—বিশজন প্রকৃত মানুষও নেই, যারা আন্তরিকভাবে আমাদের ভালোবাসে।”
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, এই বক্তব্য সে সময় আহলুল বাইত (আ.)-এর চরম নিঃসঙ্গতার প্রতিচ্ছবি।
তিনি আরও বলেন, তখন মানুষের প্রধান লক্ষ্য ছিল দুনিয়াবি স্বার্থ, সম্পদ ও ক্ষমতা। নৈতিক মূল্যবোধের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভই ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ইতিহাসে এমন ব্যক্তিদের কথাও পাওয়া যায়, যারা ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত করেও তার বিনিময়ে পুরস্কার প্রত্যাশা করেছিল।
কারবালার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র মস্তক উবাইদুল্লাহ ইবন জিয়াদের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, সে এর বিনিময়ে স্বর্ণে ভরা পুরস্কার দাবি করেছিল। অথচ সে নিজেই স্বীকার করেছিল, হুসাইন (আ.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম। একইভাবে মুসলিম ইবন আকীলের দুই শিশুপুত্রের হত্যাকারীও পুরস্কারের আশায় শিশুদের করুণ আবেদন উপেক্ষা করে তাদের হত্যা করেছিল।
তিনি আরও একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সামনে উপস্থিত হলে ইমাম তাকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি আমাকে চেনো?” লোকটি উত্তর দেয়, “আপনাকে, আপনার পিতা ও আপনার দাদাকে আমি চিনি।” এরপর ইমাম বলেন, “তুমি কি আমাদের শাফাআত কামনা করো না?” জবাবে সে বলে, “শাসকের দেওয়া পুরস্কার আমার কাছে আপনাদের শাফাআতের চেয়েও বেশি মূল্যবান।”
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, এসব ঘটনা সে সময়কার সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের গভীরতা নির্দেশ করে।
উমাইয়া শাসনের সাংস্কৃতিক নীতি
আয়াতুল্লাহ তাবাসী বলেন, উমাইয়া শাসকরা ইসলামী মূল্যবোধকে উল্টে দিয়েছিল। গান-বাজনা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। মানুষ গায়ক-গায়িকাদের অভ্যর্থনা জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসত; অথচ আহলুল বাইত (আ.)-এর প্রকৃত অনুসারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত।
তিনি আরও বলেন, মদিনায় বন্যা দেখা দিলেও বহু মানুষ জনদুর্ভোগের প্রতি উদাসীন ছিল; কিন্তু একজন গায়ককে স্বাগত জানাতে বিপুল জনসমাগম ঘটত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বিপুলসংখ্যক দাসকে মুক্তি দেন। তবে তাঁর উদ্দেশ্য শুধু দাসমুক্তি ছিল না; বরং আগে তাঁদের আহলুল বাইতের শিক্ষা ও আদর্শে গড়ে তুলতেন, পরে সমাজে ফিরিয়ে দিতেন, যাতে তাঁরা সমাজ সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।
উমাইয়া শাসনের ধারাবাহিকতা ও দমন-পীড়নের রাজনীতি
আয়াতুল্লাহ তাবাসী বলেন, আহলুল বাইতের (আ.)-বিরোধী যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারা উমাইয়া আমলে গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব পরবর্তী বহু শাসনব্যবস্থাতেও বিভিন্নভাবে অব্যাহত ছিল।
তিনি ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০০৬ সালে লেবাননের ৩৩ দিনের যুদ্ধের সময় তিনি মদিনায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে রাজা আবদুল্লাহ ও দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় অনুষ্ঠানটি দেখলেও সেখানে একবারও আলী, হাসান বা হুসাইন নাম উচ্চারিত হতে শোনেননি। তাঁর মতে, এটি আহলুল বাইতের প্রতি উপেক্ষার ঐতিহাসিক ধারারই একটি প্রতিফলন।
হাজ্জাজের শাসন ও ভয়ের পরিবেশ
তিনি বলেন, উমাইয়া আমলের অন্যতম প্রভাবশালী শাসক হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করতেন। ঐতিহাসিক বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি দাবি করেন, হাজ্জাজের শাসনামলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয় এবং তাঁর মৃত্যুর সময় কারাগারগুলোতে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার বন্দী ছিল। তাদের মধ্যে ত্রিশ হাজার ছিলেন নারী এবং বহু বন্দীর ন্যূনতম পোশাকও ছিল না।
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, এমন এক ভীতিকর পরিবেশে সামান্য প্রতিবাদ বা ভিন্নমত প্রকাশও মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিত।
‘ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন’
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, ইমাম (আ.) একদিকে আদর্শবান মানুষ গড়ে তোলেন, অন্যদিকে ন্যায়পন্থী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এমন একটি ভিত্তি নির্মাণ করেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে ইমাম বাকির (আ.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসর গড়ে ওঠে।
মুখতার সাকাফির আন্দোলন প্রসঙ্গে
মুখতার সাকাফির আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল নেতিবাচক দৃষ্টিতে মুখতারকে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কারবালার হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের মাধ্যমে মুখতার আহলুল বাইতের হৃদয়ে স্বস্তি এনে দেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মরহুম আয়াতুল্লাহ আবুল কাসিম খুইয়ের একটি মতানুসারে, মুখতারের আন্দোলন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন লাভ করেছিল।
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই একসময় যে কুফা নগরী কারবালার ট্র্যাজেডির সাক্ষী ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই ইমাম বাকির (আ.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার আসরগুলো ‘কালাল বাকির’ (বাকির বলেছেন) এবং ‘কালাস সাদিক’ (সাদিক বলেছেন) বাক্যে পরিচিতি লাভ করে।
আশুরার চেতনা অম্লান রাখাই ছিল ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর অন্যতম লক্ষ্য
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি ছিল কারবালার ঘটনা ও আশুরার চেতনাকে মুসলিম সমাজে জীবন্ত রাখা। তিনি বলেন, ইমাম (আ.) চেয়েছিলেন, কারবালার স্মৃতি যেন কখনো মানুষের হৃদয় থেকে মুছে না যায় এবং সমাজ সর্বদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের শিক্ষা স্মরণ রাখে।
তিনি বিভিন্ন বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, কারবালার পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বনি হাশিমের নারীদের শোক পালনের আহ্বান জানান এবং কিছু সময়ের জন্য তাঁদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে বিরত থেকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের স্মৃতি জাগ্রত রাখার নির্দেশ দেন। তাঁর মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল আশুরার বার্তাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া।
আয়াতুল্লাহ তাবাসী আরও বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বিভিন্ন উপলক্ষে মানুষের সামনে আহলুল বাইতের ওপর সংঘটিত জুলুমের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, ইমাম (আ.) বলেছেন: “যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে নির্দেশ দিতেন যে আমার আহলুল বাইতকে হত্যা করো, তাহলেও তারা এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারত না।”
চল্লিশ বছর ধরে কারবালার শোকে অশ্রু
আয়াতুল্লাহ তাবাসী ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) দীর্ঘ চল্লিশ বছর কারবালার শোকে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন।
তিনি বলেন, যখনই ইমামের সামনে খাবার বা পানি আনা হতো, তিনি কারবালার তৃষ্ণার্ত শহীদদের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেলতেন। তাঁর অশ্রুতে খাবার ও পানির পাত্র ভিজে যেত। একবার তাঁকে বলা হয়, “আপনার শোক কি কখনো শেষ হবে না?” জবাবে তিনি বলেন, “হযরত ইয়াকুব (আ.) জীবিত থাকা সত্ত্বেও এক সন্তানকে হারিয়ে এত কেঁদেছিলেন যে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। অথচ আমি নিজের চোখে আমার পিতা, ভাই এবং আমার পরিবারের সতেরো জন সদস্যকে শহীদ হতে দেখেছি। আমার এই শোক কীভাবে শেষ হতে পারে?”
জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান
আয়াতুল্লাহ তাবাসী বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জীবনাদর্শে জালিমের বিরুদ্ধে অবস্থান একটি মৌলিক নীতি। তাঁর মতে, সহীফা সাজ্জাদিয়া-র বিভিন্ন দোয়ায় অত্যাচারী ও অবিচারকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান যুগেও অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সেই শিক্ষারই ধারাবাহিকতা।
নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণ
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর মতে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সমাজের নৈতিক পুনর্গঠন। তিনি বলেন, সে সময় নৈতিক অবক্ষয় ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সহীফা সাজ্জাদিয়া এবং দোয়া আবু হামযা সুমালী-র মাধ্যমে ইমাম (আ.) মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি, পরকালচেতনা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেন।
ভবিষ্যতের আশা ও মাহদাভিয়াত
তিনি আরও বলেন, সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও নিপীড়নের মধ্যেও ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিরাশ হতে দেননি। বরং তিনি ভবিষ্যতে ন্যায় ও সত্যের বিজয়ের সুসংবাদ দিতেন এবং মাহদাভিয়াতের বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষকে আশাবাদী রাখতেন।
আয়াতুল্লাহ তাবাসীর ভাষায়, ইমাম (আ.) শিক্ষা দিয়েছেন যে অত্যাচারের সময় দীর্ঘ হলেও তা স্থায়ী নয়; শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও সত্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।
আপনার কমেন্ট