হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাগদাদে নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক দূতের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে ইরান ও ইরাকের শিয়া ও সুন্নি আলেমদের একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন ইরাকের রাবাত মুহাম্মাদি উলামা পরিষদের প্রধান সাইয়্যিদ আব্দুল কাদির আল-হুসনি আল-আলুসি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আহমদ মাবলেগি। সভাটির আয়োজক ছিলেন আরব দেশের রাজধানীর জামে আল-কুদস মসজিদের ইমাম ও খতিব শেখ মুহাম্মদ আল-নূরি।
বিশ্ব মুসলিম আলেমদের অগ্রাধিকার: ঐক্য ও প্রতিরোধ
রাবাত মুহাম্মাদি উলামা পরিষদের প্রধান সাইয়্যিদ আব্দুল কাদির আল-আলুসি এই সভায় ইসলামী আলেমদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন: ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের চিন্তাধারা ও আন্দোলনের ভিত্তি ঐক্য ও সংহতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর পরিস্থিতিতে এ বিষয়টি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন: আমাদের কুরআন এক, নবী এক এবং কিবলা এক। তাই ইরাক, ইরান, লেবানন, মিশরসহ সব ইসলামী দেশের আলেম ও বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংহতি ও প্রতিরোধ।
এই সুন্নি আলেম সতর্ক করে বলেন: কুরআন ও মহানবী (সা.) যে ইসলামী ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তা যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে জালিম শক্তিগুলো ইসলামের মানবগঠনকারী চিন্তাধারাকে দুর্বল করার এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিরোধের মূল শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। এর ফল হবে কেবল ইসলামী উম্মাহর দুর্বলতা।
ইমাম হুসাইনের (আ.) মতাদর্শ: কারবালা থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিরোধের কেন্দ্র
রাবাত মুহাম্মাদি উলামা পরিষদের প্রধান এরপর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনকে ঐতিহাসিক ও সমকালীন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন: ইতিহাসজুড়ে এবং বর্তমান যুগেও প্রতিরোধ সবসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে ঘিরে পরিচালিত হয়েছে।
আল-আলুসি ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কয়েকজন নেতা ও কমান্ডারের কথা উল্লেখ করে বলেন-যেমন আবু মাহদি আল-মুহান্দিস, সাইয়্যিদ হাসান নাসরুল্লাহ, জেনারেল সোলাইমানি এবং “শহীদ নেতা”-তাঁরা সবাই তাঁদের কর্মকাণ্ডে একটি কেন্দ্রীয় আদর্শকে ভিত্তি করেছেন, আর তা হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব ও আন্দোলন। এই কেন্দ্র ইসলামী আলেমদের চিন্তা ও কর্মে ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে।
আয়াতুল্লাহ আহমদ মাবলেগি, ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য, এ সভায় কুরআনের আয়াত: নিশ্চয়ই এই তোমাদের উম্মাহ এক উম্মাহ এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক; অতএব আমারই ইবাদত করো। (সূরা আম্বিয়া: ৯২)
উল্লেখ করে বলেন: কুরআন ‘একক রবত্ব’ ও ‘একক ইবাদত’-এর কথা বলার আগে ‘একক উম্মাহ’-এর কথা বলে। যেন এই তিন সত্যের মধ্যে একটি অস্তিত্বগত সম্পর্ক রয়েছে। উম্মাহর ঐক্য হলো রবের একত্বের প্রকাশ এবং একক ইবাদতের বাস্তবায়নের ক্ষেত্র।
তিনি আরও বলেন: কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী উম্মাহ কেবল একটি মানসিক ধারণা বা বিমূর্ত আদর্শ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কুরআন ঐক্যকে কোনো নির্দিষ্ট গোত্র, মাজহাব, দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না; বরং চায় ঐক্য যেন পুরো উম্মাহর বৈশিষ্ট্য হয়, উম্মাহর এক অংশের বিপরীতে অন্য অংশের নয়।
আয়াতুল্লাহ মাবলেগি বলেন, কুরআনের আয়াত: তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। (সূরা আনফাল: ৪৬)
ব্যাখ্যা করে বলেন: বিবাদ শুধু সাধারণ মতপার্থক্য নয়; এটি উম্মাহর অভ্যন্তরীণ শক্তিকে ক্ষয় করে। ‘তোমাদের শক্তি চলে যাবে’ অর্থ হলো-একটি সমাজকে দৃঢ় রাখার আত্মা, মর্যাদা, সক্ষমতা ও শক্তি হারিয়ে যাওয়া।
ইসলামী উম্মাহর জুলুমের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়া উচিত নয়
বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ মাবলেগি জুলুমের প্রতি সংবেদনশীলতাকে ইসলামী উম্মাহর অন্যতম মৌলিক নৈতিক গুণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন: যে উম্মাহ জুলুমের ব্যাপারে সংবেদনশীল নয়, তারা তাদের মৌলিক পরিচয় হারায়; কারণ জুলুম মানুষকে মর্যাদা ও দায়িত্বের অবস্থান থেকে বিচ্যুত করে।
তিনি কুরআনের আয়াত: তোমরা যারা জুলুম করেছে তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না। (সূরা হুদ: ১১৩)
উল্লেখ করে বলেন:
‘রুকুন’ অর্থ হলো-কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করা, তার দিকে ঝুঁকে পড়া এবং এমন অবস্থাকে গ্রহণ করা যেখানে মানুষ তার প্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা হারায়। যে সমাজ জুলুমের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তা ধীরে ধীরে ভেতর থেকে শূন্য হয়ে পড়ে; কারণ উম্মাহ হিসেবে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ঐক্য ও মর্যাদা সেখানে নষ্ট হয়ে যায়।
শেষ বক্তব্যে আয়াতুল্লাহ মাবলেগি বলেন: কুরআনের দৃষ্টিতে একক উম্মাহ কেবল ঐক্যের কোনো স্লোগান নয়; বরং এটি একটি অস্তিত্বগত ও সভ্যতাগত প্রকল্প।
তিনি বলেন: ইসলামী উম্মাহকে নিজেদের পরিচয় খুঁজে নিতে হবে, নিজেদের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, আমেরিকান ও ইসরায়েলি জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং ক্ষতিকর বিবাদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যাতে একক রবত্ব ও একক ইবাদতের আলোকে মানব জীবনের একটি আদর্শ বিশ্বে উপস্থাপন করতে পারে।
শেষে আয়াতুল্লাহ মাবলেগি বলেন: কুরআন মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার আগে একে অপরের দিকে আহ্বান করে; কারণ আকাশের দিকে পৌঁছানোর পথ শুরু হয় উম্মাহর জন্য একটি অভিন্ন পৃথিবী গড়ে তোলার মাধ্যমে।
আপনার কমেন্ট