রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬ - ১৮:৩৬
কেন কিছু মানুষ কিয়ামত ও মাআদ (পরকাল) বিশ্বাস করে না?

কিয়ামত অস্বীকারের মূল কারণ কি মানুষের চিন্তায়, নাকি তার অন্তরে? পবিত্র কুরআন যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছে, কখনও বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয়, আবার কখনও প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘পরকালবিষয়ক সংশয়’ শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনায় ইসলামী শিক্ষা ও যুক্তির আলোকে এ বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর তুলে ধরা হয়েছে।

কুরআনের দৃষ্টিতে কিয়ামত অস্বীকারের কারণ
পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে কিয়ামত বা মাআদ অস্বীকারের একটিমাত্র কারণ নেই। কুরআন জানায়, সাধারণত দুটি উৎস থেকে এ অস্বীকারের জন্ম হয়।

কখনও মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয়ে আক্রান্ত হয়, আবার কখনও তার প্রবৃত্তি ও জাগতিক কামনা-বাসনা তাকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। অর্থাৎ, কখনও সমস্যা চিন্তায়, আবার কখনও তা উদ্দেশ্য ও মানসিক প্রবণতায়।

যখন মানুষ আল্লাহর ক্ষমতাকে নিজের ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করে
অনেকেই হয়তো জেদ বা বিদ্বেষবশত পরকাল অস্বীকার করেন না; বরং তাঁদের ধারণা, মানুষ মৃত্যুর পর যখন মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়, তখন তার পুনরুত্থান অসম্ভব।

তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে—ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দেহের কণাগুলো কীভাবে আবার একত্রিত হবে? কীভাবে সেই একই মানুষ পুনরায় জীবিত হবে?

কুরআন এই প্রশ্নকে গোপন করেনি; বরং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে—

أَءِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَءِنَّا لَمَبْعُوثُونَ ۝ أَوَ آبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ﴾

“আমরা যখন মারা যাব এবং মাটি ও অস্থিতে পরিণত হব, তখনও কি পুনরুত্থিত হব? আর আমাদের পূর্বপুরুষরাও কি (পুনরুত্থিত হবে)?”
[সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১৬–১৭]

অন্যত্র তারা প্রশ্ন করে—

مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ.

“এই পচে যাওয়া অস্থিগুলোকে আবার কে জীবিত করবে?”
[সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৭৮]

কুরআনের উত্তর অত্যন্ত গভীর ও যুক্তিনির্ভর। কুরআন মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে বলে না; বরং তাকে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়।

قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ.

“বলুন, যিনি প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এগুলোকে পুনরায় জীবিত করবেন। আর তিনি সব সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত।”
[সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৭৯]

এরপর কুরআন আরও প্রশ্ন তোলে—

أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرٍ عَلَىٰ أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ ۚ بَلَىٰ وَهُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ.

“যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি তাদের অনুরূপ আবার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? অবশ্যই সক্ষম। তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।”
[সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৮১]

মানুষের উপলব্ধিকে আরও সহজ করার জন্য কুরআন এমন একটি উদাহরণ তুলে ধরে, যা মানুষ প্রতি বছর নিজের চোখে দেখে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে অনস্তিত্ব থেকে সৃষ্টি করেছেন, এরপর শুক্রবিন্দু (নুতফা) থেকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত করেছেন। আবার প্রতিবছর শুষ্ক ও মৃত ভূমি বৃষ্টির স্পর্শে সজীব হয়ে ওঠে এবং নানা প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।

যিনি প্রতি বছর মৃত ভূমিকে পুনর্জীবিত করেন, মানুষের পুনরুত্থান তাঁর জন্য কীভাবে অসম্ভব হতে পারে?

তাই কুরআন ঘোষণা করে—

وَذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ.

“আর এটি আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ।”

যখন সমস্যা প্রমাণের অভাব নয়, বরং দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা
কুরআন সব পরকাল-অস্বীকারকারীকে কেবল যুক্তিগত সংশয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করেনি। অনেক সময় সমস্যাটি প্রমাণের অভাব নয়; বরং মানুষ সত্যের পরিণতি মেনে নিতে চায় না।

পরকালে বিশ্বাস করার অর্থ হলো—মানুষের প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্তের জন্য একদিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

এই বিশ্বাস মানুষকে আত্মসংযম, আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।

স্বাভাবিকভাবেই, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণে জীবন কাটাতে চায় এবং কোনো জবাবদিহি স্বীকার করতে চায় না, তার কাছে এ বিশ্বাস অস্বস্তিকর মনে হয়। তাই দায়িত্ব এড়ানোর জন্য সে কখনও কখনও পরকালকেই অস্বীকার করে।

কুরআন এ বাস্তবতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাষায় তুলে ধরেছে—

بَلْ يُرِيدُ الْإِنسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ.

“বরং মানুষ চায়, তার সামনে (ভবিষ্যতেও) অবাধে পাপাচার করে যেতে।”
[সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত ৫]

অর্থাৎ, তার প্রকৃত সমস্যা প্রমাণের অভাব নয়; বরং সে পরকালের জবাবদিহি মেনে নিতে চায় না। কিয়ামত অস্বীকার তার কাছে নৈতিক দায়িত্ব থেকে পালানোর একটি উপায়।

তাই কুরআন আরও বলে—

> وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ.

“এটিকে অস্বীকার করে কেবল সেই ব্যক্তি, যে সীমালঙ্ঘনকারী ও পাপাচারী।”
[সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১২]

পাপ হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে দেয়
কুরআন আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পাপ কেবল একটি ভুল কাজ নয়; বরং বারবার পাপ করতে করতে মানুষের হৃদয় ও বিবেক কলুষিত হয়ে যায়। একসময় সে সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

এ কারণেই কুরআন বলে—

 إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ.

“যখন তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন সে বলে, ‘এগুলো তো পূর্ববর্তীদের কল্পকাহিনি।’”
[সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১৩]

এরপর কুরআন এই মানসিক অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করে—

كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ.

“কখনোই নয়; বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।”
[সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১৪]

সূরা আল-কিয়ামাহ: দুই কারণই পাশাপাশি
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সূরা আল-কিয়ামাহ-এর সূচনাতেই কুরআন কিয়ামত অস্বীকারের এই দুই কারণ পাশাপাশি উল্লেখ করেছে।

প্রথম চার আয়াতে বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয়ের জবাব দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—

أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُ ۝ بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَنْ نُسَوِّيَ بَنَانَهُ.

“মানুষ কি মনে করে, আমরা তার অস্থিগুলো একত্র করতে পারব না? অবশ্যই পারব; আমরা তার আঙুলের ডগার সূক্ষ্ম রেখাগুলোও পূর্বের ন্যায় পুনর্গঠন করতে সক্ষম।”
[সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত ৩–৪]

এরপর ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে কুরআন বহু অস্বীকারকারীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে জানায়, তাদের সমস্যা সবসময় প্রমাণের অভাব নয়; বরং তারা জবাবদিহির ভয় ছাড়া স্বাধীনভাবে জীবন কাটাতে চায়। তাই তারা বিদ্রূপের সুরে প্রশ্ন করে—

يَسْأَلُ أَيَّانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ.

“সে প্রশ্ন করে, ‘কিয়ামতের দিন কবে?’”
[সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত ৬]

কুরআনের দৃষ্টিতে কিয়ামত বা মাআদ অস্বীকারের পেছনে একটিমাত্র কারণ নেই। কখনও এর কারণ আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির অভাব, আবার কখনও সীমাহীন ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা এবং জবাবদিহি থেকে পালানোর মানসিকতা।

কুরআন উভয় ধরনের প্রতিবন্ধকতারই উত্তর যুক্তি, সংলাপ ও চিন্তার মাধ্যমে প্রদান করে এবং মানুষকে সচেতনভাবে সত্য গ্রহণের আহ্বান জানায়।

সূত্র: পরকালবিষয়ক কুরআনিক প্রশ্নোত্তর, মারকাযে ফারহাং ও মা'আরিফে কুরআন

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha