হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহরা দেলাভারী পারিজি হাওজা সংবাদ সংস্থার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নতুন প্রজন্মের বিশ্বাস ও ধর্মীয় আস্থার ভঙ্গুরতার কারণ সম্পর্কে বলেন, অতীত ও বর্তমান প্রজন্মের তুলনা কেবল দুটি সময়ের তুলনা নয়; বরং দুটি ভিন্ন তথ্যব্যবস্থার তুলনা। অতীতে বিশ্বাস গড়ে উঠত স্থিতিশীল ও সীমিত তথ্যের পরিবেশে। জ্ঞানের উৎস ছিল মূলত পরিবার, বিদ্যালয় ও মসজিদ; ফলে একটি বিশ্বাস মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো। কিন্তু আজ আমরা তথ্যপ্রবাহের এক পরিবর্তনশীল যুগে বাস করছি।
তরুণ প্রজন্মের কাছে কর্তৃত্বের সংকট
তিনি বলেন, আগে কারও মতামত গ্রহণযোগ্য হওয়ার ভিত্তি ছিল বয়স ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজ সেই কর্তৃত্ব নির্ধারিত হয় অনুসারীর সংখ্যা এবং কনটেন্টের আকর্ষণীয়তার মাধ্যমে। যখন একজন কিশোর কোনো ইনফ্লুয়েন্সারকে একজন শিক্ষক বা আলেমের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করে, তখন তার বিশ্বাসের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
পছন্দের দ্বন্দ্ব
হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, আগে চিন্তার পথ সীমিত ছিল। কিন্তু আজ একজন তরুণ অসংখ্য মতাদর্শ-যেমন উদারবাদ, অজ্ঞেয়বাদ, বস্তুবাদ ইত্যাদির-মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এত বেশি বিকল্পের কারণে মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সচেতনভাবে নির্বাচন করার পরিবর্তে বেশি আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে যায়।
বর্ণনার (ন্যারেটিভের) যুদ্ধ
দেলাভারী পারিজি বলেন, আজ বিশ্বাস আর কোনো সীমাবদ্ধ পরিবেশে অবস্থান করছে না। প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীতে একটি পাল্টা বর্ণনা রয়েছে, যা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ ও পুনর্গঠন করা হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞামূলক বা কেবল প্রতিরক্ষামূলক পদ্ধতিতে আচরণ করা উচিত নয়। প্রথম সমাধান হলো বিকল্প ও আকর্ষণীয় বর্ণনা তৈরি করা। শুধু ‘এই বিশ্বাস ভুল’ বলার পরিবর্তে এমন ধর্মীয় বয়ান তৈরি করতে হবে, যা তরুণদের জীবনের অর্থ, ন্যায়বিচার ও মানসিক প্রশান্তির মতো বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।
সমালোচনামূলক চিন্তার শিক্ষা
তিনি বলেন, সরাসরি বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার বদলে তাদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়। যদি একজন তরুণ প্রশ্ন করতে ও সন্দেহের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান করতে শেখে, তাহলে শেষ পর্যন্ত সে সচেতন বিশ্বাসে পৌঁছাবে, জোরপূর্বক আরোপিত বিশ্বাসে নয়।
তিনি আরও বলেন, আজকের বিশ্বে আরবাঈন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এক অর্থে এটি শিয়া মুসলমানদের হজ।
বিশ্বাসের লড়াইয়ে দৃশ্যমান শক্তির গুরুত্ব
এই কালামবিষয়ক গবেষক বলেন, বিশ্বাসের যুদ্ধে ‘শক্তি ও ঐক্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন’ কথার চেয়ে বেশি কার্যকর। আরবাঈন বিশ্বাসের বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রকাশ ঘটায়। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক তরুণ এটিকে কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ হিসেবে দেখে এবং এর সঙ্গে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আবেগ নয়, ‘সচেতন আবেগ’-এর দিকে অগ্রসর হতে হবে। আরবাঈনকে একটি সামাজিক পরীক্ষাগার হিসেবে দেখা উচিত। তরুণদের শুধু এটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে এটি একটি জিয়ারত; বরং তাদের এই পথের বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক দিক-যেমন নতুন ব্যবস্থাপনা মডেল, সামাজিক ন্যায়বিচার, মওকিবের অর্থনীতি কিংবা সেবার মনোবিজ্ঞান-নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে তাদের বিশ্বাস কেবল হৃদয়ের অনুভূতি না থেকে একটি বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে।
আরবাঈন কূটনীতি
দেলাভারী পারিজি আন্তধর্মীয় যোগাযোগে আরবাঈনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিশ্বাসের যুদ্ধে মোকাবিলার জন্য আরবাঈনকে বৈশ্বিক সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। আরবাঈনের পথে অমুসলিম বা পশ্চিমা তরুণদের উপস্থিতি ইসলামের সেবামূলক ও শান্তিপ্রিয় চিত্রকে তুলে ধরতে পারে এবং পশ্চিমে প্রচলিত ইসলামভীতির পরিবর্তে নতুন একটি ইতিবাচক বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ন্যারেটিভ যুদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, আরবাঈনের বিভিন্ন মুহূর্ত নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তরুণরা যেন যাত্রাপথেই আধুনিক, গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ডিজিটাল বয়ান আদান-প্রদান করতে পারে।
আরবাঈনকে একটি সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া
হাওযা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ধর্মীয় কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ক্ষণস্থায়ী প্রভাব। যদি আরবাঈনকে শুধু একটি অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, তবে এর প্রভাবও সাময়িক হবে। কিন্তু যদি এটিকে একটি সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এর প্রভাব সারা বছর ধরে বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, এ জন্য ‘মওকিব’ ধারণাটিকে কারবালার পথ থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিয়ে আসতে হবে। মওকিব মানে সেবার কেন্দ্র। মহল্লায় সামাজিক সেবাকর্মীদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সারা বছর আরবাঈনের চেতনাকে জীবন্ত রাখা সম্ভব।
আরবাঈনভিত্তিক জীবন-প্রকল্প
তিনি বলেন, তরুণদের জন্য একটি আচরণবিধি বা জীবন-প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে। যেমন, ‘এ বছর প্রতি মাসে আমরা অন্তত একটি মওকিবসদৃশ নিঃস্বার্থ সেবামূলক কাজ করব।’ এতে আরবাঈনের স্লোগানগুলো দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হবে এবং আরবাঈনের চেতনা একটি জীবনধারায় রূপ নেবে।
আরবাঈন জ্ঞান-শৃঙ্খল
তিনি আরও বলেন, আরবাঈন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জগুলোকে ব্যবহার করে সারা বছর শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু তৈরি করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি আরবাঈনের পথে তরুণরা কোনো বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তবে পরবর্তী মাসগুলোতে সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এভাবে আরবাঈন সারা বছরের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ‘প্রেরণার উৎস’ হয়ে উঠবে।
শেষে এই কালামবিষয়ক গবেষক বলেন, বিশ্বাসের যুদ্ধে বিজয়ী হতে হলে শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়; আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জ্ঞান, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক কাঠামোকেও একত্রিত করতে হবে। আরবাঈন এই আন্দোলনের জ্বালানি, কিন্তু এর প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো সুসংগঠিত কাঠামো ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থাপনা।
আপনার কমেন্ট