শনিবার ১ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:৩০
ইরানের ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর অভিজ্ঞতা ভারতীয়দের জন্য মূল্যবান

আজমির শরীফ দরগাহর সাজ্জাদানশীন মুহাম্মদ চিশতী বলেছেন, আস্তানে কুদসে রাযাভি (ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের প্রশাসন) ইরান ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক কূটনীতির বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। তিনি বলেন, মওকুফ সম্পদের (ওয়াক্‌ফ) ব্যবস্থাপনা এবং নজর-নিয়াজ (মানত ও দান) সংগঠনের ক্ষেত্রে রাযাভি মাজারের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ভারতের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,  ইরানের সাংস্কৃতিক কূটনীতি সম্প্রসারণ এবং ইরান ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও গণমাধ্যম-সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে মুম্বাইয়ে ইরানের কনস্যুলেট কার্যালয়ে সাংস্কৃতিক কূটনীতি, ধর্মীয় পর্যটন ও ইরান-ভারত গণমাধ্যম সহযোগিতা বিকাশে আস্তানে কুদসে রাযাভির সক্ষমতা শীর্ষক একটি বিশেষজ্ঞ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন মুম্বাইয়ে ইরানের কনসাল জেনারেল সাঈদরেজা মোসিব মোতলাক, ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি ও মুম্বাইয়ের ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান মোহাম্মদরেজা ফাজেল, সুলতান প্রোডাকশনের প্রধান আলী সুলতান রাযাভি, ভারতীয় প্রযোজক ও পরিচালক আলী আব্বাস সুলতান রাযাভি এবং আজমির শরীফ দরগাহর সাজ্জাদানশীন ও জনপ্রিয় ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম Chishty Vlogs-এর পরিচালক মুহাম্মদ চিশতী।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল শহরে নিযুক্ত ইরানের কনসাল জেনারেল বলেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে ইরানের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং তীর্থভিত্তিক পর্যটনের বিকাশ ইরান ও ভারতের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

তিনি বলেন, ইরান অনন্য ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী। তাই দেশটি এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে।

মোসিব মোতলাক আরও বলেন, তথ্যচিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্রকার, কনটেন্ট নির্মাতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা ইরানের প্রকৃত সম্ভাবনা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তিনি ভারতীয় দর্শকদের উপযোগী মানসম্পন্ন পেশাদার কনটেন্ট তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এরপর মুম্বাইয়ে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি মোহাম্মদরেজা ফাজেল দিল্লিতে ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আলোচনার ফলাফলের কথা উল্লেখ করে বলেন, আস্তানে কুদসে রাযাভির ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রতি ভারতীয় কর্মকর্তাদের আগ্রহ ইসলামী বিশ্বের অন্যতম সফল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মডেল তুলে ধরার একটি মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তিনি প্রস্তাব করেন, মুম্বাইয়ের ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ইরানের কনস্যুলেট এবং ভারতীয় শিল্পীদের সহযোগিতায় ইমাম রেজা (আ.), তাঁর পবিত্র মাজার এবং আস্তানে কুদসে রাযাভি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হোক। এতে শুধু জিয়ারতের আধ্যাত্মিক দিকই নয়, বরং এই প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও জনসেবামূলক কার্যক্রমও ভারতীয় দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হবে।

ফাজেল বলেন, এই প্রামাণ্যচিত্র শুধু ভারতের মুসলমানদের জন্য নয়, বরং দেশের বৃহৎ অমুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছেও আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় হবে। কারণ ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থাপনা, জনসেবা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব ধর্মীয় সীমারেখার বাইরেও বিস্তৃত।

সভায় আজমির শরীফ দরগাহর সাজ্জাদানশীন মুহাম্মদ চিশতী আস্তানে কুদসে রাযাভিকে একটি বৃহৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সফল ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভারতের বহু তীর্থস্থান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সেবা, ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ, মানত ও দানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা এবং জনসেবা সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ব্যবহারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ইরান ও ভারতের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় উভয় দেশের তীর্থস্থান পরিচালনার মানোন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সভার আরেকটি অধিবেশনে ডিজিটাল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ইরানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের বিপুল দর্শকসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে বহুভাষিক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করলে ইরানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটন বিকাশ এবং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

এ সময় ধর্মীয় ইনফ্লুয়েন্সার, তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং পেশাদার কনটেন্ট নির্মাতাদের সাংস্কৃতিক কূটনীতির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের কার্যকর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সভা শেষে উভয় পক্ষ ইমাম রেজা (আ.) ও আস্তানে কুদসে রাযাভি নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, ইরান ও ভারতের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময়, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং ধর্মীয় পর্যটন সম্প্রসারণে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তাদের মতে, এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে যৌথ সাংস্কৃতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, ধর্মীয় পর্যটনের বিকাশ, ইরানের সভ্যতাগত ঐতিহ্যের আরও কার্যকর পরিচিতি, ইরান ও ভারতের জনগণের পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনকূটনীতি শক্তিশালী হবে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এর আগে দিল্লিতে ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ফরিদউদ্দিন ফরিদআসর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান সুরিন্দর নাথ ত্রিপাঠীর (IAS) নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে আস্তানে কুদসে রাযাভির ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন।

সেই বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদল আস্তানে কুদসে রাযাভির প্রশাসনিক কাঠামো, ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সম্পদ পরিচালনা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং এর সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষামূলক, চিকিৎসা, গবেষণা ও দাতব্য কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

এছাড়া ভারতীয় কর্মকর্তারা আস্তানে কুদসে রাযাভির ব্যবস্থাপনা মডেল নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণেরও আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষায়, এই ধর্মীয় কেন্দ্রটি শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি ইসলামী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha