বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২৬ - ২০:৫০
হাক্কুন-নাস আদায় না করলে আটকে যেতে পারে জীবনের গতিপথ

আমরা প্রায়ই সমস্যায় পড়ে চারদিকে ছুটে বেড়াই, কিন্তু আসল গিঁটটা থাকে এমন জায়গায়, যেটার দিকে আমরা মোটেও খেয়াল করি না। ইসলামি নৈতিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—অনেক সময় আমাদের দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় মানুষের অধিকার (হাক্কুন-নাস) আদায় না করা কিংবা কারও মন ভেঙে ফেলা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাসুদ ওলী তাঁর বক্তৃতায় এক অসহায় কর্মচারির বাস্তব ঘটনা ও মরহুম রজবআলী খৈয়াতের উপদেশের মাধ্যমে এই সত্যটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক করা, কারও সাথে মনোমালিন্য দূর করা এবং ভাঙা মনকে জোড়া লাগানোর মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদের জীবনের জটিলতা খুলে দেন।

ফাইল হারানোর ঘটনা
তিনি বলেন, তেহরানের এক আলেম তাঁকে এই ঘটনাটি শুনিয়েছিলেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে, ইসলামী বিপ্লবের আগের কথা। এক ব্যক্তি কোনো অফিসের আর্কাইভ বা নথি বিভাগে চাকরি করতেন। তার কাছে সব ফাইল-নথি ছিল। একদিন অফিসের বড় কর্তা ওপর থেকে ফোন করে বললেন, একটা নির্দিষ্ট ফাইল নিয়ে ওপরে আসতে।

ওই ব্যক্তি খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু ফাইলটি পেলেন না। কর্তাকে জানালেন, 'স্যার, ফাইলটা নেই।' কর্তা রেগে বললেন, 'ফাইল তোমার কাছেই আছে, ভালো করে চোখ মেলে খোঁজ করো।' আবার খুঁজেও পেলেন না। দ্বিতীয়বার ফোন করে বললেন, 'স্যার, আমি সব জায়গায় খুঁজেছি, ফাইলটা কোথাও নেই।'

কর্তা তখন হুমকি দিয়ে বললেন, 'আমি কাল শেষ সময় পর্যন্ত তোমাকে সুযোগ দিচ্ছি। কাল শুক্রবার, অফিস বন্ধ। ফাইল পেলে ভালো, আর না পেলে তোমার চাকরি যাবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তোমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে দেব, তখন আর রক্ষা থাকবে না।'

সেই ব্যক্তি একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন। পরদিন সকাল থেকে তিনি আর্কাইভের এক কোণ থেকে আরেক কোণ, প্রতিটি আলমারি ও ফাইল ঘেঁটে দেখলেন, কিন্তু ফাইলটি যেন বিলীন হয়ে গেল। খুঁজে পেলেন না। অফিসের সময় শেষ হয়ে গেল, আর তিনি নিশ্চিত হলেন যে শনিবার তার সাথে সবচেয়ে খারাপ ব্যবহার করা হবে।

রজবআলী খৈয়াতের সন্ধান
হতাশ হয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পথে একটি মসজিদে ঢুকে তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়লেন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে বললেন, 'হে আল্লাহ! আমি নিঃস্ব। কী খাব, কোথায় যাব, কিছুই জানি না। আমি তো কাজে কোনো অলসতা করিনি, অবহেলা করিনি। তাহলে এই ফাইলটা হারিয়ে গেল কীভাবে?'

মসজিদ থেকে বেরুতেই এক অচেনা লোক তাঁকে ডেকে বলল, 'ওহে! তোমার সমস্যার সমাধান আছে আকা রজবআলী খৈয়াতের কাছে।' তিনি রজবআলী খৈয়াতকে চিনতেন না। অবাক হয়ে ভাবলেন, 'এই লোক কে, যে আমার ব্যথার কথা জানে আর তার প্রতিষেধকও বলে দিচ্ছে?' সত্যিই ভাগ্যবান সেই মানুষ, যাকে আল্লাহ এমন ইঙ্গিত দেন।

আয়াতুল্লাহ বেহজাত (রহ.)-এর কথার সত্যতা
মূল ঘটনার সাথে একটু প্রসঙ্গান্তর, আমার এক বন্ধু শিরাজের ব্যবসায়ী। তিনি খুব ধার্মিক ও বিত্তশালী। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে তিনি ভীষণ দেনায় পড়ে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ কোটি টাকা ঋণ। পাওনাদারদের ভয়ে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন, পাছে তারা তাকে জেলে দেয় আর তার সম্মান নষ্ট হয়।

সে অবস্থায় তিনি কোম শহরে এলেন। সেখানে হজরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)-এর মাজারে ফজরের নামাজ পড়ে বসে ছিলেন। তখন দেখলেন, আয়াতুল্লাহ বেহজাত (রহ.) মাজারে এলেন। তাদের নামাজ শেষে তিনি তাদের পেছনে পেছনে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। বাড়ির দরজায় পৌঁছে আয়াতুল্লাহ বেহজাত ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'শিরাজী ভাই, এগিয়ে আসুন।' তিনি প্রথমে বুঝতে পারেননি, কিন্তু হুজুর সরাসরি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি তো শিরাজের, এগিয়ে আসুন।' তিনি কাছে গেলে হুজুর বললেন, 'নামাজে জাফরে তাইয়ার পড়বেন। এটি সমস্যা সমাধান ও জীবনের গিঁট খোলার জন্য অমূল্য আমল।'

এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই বন্ধুটি শপথ করে বলেছেন, 'আমি সেই নামাজ পড়লাম, এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমার অবস্থা এতটাই ভালো হলো যে, আমি খুঁজতে লাগলাম—কার কাছে আমার সামান্য পাঁচ হাজার টোমান পাওনা আছে, যাতে তা মিটিয়ে দিই। সব ঋণ শোধ করে দিতে পারলাম!'

রজবআলী খৈয়াতের কাছে গমন ও উপদেশ
ঘটনার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেই কর্মচারী রজবআলী খৈয়াতকে না চিনলেও অসহায় হয়ে পথে পথে খুঁজে তাঁর বাড়ি বের করলেন। গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে দেখলেন, এক জ্যোতির্ময় বৃদ্ধ, মাথায় সাদা টুপি পরে দরজা খুললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ইনিই সেই খৈয়াত সাহেব।

সালাম-আলিঙ্গন করে তিনি বললেন, 'জনাব, একজন অচেনা মানুষ আমাকে আপনার কাছে আসতে বলেছে। আমার বড় সমস্যা।'

বৃদ্ধ মানুষটি তাঁর দিকে ভালো করে তাকিয়ে বললেন, "আমি জানি। চার বছর ধরে তুমি তোমার বোন ও তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করে সম্পর্ক ছিন্ন করেছ। তোমার বোনের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছ। তিন বছর আগে তোমার জামাই (বোনের স্বামী) মারা গেছে, তারপরও তুমি সেই শত্রুতা বজায় রেখে বোনের খোঁজ নিতে যাওনি। ভাই-বোনের হক তো আদায়-ই করোনি। আল্লাহ কি এতে রেগে যাবেন না? যাও, আগে বোনের সাথে মিল হও, তাহলে তোমার সব কাজ আল্লাহ নিজেই ঠিক করে দেবেন।"

ওই ব্যক্তি দেখলেন, খৈয়াত সাহেব ঠিকই বলছেন। সত্যিই তো তাঁর বোন ও তার স্বামীর সাথে মনোমালিন্য ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বোনের বাড়ির সামনে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। বোন দরজা খুলেই তাঁকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, 'তোমাকে কি পুরুষ বলে? মুসলমান তো নয়ই, ভাই তো নয়ই, অন্তত মানুষ বলাটা যায়? চার বছর আমার সাথে ঝগড়া করে কাটালে। স্বামী মারা গেছে, তবু তার সঙ্গেও তোমার শত্রুতা শেষ হয়নি। আমার এতিম বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আমি তিন বছর কী কষ্টে তেহরানে আছি, তুমি একবারও খোঁজ নিতে আসোনি!'

তিনি বোনের কথা শুনে কেঁদে ফেললেন এবং ক্ষমা চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে গিয়ে মাংস, ফলমূল ও নানা জিনিস কিনে বোনের জন্য দিলেন এবং কিছু টাকাও রাখলেন। বললেন, 'আমি খুব ভুল করেছি, দয়া করে ক্ষমা করো। এখন থেকে নিয়মিত তোমার খোঁজখবর নেব।' বোনও ভাই-বোনের স্নেহে তাঁকে ক্ষমা করে দিল।

অলৌকিকভাবে ফাইল পাওয়া গেল
শনিবার সকালে তিনি অফিসে গিয়ে ডেস্কে বসলেন, নিশ্চিত ছিলেন যে আজ তাকে বকাঝকা হতে পারে। হতাশ মনে ড্রয়ার খুলতেই দেখলেন—ঠিক সেই ফাইলটি সেখানে পড়ে আছে! আগে যেন আল্লাহ তাঁর চোখে পর্দা দিয়ে রেখেছিলেন, তাই খুঁজে পাননি। সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। আল্লাহ তাকে শেষ আখিরাতের জন্য না রেখে এই দুনিয়াতেই তার ভুলের শাস্তি দিয়েছিলেন।

শিক্ষণীয় কথা
ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আমাদের অনেক সমস্যার মূল থাকে ছোটখাটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে। কখনও কখনও কারও মন ভেঙে দিলে তাহাজ্জুদের (রাতের) নামাজের তাওফিক চলে যায়; ভোরবেলা সেহরির সময়ও নামাজ কষ্টকর মনে হয়। আবার কখনও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েনই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের প্রধান বাধা।

তাই ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—হাক্কুন-নাস (মানুষের অধিকার) আদায় করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং অপরের মনকে সম্মান করা—এগুলোই হলো আল্লাহর কাছে নিজের কাজ সহজ করার আসল চাবিকাঠি। ভাঙা মনকে যত্ন করলেই সৃষ্টিকর্তা আমাদের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে দেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha