রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:৪৯
ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্য দুর্বল করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র

আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ ইয়াসিন মুসাভি আরবাঈনের পদযাত্রাকে ‘উম্মাহর পরাজিত মানসিকতার বিরুদ্ধে একটি আত্মিক ঢাল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, লাখ লাখ মানুষের এই সমাবেশ ভয় ও বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত চিকিৎসা। একই সঙ্গে তিনি ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার ব্যাপারে সতর্ক করে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, নাজাফের হাওজা ইলমিয়ার শিক্ষক ও বাগদাদের জুমার ইমাম আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ ইয়াসিন মুসাভি (৭ আগস্ট ২০২৬) তারিখের জুমার খুতবায় বলেন, আরবাঈন যিয়ারত এমন এক ব্যতিক্রমী ও আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রমকারী ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যা কেবল বস্তুবাদী ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব নয়। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণকে ‘শরিয়তসম্মত দাবি’ এবং উম্মাহর মর্যাদা পুনরুদ্ধার ও পরাজিত মানসিকতা ভেঙে দেওয়ার জন্য একটি ‘আত্মিক চিকিৎসা’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ ইয়াসিন মুসাভি আরবাঈনের জিয়ারতকারীদের অভূতপূর্ব সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, জিয়ারতকারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর মতে, প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে যারা শহরের কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, তাদের সংখ্যা এর কয়েক গুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই লাখো মানুষের উপস্থিতি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। ইরাকের জনগণের নজিরবিহীন ‘দানশীলতা’ ও অতিথিপরায়ণতার ঘটনাও বিভিন্ন ধর্মের গবেষক ও প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বাগদাদের জুমার ইমাম ইরাকের জনগণের আচরণে গভীর পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করে বলেন, ‘এমনকি যারা সাধারণত রাগী এবং নিজেদের সম্পদ খরচ করার ক্ষেত্রে কৃপণ, তারাও জিয়ারতকারীদের সেবা করার গৌরবের সামনে নিজেদের উজাড় করে দেন।’

তিনি এই আচরণের কারণ হিসেবে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে ইরাকের জনগণের গভীর বিশ্বাসগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন এবং এটিকে ‘সৃষ্টিজগতের অন্যতম রহস্য’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা মানুষের এই আত্মত্যাগ ও সেবার প্রধান কারণ।

আয়াতুল্লাহ মুসাভি আরবাঈনের পদযাত্রার বিষয়েও বলেন, প্রচণ্ড গরমসহ নানা প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও এই আন্দোলনকে কেবল বস্তুগত মানদণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর শিকড় রয়েছে আধ্যাত্মিক ও অদৃশ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত গভীর বাস্তবতায়। জিয়ারতকারীরা অনুভব করেন, ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁদের প্রতি এক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে অনুগ্রহ করছেন। এ কারণেই তাঁরা বর্ণনাতীত উদ্দীপনা নিয়ে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা তাঁদের এই যাত্রা থেকে বিরত রাখতে পারে না।

লাখো মানুষের সমাবেশ-একটি ধর্মীয় দাবি

বাগদাদের জুমার ইমাম যারা এই ধরনের বিশাল সমাবেশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন, তাঁদের সমালোচনা করে বলেন, ধর্মীয় শিক্ষায় ‘সংখ্যা ও সমাবেশ’ একটি শরিয়তসম্মত দাবি। কোরআনের আয়াত ও ইসলামী বিধিবিধানেও সমবেত হওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি জুমার নামাজের আবশ্যিকতা এবং হজের ফরজ হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, হজ হলো মুসলমানদের ‘সবচেয়ে বড় সমাবেশ’।

আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন, এত ব্যাপক সমাবেশ সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর হিকমতের একটি দিক হলো-বড় শক্তিগুলো জনগণের ওপর যে দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি চাপিয়ে দেয়, তার বিরুদ্ধে একটি ‘মানসিক ঢাল’ সৃষ্টি করা।

তিনি লাখো মানুষের সমাবেশকে ভয় ও কাপুরুষতার মতো মানসিক ব্যাধির ‘প্রকৃত চিকিৎসা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, দুর্বলতার অনুভূতি মানুষকে হতাশা ও নিরাশার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকে লাখো জিয়ারতকারীর সমুদ্রের মধ্যে দেখতে পায় এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মর্যাদা ও বীরত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্দীপনামূলক স্লোগান শুনতে পায়, তখন পরাজিত মানসিকতা দূর হয়ে যায়। এর পরিবর্তে এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি সৃষ্টি হয়, যা মানুষের ইবাদতের মান এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও উন্নত করে।

আরবাঈনের জিয়ারতা ব্যাহত করতে বিদেশি প্রচেষ্টার ব্যাপারে সতর্কবার্তা

বাগদাদের জুমার ইমাম তাঁর বক্তব্যের অন্য অংশে এই ধর্মীয় আচার ও জিয়ারত ব্যাহত করার জন্য বিদেশি প্রচেষ্টার ব্যাপারে সতর্ক করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আরবাঈনের জিয়ারত আয়োজনের পথে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি এবং হামলা চালানোর মাধ্যমে এই জিয়ারত ব্যাহত করার প্রচেষ্টা ইরাকের জনগণের সতর্কতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। আরবাঈনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ারই প্রমাণ বহন করে।

ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীতে বিভেদ সৃষ্টিতে মার্কিন পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কবার্তা

আয়াতুল্লাহ মুসাভি এরপর ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে সতর্ক করে বলেন, এমন কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তা টম বারাক ইরাকের অভ্যন্তরে সংঘাত সৃষ্টি, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্যে বিভেদ তৈরি এবং তাদের প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও কুর্দিস্তান অঞ্চলের বিরুদ্ধে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন: ‘শিয়াদের রক্ত আমাদের লালসীমা।’

তিনি আরও বলেন, ইরাকি বাহিনীকে এমন কোনো ফিতনা বা সংঘাতে জড়িয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে, যার লক্ষ্য হলো ইরাকের সরকার ও সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করা।

অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান

বাগদাদের জুমার ইমাম তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘অভিন্ন শত্রু’-অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোনো বাধা হওয়া উচিত নয়।

তিনি পিতৃসুলভ আহ্বান জানিয়ে বলেন: ‘আমি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কথা বলছি না; বরং একজন পিতার অবস্থান থেকে কথা বলছি। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী, হাশদ আশ-শাবি এবং প্রতিরোধের সব সন্তানই আমাদের ভাই। এই ঐক্যকে বিভক্ত করার কিংবা এসব পক্ষের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করার যেকোনো প্রচেষ্টা জনগণের সচেতনতা ও ঐক্যের মুখোমুখি হবে।’

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha