হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পবিত্র চল্লিশা (আরবাইন) উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখো আজাদারদেরর পদচারণায় মুখরিত হয়েছে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা। নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে জিয়ারতের এই মহাযজ্ঞে অংশ নিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হুজুর সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী। তাঁর ভাষ্যমতে, এই পদযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মানবতার এক বিশাল সম্মিলন, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের সকল বাধা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
আধ্যাত্মিকতার গভীরতা: একবার এলে বারবার আসতে ইচ্ছে করে
কারবালার ময়দানে দাঁড়িয়ে হুজুর সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী বলেন, আরবাইন পদযাত্রার পরিবেশ এতই মোহময় ও পবিত্র যে, একবার এখানে এলে বারবার আসার ইচ্ছে জাগে। মানুষের সমুদ্র এখানে, অথচ কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। প্রতিটি মানুষ যেন একই সুরে মিলিত হয়েছে-সেটা হচ্ছে ভালোবাসা ও শোকের সুর।
তিনি আরও বলেন, কারবালার এই সফর মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে তোলে। যারা এখানে আসে, তারা যেন নতুন করে জীবন শুরু করার প্রেরণা নিয়ে ফিরে যায়।
হজের সঙ্গে তুলনা: কারবালা সম্পূর্ণ আলাদা এক অনুভূতি
সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী হজ ও আরবাইন পদযাত্রার অভিজ্ঞতার তুলনা টেনে বলেন, আমি হজের সফর করেছি। হজে যে শান্তি ও তৃপ্তি পেয়েছিলাম, কারবালায় এসেও ঠিক অনুরূপ এক প্রশান্তি অনুভব করছি। কিন্তু এই দুই সফরের মধ্যে পার্থক্যও আছে। হজ যেমন আল্লাহর ঘরের সান্নিধ্য, আরবাইন তেমন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর রক্তাক্ত ময়দানের সান্নিধ্য-যেখানে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের ইতিহাস আজও জীবন্ত।
তিনি বলেন, হজের পর তিনি প্রথমবার কারবালায় এসেছেন এবং এখানকার পরিবেশ, মানুষের আন্তরিকতা ও ভক্তির গভীরতা তাকে বিস্মিত করেছে।
বৈশ্বিক সমাগম: ১৭৬ দেশের মানুষের মিলনমেলা
হুজুর সৈয়েদ জানান, তিনি শুনেছেন এবং নিজ চোখে দেখেছেন যে, এবারের আরবাইন পদযাত্রায় প্রায় ১৭৬টি দেশ থেকে মানুষ অংশ নিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত এই যাত্রীরা ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতিতে ভিন্ন হলেও তাঁদের মনের আকুতি এক-কারবালার প্রতি ভালোবাসা ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তিনি বলেন, আমি দেখেছি আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ, ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ, এশিয়ার এশিয়ান-সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে একই উদ্দেশ্যে পথ চলছে। এই ঐক্য পৃথিবীর আর কোথাও দেখার মতো নয়।
আহলে সুন্নাত ভাইদের প্রতি বিশেষ আহ্বান
সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী তাঁর বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ভাইদের প্রতি এক বিশেষ আবেদন জানান। তিনি বলেন, আমি এখানে অনেক আহলে সুন্নাত ভাইকেও দেখেছি। তাঁরা এসেছেন, জিয়ারত করেছেন এবং মুগ্ধ হয়েছেন। আমি আহলে সুন্নাত ভাইদের বলব, আপনাদেরও এখানে আসা উচিত। দেখুন কারবালা আসলে কী জিনিস, ইমাম হোসাইন (আ.)-এর এই ময়দান কী বার্তা বহন করে।
তিনি আরও বলেন, আমি যখন ভারতে ফিরে যাব, এখানকার পাইগাম আমার আহলে সুন্নাত ভাইদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করব। আমার ইচ্ছা, তারা যেন আরবাইন পদযাত্রায় অংশ নেয় এবং এই মহাসওয়াবের অংশীদার হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ঘটনা কেবল একটি সম্প্রদায়ের নয়-এটি সারা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। এই সত্য জানার প্রয়োজন রয়েছে।
ইরাকি ভাইদের অতুলনীয় আতিথেয়তা
কারবালার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো ইরাকি মানুষের আতিথেয়তা। সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী এই বিষয়ে বিশেষভাবে অভিভূত হন এবং বলেন, ইরাকি ভাইদের ব্যবহার অপূর্ব। তাঁরা এত খুশ আখলাক (সুশীল ও সদয়) যে দেখে বিশ্বাস হয় না। রাস্তার প্রতিটি পয়েন্টে তাঁরা খাবার, পানি, শরবত, ফলমূল ও নানা ধরনের খাদ্য পরিবেশন করছেন। কারো মুখে কোনো বিরক্তির ছায়া নেই।
তিনি বলেন, যেভাবে তাঁরা ধৈর্য ধরে প্রতিটি যাত্রীর সেবা করছেন, তা সত্যিই দেখার মতো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন, খাবার বিতরণ করেন, যাত্রীদের হাত-পা ধুয়ে দেন, পথ দেখান-এসব কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি তাঁদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে যা দেখানো উচিত
তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতি আহ্বান। তিনি বলেন, আমার বেদনার বিষয়, এই অপূর্ব দৃশ্য, মানুষের আন্তরিকতা, ইরাকি ভাইদের সেবা, লক্ষ লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাগম-এসব আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দেখায় না। তাঁরা দেখায় শুধু সংঘাত, অস্থিরতা, রাজনীতি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কিন্তু কারবালার আসল চিত্র হচ্ছে ভালোবাসা, শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের অনন্য নজির। বিশ্বের মানুষ জানতে পারে কারবালায় কী ঘটেছিল এবং কেন ঘটেছিল-সেটা জানার অধিকার সবার রয়েছে। এই সত্য প্রকাশ হওয়া দরকার।
কারবালার 'অদ্ভুত ফিলিং'—যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন
তাঁর শেষ বক্তব্যে সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী একটি অদ্ভুত অনুভূতির কথা বলেন। তিনি বলেন, এখানে এসে একটা অদ্ভুত ফিলিং হয়। সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মন যেন জুড়িয়ে যায়, সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। এক অমোঘ শান্তি নেমে আসে মনে।
তিনি বলেন, এই শান্তি ও তৃপ্তি পৃথিবীর কোনো রিসোর্ট বা আরামপ্রদ পরিবেশে পাওয়া যায় না-এটি পাওয়া যায় শুধু ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র ময়দানে, যেখানে হাজার বছর আগে রক্ত ঝরেছিল সত্য ও ন্যায়ের জন্য।
শেষ বাণী: সত্যের পথে চলার আহ্বান
সৈয়েদ রাশাদাত আলী আল কাদেরী তাঁর বক্তব্য শেষে আহলে সুন্নাতসহ বিশ্বের সব মুসলিম ভাইদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমি অনুরোধ করব, আপনারা সবাই এখানে আসুন। জিয়ারত করুন, এই অপূর্ব পরিবেশ উপভোগ করুন। আর শরিক হয়ে সওয়াব হাসিল করুন। কারবালা সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে কাউকে প্রশ্ন করা হয় না-কেউ শিয়া, কেউ সুন্নি, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান-শুধু ভালোবাসা নিয়ে এলেই যথেষ্ট।
আপনার কমেন্ট