মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২৬ - ১২:৩৮
ইরানের নেতার শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে সুদৃঢ় করেছে

পাকিস্তানের ‘মজলিসে ফিকর ও দানিশ’-এর সভাপতি ইমাম খামেনেয়ী (আ.)-এর শাহাদাতকে সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, আধিপত্যবাদী শিবিরের ভিত্তিহীন হিসাব-নিকাশের বিপরীতে এই ঘটনা মুসলিম জাতিগুলোর আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুঘটকে পরিণত হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘সর্বোচ্চ বিপ্লবী নেতার শাহাদাত, ইসলামী সমাজের পুনর্গঠন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কূটনীতিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতে অংশ নেন।

কোয়েটায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় কোয়েটা শহরের আলহামদ ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

এই ব্যাখ্যামূলক সভার উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রতিক ইসলামী বিশ্বের পরিবর্তনের কৌশলগত ও আঞ্চলিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা, উম্মাহর শহীদ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)-এর শাহাদাতের পরিণতি ব্যাখ্যা করা, বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় ইসলামী ঐক্য ও জাগরণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা এবং আঞ্চলিক সংকটগুলোতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করা।

সভায় বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তান ইকবাল একাডেমির সভাপতি আব্দুররউফ রফিকি; পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উপ-মহাসচিব মাওলানা আব্দুল হক হাশেমি; রাজনৈতিক বিষয়ের বিশ্লেষক এবং প্রভাবশালী পশতুন নেতা আহমদ খান আচাকজাই; ন্যাশনাল পার্টির সহসভাপতি ইসহাক বালুচ; আলহামদ ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও গবেষণা পরিচালক আব্দুর রহিম দেহওয়ার; রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক আরিফ খান, যিনি ইংল্যান্ড থেকে সরাসরি ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে অংশ নেন; কোয়েটায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইয়্যেদ আবুলহাসান মিরি; এবং কোয়েটায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কনস্যুলেট জেনারেলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ সাইয়্যেদ মেহদি শায়েকি, যিনি ইরানের কনসাল জেনারেলের প্রতিনিধিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মজলিসে ফিকর ও দানিশ’-এর সভাপতি আবদুলমতিন আখুনজাদা ইসলামী উম্মাহর শহীদ নেতা ইমাম খামেনেয়ী (রহ.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর শাহাদাতকে সমকালীন ইসলামী বিশ্বের ইতিহাসে এক অসাধারণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের ভিত্তিহীন হিসাব ও ভুল পরিকল্পনার বিপরীতে এই মর্মান্তিক শাহাদাত ইসলামী জাগরণকে আরও গভীর করা, মুসলিম জাতিগুলোর ঐক্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের অনুঘটকে পরিণত হয়েছে।

মজলিসে ফিকর ও দানিশের সভাপতি আরও বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বাত্মক স্থিতিশীলতা ও প্রতিরোধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর ‘অপরাজেয়তার’ মিথকে ভেঙে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৃহৎ শক্তির সমীকরণকে বিশ্বের নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণের পক্ষে পরিবর্তন করেছে।

এরপর আলহামদ ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও গবেষণা পরিচালক আবদুর রহিম দেহওয়ার নেতৃত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য, মুসলিম উম্মাহর সামনে থাকা নৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট এবং বিশ্বের নিপীড়িত মুসলমানদের সঙ্গে সংহতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তিনি শহীদ বিপ্লবী নেতার ব্যক্তিত্বকে সমকালীন ইতিহাসের অল্পসংখ্যক সফল নেতার অন্যতম হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন, তাঁর চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রথমত, গভীর বিনয় ও নম্রতা, যা তাঁকে সবসময় সক্রিয়ভাবে ও আত্মত্যাগের সঙ্গে মাঠে থাকার সুযোগ দিয়েছে; দ্বিতীয়ত, নীতি ও বিশ্বাসের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এবং আইন-কানুনের ক্ষেত্রে অবিচলতা; তৃতীয়ত, জনগণকে পরিচালনা ও অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করার সক্ষমতা; এবং চতুর্থত, জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা।

দেহওয়ার কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, ইরান ও গাজার সংকটময় পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ইসলামী বিশ্বে বিদ্যমান উদাসীনতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একে অপরকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ইসলামী উম্মাহ তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সংগ্রামের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের মতো বিষয়গুলো কেবল ওই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং এগুলো সমগ্র ইসলামী উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব সংঘাত কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ বা নির্দিষ্ট একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ লড়াই নয়।

আলহামদ ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালক মুসলিম সমাজগুলোতে নৈতিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সচেতনতা, অধ্যয়ন ও শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, তরুণ প্রজন্মের বই ও পাঠাভ্যাস থেকে দূরে সরে যাওয়া একটি গুরুতর ক্ষতি।

বেলুচিস্তান প্রদেশের আইনজীবী ও মেধাবী তরুণদের উদ্দেশে আবদুলমতিন ইসলামী বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তার শিকড় ব্যাখ্যা করে বলেন, সাইয়্যেদ জামালউদ্দিন আসাদাবাদী ফেডারেল কাঠামোর মাধ্যমে একটি ‘অভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল আরও বিকশিত করেন।

তিনি বলেন, ইসলামী চিন্তাধারায় ভৌগোলিক সীমারেখার নিজস্ব কোনো মৌলিক বৈধতা নেই। ইসলাম একটি স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থার অধিকারী, যেখানে অভিন্ন মুদ্রা এবং সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

বিশ্বের ক্ষমতার কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে এই আইনজ্ঞ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো অভিন্ন অর্থনীতি, মুদ্রা ও পররাষ্ট্রনীতির সুবিধা ভোগ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রও একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর অধিকারী। অন্যদিকে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের সংহতির অভাবের কারণে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ, বাণিজ্য ও মুদ্রাব্যবস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-এর কার্যক্রমের সমালোচনা করে আবদুলমতিন বলেন, ১৯৬০-এর দশকে ইয়াসির আরাফাত ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো নেতাদের প্রচেষ্টায় গঠিত এই সংস্থা আজ একটি আনুষ্ঠানিক ও কম-কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাঠামোগত নির্ভরতার কারণে এই সংস্থা ইসলামী বিশ্বের সংকট সমাধানে সফল হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে গাজার জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও সংস্থাটি কেবল সভা আয়োজন ও বিবৃতি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

তিনি শেষ পর্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংকট থেকে ইসলামী উম্মাহর উত্তরণের পথ হলো সাইয়্যেদ জামালউদ্দিন আসাদাবাদী, আল্লামা ইকবাল এবং শহীদ নেতার চিন্তাধারায় ফিরে যাওয়া এবং একটি ‘অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়া।

আলোচনার আরেকটি অংশে গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইয়্যেদা মাসউদা শাহ ইসলামী বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, এই অঞ্চল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যেকোনো উন্নয়ন ও অগ্রগতির আগে ইসলামী উম্মাহর অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও শক্তি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি ফিলিস্তিন সমস্যাকে ‘ইসলামী উম্মাহর দেহের গভীরতম ক্ষত’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িতদের অধিকার আদায়ে পাকিস্তান কূটনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে এই অধ্যাপক বলেন, যদিও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবুও স্থায়ী শান্তি এখনো অর্জিত হয়নি। কারণ এর বাস্তবায়ন তিনটি বিষয়ে সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল-পারমাণবিক জ্বালানি, আঞ্চলিক ভূমিকা এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

মাসউদা শাহ আরও বলেন, ইসলামী বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি থেকে আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা-যেমন ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পর্যটন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিকাশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬ সালে এই আর্থিক ব্যবস্থার সম্পদের পরিমাণ চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

ইসলামী বিশ্বের তরুণদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই প্রজন্ম সক্রিয় অংশগ্রহণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, গণমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বাস্তব ঐক্যের অভাব এবং দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোকে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে ইসলামের ভাবমূর্তি সংশোধন, বুদ্ধিদীপ্ত বয়ান নির্মাণ এবং ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলার ওপর জোর দেন।

সম্মেলনের শেষ পর্বে ইংল্যান্ডে বসবাসরত রাজনৈতিক-সামাজিক বিষয়ের বিশ্লেষক, গবেষক ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ইকবাল-বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আরিফ খানের ‘স্বৈরতন্ত্র, প্রতিরোধ ও ইকবাল’ শীর্ষক কৌশলগত প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha