হাওজা নিউজ এজেন্সি: তবে এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে “বিষক্রিয়ায় ইন্তেকাল”, “শাহাদাত” এবং “ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড”—এই তিনটি দাবিকে পরস্পরের সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন না করে পৃথকভাবে বিচার করা প্রয়োজন। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরা হলো:
১. শায়খ তুসি: রাসুলুল্লাহ ﷺ বিষক্রিয়াগ্রস্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন
শিয়া ফিকহ ও হাদিসের প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ তুসি (মুহাম্মদ ইবন আল-হাসান আল-তুসি) তাঁর তাহযীবুল আহকাম গ্রন্থে লিখেছেন:
قُبِضَ بِالْمَدِينَةِ مَسْمُومًا يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ لِلَيْلَتَيْنِ بَقِيَتَا مِنْ صَفَرٍ سَنَةَ عَشَرَةٍ مِنْ هِجْرَتِهِ
তিনি মদিনায় বিষক্রিয়াগ্রস্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। হিজরতের দশম বছরে সফর মাসের অবশিষ্ট দুই রাতের একটি সোমবার ছিল তাঁর ইন্তেকালের দিন।
এখানে «مَسْمُومًا» (মাসমূমান) শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়; এর অর্থ হলো বিষপ্রয়োগে আক্রান্ত/বিষক্রিয়াগ্রস্ত।
[শায়খ তুসি, তাহযীবুল আহকাম, খণ্ড ৬, পৃ. ১]
২. শায়খ মুফিদ: বিষক্রিয়াগ্রস্ত অবস্থায় ইন্তেকালের উল্লেখ
শায়খ মুফিদও তাঁর আল-মুকনিআহ গ্রন্থে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের বিবরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে তিনি মদিনায়, সোমবার, সফর মাসের শেষ হওয়ার দুই রাত আগে, হিজরতের দশম বছরে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর।
এ বর্ণনায়ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিষক্রিয়াগ্রস্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
[শায়খ মুফিদ, আল-মুকনিআহ, পৃ. ৪৫৬]
৩. শায়খ সাদুক: খায়বারের বিষের প্রভাব
শিয়া আকিদা-বিষয়ক গ্রন্থ আল-ই‘তিকাদাত-এ শায়খ সাদুক লিখেছেন:
وَاعْتِقَادُنَا فِي النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ سُمَّ فِي غَزْوَةِ خَيْبَرَ، فَمَا زَالَتْ هَذِهِ الْأَكْلَةُ تُعَاوِدُهُ حَتَّى قَطَعَتْ أَبْهَرَهُ فَمَاتَ مِنْهَا.
“নবী ﷺ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো, খায়বারের যুদ্ধে তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল। সেই বিষের প্রভাব বারবার তাঁর ওপর ফিরে আসতে থাকে; অবশেষে তা তাঁর ‘আবহার’ (প্রধান ধমনী)-এ প্রভাব ফেলে এবং তিনি এর কারণে ইন্তেকাল করেন।
এখানে শায়খ সাদুক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এটিকে “আমাদের বিশ্বাস” (وَاعْتِقَادُنَا) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়া আকিদার পরিমণ্ডলে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের সঙ্গে খায়বারের বিষক্রিয়ার সম্পর্ক স্বীকৃত ছিল।
[শায়খ সাদুক, আল-ই‘তিকাদাত, খণ্ড ১, পৃ. ৯৭]
৪. আল্লামা মাজলিসি: ইমামদের শাহাদাত সম্পর্কে শিয়া আলেমদের মত
আল্লামা মাজলিসি তাঁর বিহারুল আনওয়ার-এ লিখেছেন:
ذَهَبَ كَثِيرٌ مِنْ أَصْحَابِنَا إِلَى أَنَّ الْأَئِمَّةَ خَرَجُوا مِنَ الدُّنْيَا عَلَى الشَّهَادَةِ، وَاسْتَدَلُّوا بِقَوْلِ الصَّادِقِ ع: وَاللَّهِ مَا مِنَّا إِلَّا مَقْتُولٌ شَهِيدٌ.
আমাদের অনেক আলেমের মত হলো, ইমামগণ শাহাদাতের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁরা ইমাম সাদিক (আ.)-এর এই বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন: ‘আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি নিহত হয়ে শহীদ হননি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন: এই উদ্ধৃতিটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শাহাদাতের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। এটি মূলত শিয়া ইমামদের শাহাদাত-সংক্রান্ত একটি সাধারণ বক্তব্য।
[আল্লামা মাজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৯, পৃ. ২০৯]
৫. সুন্নি সূত্রে: ইবনে মাসউদের বক্তব্য
সুন্নি মুহাদ্দিস ইমাম বাইহাকির নামে উদ্ধৃত একটি বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর বক্তব্য পাওয়া যায়:
لَأَنْ أَحْلِفَ تِسْعًا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُتِلَ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَحْلِفَ وَاحِدَةً أَنَّهُ لَمْ يُقْتَلْ، وَذَلِكَ أَنَّ اللَّهَ اتَّخَذَهُ نَبِيًّا وَاتَّخَذَهُ شَهِيدًا.
আমি নয়বার শপথ করে বলি যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিহত হয়েছেন—এটি আমার কাছে একবার শপথ করে বলার চেয়ে অধিক প্রিয় যে, তিনি নিহত হননি। কারণ আল্লাহ তাঁকে নবী করেছেন এবং তাঁকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন।
[শরহুয যুরকানি ‘আলা আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যাহ, খণ্ড ৭, পৃ. ৩৬৪]
উল্লিখিত শিয়া গ্রন্থগুলোর মধ্যে শায়খ তুসি, শায়খ মুফিদ ও বিশেষভাবে শায়খ সাদুকের বক্তব্য থেকে দেখা যায় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালকে বিষক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করার একটি সুস্পষ্ট শিয়া ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে শায়খ সাদুক খায়বারের বিষক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে তাঁর ইন্তেকালের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, কিছু সুন্নি সূত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর “নিহত” বা “শহীদ” হওয়া সম্পর্কে বক্তব্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর ভিত্তিতে সুন্নি মুসলিমদের সর্বসম্মত আকিদা হিসেবে “বিষপ্রয়োগে রাসুল ﷺ নিহত হয়েছেন”—এ কথা বলা সর্বজনবিদীত নয়।
অতএব, অধিক নির্ভুলভাবে বলা যায়: “রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকাল বিষক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল—এ মত শিয়া ঐতিহ্যের একাধিক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু সুন্নি সূত্রেও তাঁর শাহাদাত বা নিহত হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়। তবে উভয় ধারার সূত্রের সনদ, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সূত্রসমূহ
১. শায়খ তুসি, তাহযীবুল আহকাম, খণ্ড ৬, পৃ. ১।
২. শায়খ মুফিদ, আল-মুকনিআহ, পৃ. ৪৫৬।
৩. আল্লামা মাজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৯, পৃ. ২০৯।
৪. শায়খ সাদুক, আল-ই‘তিকাদাত, খণ্ড ১, পৃ. ৯৭।
৫. শরহুয যুরকানি ‘আলা আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যাহ, খণ্ড ৭, পৃ. ৩৬৪।
আপনার কমেন্ট