বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২৬ - ১২:৩৩
সৌদি-সমর্থিত তাকফিরি গোষ্ঠীর আল-আহসার শিয়াদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু

‘মুসাওয়ারাত’ অ্যাকাউন্ট আল-আহসা অঞ্চলে শিয়াদের বিরুদ্ধে একটি তাকফিরি গোষ্ঠীর কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছে। গোষ্ঠীটি ওয়াহাবিবাদের প্রচার এবং শিয়াদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘মুসাওয়ারাত’ নামের অ্যাকাউন্টটি ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে আল-আহসা অঞ্চলে শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি তাকফিরি গোষ্ঠীর তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার উদ্দেশ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করার সময় থেকে একটি ওয়াহাবি-তাকফিরি গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

গোষ্ঠীটি ওয়াহাবিবাদের প্রচার এবং শিয়াদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে আহসার বাসিন্দাদের শিয়াবাদ পরিত্যাগ করার আহ্বান জানাচ্ছে এবং তাদের ‘রাফেজি’ বলে অভিহিত করছে।

‘দারুল আলে ওয়াস-সুহব আল-ওয়াকফিয়্যাহ’ নামে পরিচিত এই তাকফিরি গোষ্ঠী এমন কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে শিয়াদের কাফির ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাদের ইমামদের-বিশেষ করে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-কে-অবমাননা করা হয়েছে।

‘মুসাওয়ারাত’ দাবি করেছে, এই তাকফিরি গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনপ্রাপ্ত। এর প্রধান কার্যালয় রিয়াদে এবং আল-আহসায় তাদের একটি শাখা রয়েছে।

‘মুসাওয়ারাত’ আল-আহসার এক সামাজিক কর্মীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গোষ্ঠীটি আল-আহসার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে, যাদের মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীও রয়েছেন, আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের তাকফিরি পুস্তিকা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • লাকাদ আতআবনা আশ-শির্ক (শিরক আমাদের ক্লান্ত করে দিয়েছে)-এই পুস্তিকায় আল-আহসার স্থানীয় ও আদিবাসী শিয়া জনগোষ্ঠীকে মুশরিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের হত্যা ও তাদের থেকে ‘মুক্তি’ পাওয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • হাকাবাতুন মিনাত-তারিখ (ইতিহাসের একটি যুগ)-কুয়েতের একজন নাসেবি লেখকের লেখা এই পুস্তিকায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাঁর হত্যাকারী ইয়াজিদ ইবনে মু‘আবিয়ার প্রতি বন্ধুত্বের আহ্বান জানানো হয়েছে।
  • আল-ইলযামাত আলা আকিদাতির রাফেজাহ ফিস সাহাবাহ-এই পুস্তিকার বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়াদের মুশরিক আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা অথবা দেশ থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এছাড়াও গোষ্ঠীটি ইরানের বিরোধিতা করে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো ছাপিয়ে বিতরণ করেছে। ‘মুসাওয়ারাত’ জানায়, আল-আহসার এক নাগরিক যখন এই প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত এক ওয়াহাবি ব্যক্তিকে শিয়াদের হত্যার উসকানি দেওয়ার সময় এসব কার্যক্রমের ‘আইনগত বৈধতা’ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তখন ওই ব্যক্তি জবাব দেন যে, গোষ্ঠীটি ‘পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আমির’ (সৌদ বিন নায়েফ) নামে পরিচিত ব্যক্তির দেওয়া সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে।

‘মুসাওয়ারাত’ আরও জানিয়েছে, তারা এমন তিন নাগরিকের নাম জানতে পেরেছে, যাদের এই তাকফিরি গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে মৌখিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে ‘আস-সালিহিয়াহ’ পুলিশ কেন্দ্রে আটক করা হয়েছে।

আল-আহসার ওই সামাজিক কর্মীকে যখন প্রশ্ন করা হয়, শিয়া-অধ্যুষিত এই অঞ্চলে ওয়াহাবি প্রচারণার কারণ কী, তিনি বলেন, আল-আহসায় এই তাকফিরি গোষ্ঠীর তৎপরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে নতুন বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কার্যক্রমের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ হতে পারে, সৌদি শাসকগোষ্ঠীর জন্য সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকটের সময় সাম্প্রদায়িকতাবাদ সৌদি শাসনব্যবস্থার একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছে।

মুসাওয়ারাত-এ প্রকাশিত টুইটের বক্তব্য:

“একটি ওয়াহাবি তাকফিরি গোষ্ঠী আল-আহসার শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কার্যক্রমের গতি বাড়িয়েছে… এই তাকফিরি গোষ্ঠীটি সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনপ্রাপ্ত। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার আগে এই গোষ্ঠী তাদের কার্যক্রমের স্থানসংলগ্ন এলাকায় ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।

তাকফিরি গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে মৌখিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার কারণে আল-আহসার অন্তত তিন বাসিন্দাকে আটক করা হয়েছে।”

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আশ-শিরক আল-আকবার (বড় শিরক) নামে একটি ধারণার অধীনে সৌদি আরবের শিক্ষাব্যবস্থা সুফি, ইমামিয়া, ইসমাইলিয়া ও মু‘তাজিলা-এ ধরনের ইসলামী সম্প্রদায়কে ইসলামের পরিসর থেকে বাইরে বলে বিবেচনা করে; প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বিষয়টি পাঠ্যবইয়েও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে ২০০৬–২০০৭ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় মাধ্যমিক শ্রেণির ‘তাওহিদ’ বইয়ের কথা বলা হয়েছে। সেখানে কবরবাসীদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কবর প্রদক্ষিণ, তাদের উদ্দেশে কোরবানি ও মানত এবং তাদের কাছে দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনাকে প্রকাশ্য কুফরের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ২০১৩–২০১৪ শিক্ষাবর্ষের একটি পাঠ্যবইয়ে বাতিনিয়া মতবাদ, দার্শনিক এবং আসমানি ধর্মাবলম্বীদের কাফির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি শিক্ষাক্রমের আলোচনায় প্রকাশ্য কুফর একটি ফিকহি বিধানের মতো কাজ করে, যা শিক্ষার্থীদের অন্যদের বিশ্বাস সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ববোধের দিকে পরিচালিত করে। এর সঙ্গে ‘বারাআত’ বা সম্পর্কচ্ছেদের ধারণা যুক্ত করা হয় এবং তাদের এমন কর্মকাণ্ডের দিকে আহ্বান করা হয়, যার মাধ্যমে ‘প্রকাশ্য কুফর’-এর স্থলে ‘প্রকাশ্য ঈমান’ প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতিবেদনের দাবি, এর চূড়ান্ত পরিণতি ধ্বংস ও হত্যাকে বৈধ মনে করার দিকে যেতে পারে, কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঈমান ও কুফর একই সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না।

অন্যভাবে বললে, প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, প্রকাশ্য কুফর এমন এক ধরনের উসকানিমূলক ধারণা, যার মাধ্যমে সৌদি আরবে শিশুদের শৈশব থেকেই এমন মানসিকতায় গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তী সময়ে সহিংসতার দিকে পরিচালিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও একটি পাঠ্যবইয়ের উদ্ধৃতি হিসেবে বলা হয়েছে যে, ইহুদি, খ্রিস্টান ও মূর্তিপূজকদের মতো ইসলাম-বহির্ভূত ধর্মাবলম্বীদের কাফির ঘোষণা করা আবশ্যক—এমনকি যে ব্যক্তি তাদের কাফির ঘোষণা করবে না বা তাদের কুফর সম্পর্কে সন্দেহ করবে, তাকেও কাফির বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের মতে, ২০১৩–২০১৪ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় মাধ্যমিক শ্রেণির ‘তাওহিদ’ বইয়ের ৩০ নম্বর পৃষ্ঠায় ইসলাম-বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মকে কাফির বলা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন ইসলামী মতবাদকে (ওয়াহাবিদের বাদ দিয়ে) ‘আশ-শিরক আল-আকবার’ বা বড় শিরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে-যার পরিণতি হিসেবে তাকফির এবং তাদের রক্তপাতকে বৈধ মনে করার বিধান দাঁড় করানো হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মুসাওয়ারাত নিজেকে একটি সংবাদ ও আইনবিষয়ক মাধ্যম হিসেবে পরিচয় দেয়, যা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল-যেমন কাতিফ ও আল-আহসা-এবং আশপাশের দেশগুলোর সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ, প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha