বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:৩৯
ইমাম রেজা (আ.) কীভাবে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)’র বেলায়াতকে উম্মাহর নাজাতের রহস্য হিসেবে তুলে ধরেছেন?

ইমাম রেজা (আ.) কীভাবে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)’র বেলায়াতকে উম্মাহর নাজাতের রহস্য হিসেবে তুলে ধরেছেন?

হাদিসে কুদসি وَلایةُ علیّ بن أبی‌طالبٍ حِصنی — শিয়া-সুন্নি সূত্রে একটি পর্যালোচনা

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর বেলায়াত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। আল্লাহর নৈকট্য ও আখিরাতের নাজাতের সঙ্গে যেমন এর সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সঠিক নেতৃত্ব এবং বিভ্রান্তি ও ফিতনা থেকে নিরাপত্তার সঙ্গেও এর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইমাম রেজা (আ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে কুদসিতে এই বেলায়াতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুদৃঢ় দুর্গ বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হাদিসটির মূল বক্তব্য হলো—

قَالَ یَقُولُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ: وَلَایَةُ عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِبٍ حِصْنِی فَمَنْ دَخَلَ حِصْنِی أَمِنَ مِنْ عَذَابِی.

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বলেন: “আলী ইবনে আবি তালিবের বেলায়াত আমার দুর্গ। অতএব যে আমার দুর্গে প্রবেশ করবে, সে আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকবে।”

এই বাণীর গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে ‘বেলায়াত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে এবং কীভাবে তা মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত—তা অনুধাবন করা প্রয়োজন।

হাদিসটির সূত্র ও বর্ণনাপরম্পরা
এই হাদিসটি বিভিন্ন সনদে এবং সামান্য শব্দগত পার্থক্যসহ শিয়া ও সুন্নি উভয় ধারার হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। শিয়া আলেমদের মধ্যে শাইখ সাদুক (রহ.) ও শাইখ তুসি (রহ.) এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আহলে সুন্নাতের আলেমদের মধ্যেও এটি বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়।

হাকিম হুসকানি (রহ.), যিনি হানাফি মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন, তাঁর ‘শাওয়াহিদুত তানযিল’ গ্রন্থে সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াত—

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِیعًا وَلَا تَفَرَّقُوا.

অর্থাৎ, “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না”—এর ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে এই হাদিস উল্লেখ করেছেন।

এ ছাড়া ইবনে মারদুয়াইহ (রহ.) তাঁর ‘মানাকিবু আলী ইবনে আবি তালিব’ গ্রন্থে এবং আবু নু‘আইম ইসফাহানি (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হিলইয়াতুল আওলিয়া’-তেও এই হাদিস বর্ণনা করেছেন। আবু নু‘আইম এ হাদিসের সনদ সম্পর্কে এটিকে প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হাদিসটি যেহেতু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে জিবরাইল (আ.) এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার বাণী হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, তাই এটি হাদিসে কুদসি হিসেবে পরিচিত।

‘উয়ুনু আখবারির রেজা’-তে হাদিসটির বর্ণনা
শাইখ সাদুক (রহ.)-এর ‘উয়ুনু আখবারির রেজা (আ.)’ গ্রন্থে ইমাম রেজা (আ.) থেকে তাঁর পবিত্র পূর্বপুরুষদের সূত্রে, তাঁদের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত এবং সেখান থেকে জিবরাইল (আ.), মিকাইল (আ.), ইসরাফিল (আ.) এবং লওহ ও কলম পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সনদে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।

হাদিসটির মূল বক্তব্য হলো—

قَالَ یَقُولُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ: وَلَایَةُ عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِبٍ حِصْنِی فَمَنْ دَخَلَ حِصْنِی أَمِنَ مِنْ عَذَابِی.

“আলী ইবনে আবি তালিবের বেলায়াত আমার দুর্গ। অতএব যে আমার দুর্গে প্রবেশ করবে, সে আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকবে।”

অন্য বর্ণনায় এর সঙ্গে «وَأَمِنَ مِنْ نَارِي»—অর্থাৎ, “এবং আমার আগুন থেকে নিরাপদ থাকবে”—অর্থবোধক বক্তব্যও এসেছে।

এখানে ‘দুর্গ’ বা حِصْن-এর উপমাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দুর্গ যেমন মানুষকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, তেমনি আলী (আ.)-এর বেলায়াত মানুষকে ভ্রান্তি, অবাধ্যতা ও আল্লাহর শাস্তির পথ থেকে রক্ষার একটি আধ্যাত্মিক আশ্রয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

বেলায়াত বলতে কী বোঝায়?
শুধু মুখে আলী (আ.)-কে ভালোবাসার নাম বেলায়াত নয়। বেলায়াতের মধ্যে ভালোবাসা, আনুগত্য, অনুসরণ এবং তাঁর আদর্শের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক—সবই অন্তর্ভুক্ত।

একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বেলায়াত অর্থ হলো—মানুষ তার চিন্তা ও কর্মে আলী (আ.)-এর অনুসারী হবে এবং তাঁর সঙ্গে এমন দৃঢ় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন করবে, যাতে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।

অর্থাৎ, বেলায়াত কেবল একটি আবেগগত সম্পর্ক নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা, জীবনদর্শন ও কর্মপদ্ধতিকে আলী (আ.)-এর আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করার নাম।

এ কারণেই হাদিসের ‘দুর্গ’ উপমাটি অত্যন্ত গভীর। কেউ যদি সত্যিকার অর্থে এই দুর্গে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে কেবল নামমাত্র ভালোবাসা নয়, বরং আলী (আ.)-এর ন্যায় সত্য, ন্যায়বিচার, তাকওয়া, সাহস, জ্ঞান ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে চলতে হবে।

বেলায়াত—সত্যের পক্ষ অবলম্বনের মানদণ্ড
আরবি «وَلایة» শব্দের একটি অর্থ হলো সাহায্য ও সমর্থন। তবে এটি এমন সাহায্য, যা ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ভিত্তিতে করা হয়।

এই অর্থে আলী (আ.)-এর বেলায়াত মানে হলো—তাঁর আদর্শ ও ন্যায়নীতির প্রতি আন্তরিকভাবে অবিচল থাকা এবং সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী শক্তির মোকাবিলায় ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করা।

এ জন্য শুধু আলী (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব ও জীবন সম্পর্কে জানা যথেষ্ট নয়; তাঁর আদর্শের বিপরীত চিন্তা ও চরিত্রকেও চেনা প্রয়োজন। কারণ সত্যের অনুসারী হতে হলে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

আজকের যুগে আলী (আ.)-এর বেলায়াতের দাবি হলো—তাঁর জ্ঞান, ন্যায়বিচার, তাকওয়া, মানবিকতা, সাহস এবং সত্যনিষ্ঠ জীবনকে জানা এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।

বেলায়াতের দ্বিতীয় অর্থ: ভালোবাসা ও মহব্বত
‘বেলায়াত’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো ভালোবাসা ও আন্তরিক মহব্বত। তবে এই ভালোবাসা নিছক আবেগ নয়; এর সঙ্গে অনুসরণ ও আনুগত্য অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِی یُحْبِبْکُمُ اللَّهُ...

“বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন…”

অর্থাৎ প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ হলো অনুসরণ।

আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার প্রসঙ্গে কুরআনের আরেকটি আয়াত হলো—

...قُلْ لَا أَسْأَلُکُمْ عَلَیْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِی الْقُرْبَى...

“বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না, তবে আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা চাই।”

সুতরাং আলী (আ.)-এর বেলায়াতের অর্থ হলো—তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর মর্যাদা স্বীকার করা, তাঁর পথ অনুসরণ করা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা।

বেলায়াত ও পার্থিব বিপর্যয় থেকে উম্মাহর নিরাপত্তা
হাদিসে কুদসিতে বেলায়াতকে আল্লাহর দুর্গ বলা হয়েছে। এই ‘নিরাপত্তা’ শুধু আখিরাতের শাস্তি থেকে নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি সামাজিক ও পার্থিব দিকও রয়েছে।

যখন একটি উম্মাহ সত্য, ন্যায় ও ঐক্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার ওপর নানা ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে—অভ্যন্তরীণ সংঘাত, পারস্পরিক শত্রুতা, অন্যায়ের বিস্তার এবং বহিঃশক্তির আধিপত্য ইত্যাদি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِیعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْکُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَیْکُمْ إِذْ کُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَیْنَ قُلُوبِکُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَکُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَکُمْ مِنْهَا...

“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো—যখন তোমরা পরস্পরের শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরসমূহে ভালোবাসা সৃষ্টি করলেন; ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা আগুনের একটি গর্তের কিনারায় অবস্থান করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন…”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩)

এই আয়াতে ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতিকে আগুনের গর্ত থেকে উদ্ধারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভক্তি ও পারস্পরিক সংঘাত একটি উম্মাহকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ফিতনা— হত্যার চেয়েও ভয়াবহ
পবিত্র কুরআনে আরও বলা হয়েছে—

وَاقْتُلُوهُمْ حَیْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِنْ حَیْثُ أَخْرَجُوکُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ...

“তোমরা তাদের যেখানে পাও, সেখানেই প্রতিহত করো এবং যেখান থেকে তারা তোমাদের বহিষ্কার করেছে, সেখান থেকে তাদের বহিষ্কার করো। আর ফিতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর…”
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৯১)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَکُونَ فِتْنَةٌ وَیَکُونَ الدِّینُ لِلَّهِ...

“আর তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, যতক্ষণ না ফিতনা অবশিষ্ট না থাকে এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়…”
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৩)

এখানে ‘ফিতনা’ বলতে কুফর, শিরক, নিপীড়ন ও এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানুষ সত্য ও আল্লাহর আনুগত্যের পথ থেকে বাধাগ্রস্ত হয়।

ইমাম রেজা (আ.)-এর বর্ণিত «وَلَایَةُ عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِبٍ حِصْنِی»—“আলী ইবনে আবি তালিবের বেলায়াত আমার দুর্গ”—এই হাদিসের তাৎপর্য তাই অত্যন্ত ব্যাপক।

এখানে বেলায়াতকে কেবল একটি তাত্ত্বিক বিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্য, সত্যের অনুসরণ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সঠিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁদের আদর্শ অনুসরণের একটি সমন্বিত জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায়।

অতএব, আলী (আ.)-এর বেলায়াতের প্রকৃত দাবি হলো—তাঁকে জানা, ভালোবাসা, তাঁর ন্যায় ও সত্যনিষ্ঠ আদর্শকে গ্রহণ করা এবং চিন্তা ও কর্মে তাঁর পথ অনুসরণ করা। এই অর্থেই বেলায়াত মানুষের জন্য আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপত্তার একটি আধ্যাত্মিক দুর্গে পরিণত হয় এবং উম্মাহকে বিভ্রান্তি, বিভক্তি ও ফিতনার পথ থেকে সত্য ও ন্যায়ের দিকে ফিরিয়ে আনার শক্তি অর্জন করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha