বুধবার ১৯ আগস্ট ২০২৬ - ১৪:৫৮
কেন গীবত এত মধুর লাগে, আর কী তাকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে?

নৈতিকতা অধিকারবোধের চেয়ে অগ্রগণ্য। তবে অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও অধিকার পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেমন—তওবার ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার বা হক্কুল ইবাদ আদায় করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সন্তুষ্টি অর্জন করা অপরিহার্য।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: গীবত ও অপবাদ আজ সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাও কঠিন। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতা যেন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে, সৎগুণের বিকাশে এবং সামাজিক অনাচার কমানোর প্রচেষ্টা থেকে বিরত না করে।

তওবার শর্ত: মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া
এ প্রসঙ্গে শহীদ অধ্যাপক মুর্তজা মোতাহহারির আজাদী-ই মানাভি গ্রন্থের ১৪০ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে সামান্য সম্পাদিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা তুলে ধরা হলো।

শহীদ মোতাহহারি বলেন,

“তওবার প্রথম শর্ত হলো মানুষের অধিকার—অর্থাৎ হক্কুল ইবাদ—আদায় করা। আল্লাহ ন্যায়বিচারক; তিনি তাঁর বান্দাদের অধিকার উপেক্ষা করেন না।

কারও সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকলে তা তার মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা অন্তত তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে। কারও গীবত করে থাকলে তার কাছ থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে তাকে বলতে হবে: ‘ভাই, আমি আপনার গীবত করেছি। অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।’”

এরপর তিনি নিজের জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন:

“আমি যখন তালেবে ইলম ছিলাম, তখনও—যদিও অন্যান্য পরিবেশের তুলনায় কম—এমন ঘটনা ঘটত যে, কোনো বৈঠকে বসলে কিছু মানুষ অমুক-তমুক ব্যক্তির গীবত করতেন। কখনো কখনো আমিও সেই পরিবেশে জড়িয়ে পড়তাম।


আল্লাহ প্রয়াত আয়াতুল্লাহিল উজমা হাজ্জাতকে রহমত করুন। একবার আমি এমন কিছু মানুষের সঙ্গে ছিলাম, যাদের আলোচনায় তিনি গীবতের শিকার হন। অথচ তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক; তাঁর কাছে আমি বহু বছর পড়াশোনা করেছি। এমনকি তাঁর দরসে অনুষ্ঠিত একটি সাধারণ প্রতিযোগিতায় তাঁর কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলাম।

একসময় আমার মনে হলো—এটি ঠিক হচ্ছে না। আমি কেন এমন পরিবেশে বসে আছি?”

তিনি বলেন, এক গ্রীষ্মে আয়াতুল্লাহ হাজ্জাত হযরত আবদুল আজিমে অবস্থান করছিলেন। একদিন বিকেলে মোতাহহারি তাঁর বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাতের অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করে বলেন, “হুজুর, আমি একটি বিষয় আপনাকে বলতে এসেছি।”

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী বিষয়?”

আমি বললাম, “আমি আপনার গীবত করেছি। অবশ্য খুব বেশি নয়; তবে আপনার সম্পর্কে অন্যদের অনেক গীবত শুনেছি। এখন আমি এ জন্য অনুতপ্ত। কেন আমি এমন বৈঠকে বসেছিলাম, কেন আপনার গীবত শুনেছিলাম এবং কেন কখনো কখনো নিজেও আপনার সম্পর্কে গীবতের কথা বলেছিলাম—এ জন্য আমি লজ্জিত।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে আর কখনো আপনার গীবত করব না এবং অন্য কারও কাছ থেকেও আপনার গীবত শুনব না। তাই নিজে এসে আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

আয়াতুল্লাহ হাজ্জাত অত্যন্ত উদারতার সঙ্গে বললেন,

“আমাদের মতো ব্যক্তিদের গীবত দুই ধরনের হতে পারে। এক ধরনের গীবত এমন, যা ইসলামের অবমাননার পর্যায়ে পড়ে; আরেকটি হলো, যা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।”

মোতাহহারি বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর কথাগুলো দ্বিতীয় ধরনের।

তিনি বললেন, “না, আমি এমন কোনো কথা বলিনি বা এমন কোনো অসম্মান করিনি, যাতে ইসলামের অবমাননা হয়। যা কিছু বলেছি, তা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।”

তখন আয়াতুল্লাহ হাজ্জাত বললেন, “আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।”

আল্লাহ শহীদ মোতাহহারী ও আয়াতুল্লাহ হাজ্জাতের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।

গুনাহের মিষ্টতা
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক।

একটি সমাবেশে আমি বলেছিলাম, “মনে হয় গীবত বেশ মধুর!”

একজন বললেন, “খুবই মধুর, খুব!”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, শয়তান ও মানুষের নফসই গুনাহকে মানুষের কাছে মধুর ও আকর্ষণীয় করে তোলে।”

কেউ হয়তো বলতে পারেন, বর্তমান সমাজে গীবত ও অপবাদ এতটাই ব্যাপক হয়ে উঠেছে যে, এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধই যেন কার্যকর হচ্ছে না। এটি যেন এক প্রবল বন্যার মতো—যার স্রোত আমাদের হাতে থাকা ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে থামানো সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি নসিহত করা কিংবা একটি নিবন্ধ লেখা যেন ঝড়ের সামনে একমুঠো খড়কুটো ছুড়ে দেওয়ার মতো।

আমরা বলব—হ্যাঁ, বাস্তবতা হয়তো এমনই। কিন্তু তাহলে কি আমাদের কিছুই করার নেই?

এই প্রবল স্রোতের সামনে কি কোনো প্রচেষ্টাই করা উচিত নয়? আমরা কি নৈতিকতার ভিত্তিকে ধ্বংস হতে দেব এবং এর মাধ্যমে আমাদের ইহকাল ও পরকাল—উভয় জীবনকেই বিপর্যস্ত হতে দেব?

তাহলে আমাদের করণীয় কী?
আমাদের নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের প্রচেষ্টা হয়তো খুব সামান্য; তবুও এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও অনাচার কমানো এবং কিছুটা হলেও নৈতিক গুণাবলির প্রসার ঘটানো সম্ভব। অন্তত এতটুকু চেষ্টা তো করা উচিত, যাতে আল্লাহর কাছে আমরা সামান্য হলেও গ্রহণযোগ্য হই এবং তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন।

সমুদ্রের সমস্ত পানি যদি তুলে আনা সম্ভব না হয়, তাই বলে কি এক চুমুক পানিও পান করা যাবে না?

শহীদ মোতাহহারি যদি সমাজ থেকে গীবত সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না-ও পারেন, তবুও তাঁর সেই নৈতিক সাহস ও আত্মশুদ্ধির ঘটনা থেকে আমরা আজ যে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করছি—তা কি কম মূল্যবান?

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha