বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট ২০২৬ - ১৫:২৮
কেন আল্লাহ অজ্ঞতা সৃষ্টি করেছেন?

মানুষ এমন এক সত্তা, যার মধ্যে বুদ্ধি, প্রবৃত্তি ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এই সক্ষমতাই তাকে পতন ও উৎকর্ষ—দুই সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড় করিয়েছে। অজ্ঞতা হলো বুদ্ধি ও জ্ঞানের প্রতি মনোযোগের অভাব। আর মানুষের এই নির্বাচনক্ষমতাই তাকে বিকশিত হয়ে এমন মর্যাদায় পৌঁছানোর সুযোগ দেয়, যা ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চতর হতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গিতে আল্লাহ অজ্ঞতা সৃষ্টি করেননি; বরং তিনি বুদ্ধি ও জ্ঞান সৃষ্টি করেছেন। মানুষ যখন তার বুদ্ধি ও জ্ঞানকে উপেক্ষা করে, তখনই অজ্ঞতার অর্থ প্রকাশ পায়। মানুষ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হয়ে বুদ্ধি ও প্রবৃত্তির মধ্যে নির্বাচন করে। আর এই নির্বাচনই তার উন্নতি কিংবা পতনের মূল কারণ।

আল্লাহ অজ্ঞতা সৃষ্টি করেননি; বরং তিনি জ্ঞান ও বুদ্ধি সৃষ্টি করেছেন। যেখানে বুদ্ধি ও জ্ঞানের প্রতি মনোযোগ থাকে না, সেখানেই অজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে। অর্থাৎ, আল্লাহ যা অস্তিত্বশীল, তা সৃষ্টি করেছেন; যা অস্তিত্বহীন, তা সৃষ্টি করেননি। যেমন, আমাদের সামনে কোনো গাছ না থাকলে কে সেই গাছটি রোপণ করেছে—এ প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু একটি টেবিলের মতো অস্তিত্বশীল কোনো বস্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায়, কে এটি তৈরি করেছে। বুদ্ধিও অস্তিত্বশীল এবং আল্লাহই তা সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ বুদ্ধি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তাঁর বান্দারা বিকশিত হন, পূর্ণতায় পৌঁছান এবং তাঁর দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু তিনি অজ্ঞতা সৃষ্টি করেননি। যারা বুদ্ধিকে উপেক্ষা করে এবং তার নির্দেশনা অনুসরণ করে না, তারা কার্যত বুদ্ধির অনুপস্থিতির অবস্থানে চলে যায়; এই অবস্থাকেই অজ্ঞতা বলা হয়।

বুদ্ধির বিকাশেই মানুষের উন্নতি
মানুষের প্রকৃতিগত সত্তায় বুদ্ধি বিদ্যমান, যাকে ‘স্বভাবজাত বুদ্ধি’ (আকল বিল-ফিতরাহ) বলা হয়। তবে মানুষের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই বুদ্ধি একাই যথেষ্ট নয়। স্বভাবজাত বুদ্ধিকে অর্জিত বুদ্ধি (আকল বিল-মালাকাহ), এরপর কার্যকর বুদ্ধি (আকল বিল-ফি‘ল) এবং শেষ পর্যন্ত অর্জিত পরিপক্ব বুদ্ধি (আকল মুস্তাফাদ)-এ উন্নীত হতে হয়। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই মানুষের বিকাশ ঘটায় এবং তাকে এমন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে, যেখানে সে ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

মানুষের বুদ্ধি যদি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ অবস্থায় সৃষ্টি করা হতো, তাহলে মানুষের সঙ্গে ফেরেশতাদের কোনো পার্থক্য থাকত না। সে ক্ষেত্রে মানুষের কোনো বিশেষ অর্জনও থাকত না। একটি বর্ণনায় এসেছে, পশুকে কেবল প্রবৃত্তি, ফেরেশতাকে কেবল বুদ্ধি এবং মানুষকে বুদ্ধি ও প্রবৃত্তির সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।

মানুষের বুদ্ধি যদি তার প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হয়, তাহলে সে ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে। কারণ ফেরেশতাদের প্রবৃত্তি নেই এবং তারা তাদের বুদ্ধির অনুসরণ করে। কিন্তু মানুষ প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও যখন বুদ্ধির অনুসরণ করে, তখন তার এই নির্বাচনই তাকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়।

অন্যদিকে, মানুষ যদি নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তাহলে সে পশুর চেয়েও নিচে নেমে যেতে পারে। কারণ প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পশুর বুদ্ধি নেই এবং সে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। কিন্তু মানুষ বুদ্ধির অধিকারী হয়েও যদি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তাহলে তার পতন আরও গুরুতর।

অতএব, মানুষের বুদ্ধির বিকাশের সক্ষমতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকা জরুরি। বুদ্ধি ও জ্ঞান যদি বৃদ্ধি ও বিকাশের যোগ্য না হতো, তাহলে মানুষ একটি নির্দিষ্ট পর্যায়েই থেমে যেত এবং তার আর উন্নতির সুযোগ থাকত না।

স্বাধীন ইচ্ছা: মানবসত্তা ও বিকাশের অপরিহার্য শর্ত
মানুষের মধ্যে যে অজ্ঞতাজনিত প্রবণতা দেখা যায়, সে বিষয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এখানে অজ্ঞতা বলতে শুধু গুনাহ বোঝানো হচ্ছে না; কারণ প্রতিটি গুনাহের সঙ্গেই কোনো না কোনো ধরনের অজ্ঞতা ও অজ্ঞতাপ্রসূত আচরণ জড়িত থাকে। এই অজ্ঞতাজনিত আচরণ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও নির্বাচনক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের মধ্যে যদি এ ধরনের নির্বাচনের সুযোগ না থাকত, তাহলে তার স্বাধীন ইচ্ছাও থাকত না।

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকলে সে আর মানুষ থাকত না; সে হয় ফেরেশতা, নয়তো পাথর বা এ ধরনের কোনো সত্তা হতো। মানুষের বিকাশ এবং তার মানবিক সত্তার প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে তার নির্বাচন করার সক্ষমতার মধ্যে। অর্থাৎ, সে গুনাহ করতে পারে এবং একই সঙ্গে গুনাহ থেকে বিরতও থাকতে পারে। এই সম্ভাবনা না থাকলে উন্নতি, স্বাধীন ইচ্ছা ও মানবিকতারও কোনো অর্থ থাকত না।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,

“নিশ্চয়ই আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে আমানত পেশ করেছিলাম। তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং এ বিষয়ে ভীত হলো। কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে ছিল অত্যন্ত জালিম ও অজ্ঞ।” —সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭২

এই আয়াতে মানুষের আমানত বহনের সক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

যখন মানুষের আমানত বহনের সক্ষমতার সঙ্গে আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সক্ষমতার তুলনা করা হলো, তখন দেখা গেল—আকাশ তা বহন করতে সক্ষম নয়, পৃথিবীও এর ভার বহনের উপযুক্ত নয় এবং পর্বতমালারও তা বহন করার সামর্থ্য নেই। কিন্তু মানুষ এই আমানত বহনের সক্ষমতা রাখে।

অথচ এই মানুষই আবার ‘জালিম’ ও ‘অজ্ঞ’ হতে পারে। যে মানুষ অন্যায় করতে এবং অজ্ঞ হতে পারে, সেই মানুষই এমন এক মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে সে এমন আমানত বহন করে, যা অন্য কোনো সত্তা বহন করতে সক্ষম হয়নি এবং যার ভার আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালাও বহন করতে পারেনি।

‘জালিম ও অজ্ঞ’ হওয়ার তাৎপর্য
‘জালিম’ ও ‘অজ্ঞ’—এই দুটি শব্দের তাৎপর্য ‘আদম ও মালাকাহ’ নীতির আলোকে বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গুণের অনুপস্থিতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই গুণের অধিকারী হওয়ার সক্ষমতা বা যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট সত্তার মধ্যে থাকে।

যেমন, আমরা কোনো পাথরকে ‘অন্ধ’ বলি না। কারণ পাথরের চোখ থাকার কথা নয়। কিন্তু কোনো মানুষকে যখন ‘অন্ধ’ বলা হয়, তখন এর কারণ হলো—তার দেখার সক্ষমতা থাকার কথা ছিল।

একইভাবে কোনো ব্যক্তিকে ‘অজ্ঞ’ বলা হয় এ কারণে যে তার জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। যার মধ্যে এমন সক্ষমতা বা যোগ্যতা নেই, তার ক্ষেত্রে ‘জালিম’ বা ‘অজ্ঞ’ হওয়ার বিষয়টি অর্থবহ হয় না।

এই বিষয় থেকেই মানুষের মহত্ত্ব, সক্ষমতা ও মানবিক সত্তার গভীরতা উপলব্ধি করা যায়। মানুষ এমন এক সত্তা, যার স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে। সে জালিম, অজ্ঞ ও গুনাহগার হতে পারে; আবার একই মানুষ ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী, পরহেজগার ও ইবাদতকারীও হতে পারে।

মানুষের মধ্যে যে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে সে অন্যায়, অজ্ঞতা ও গুনাহের পথে যেতে পারে—সেই স্বাধীন ইচ্ছাই না থাকলে ন্যায়, জ্ঞান, তাকওয়া ও ইবাদতেরও কোনো অর্থ থাকত না। মানুষের মর্যাদা ও বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হলো তার নির্বাচনক্ষমতা; সে কোন পথ বেছে নেবে, তার ওপরই তার উৎকর্ষ কিংবা পতন নির্ভর করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha