হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইলমিয়ার নৈতিক শিক্ষক ও নৈতিকতা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ রহিম তাওয়াক্কুলের বক্তব্যের আলোকে আত্মশুদ্ধি, প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিকতার বাস্তব শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ‘নৈতিক শিক্ষা’ শীর্ষক ধারাবাহিক আয়োজনের অষ্টম পর্ব পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
এই পৃথিবী হলো ‘কর্মের জগৎ’। মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার কর্মজীবন শুরু হয়। আর যখন সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, তখন তার কর্ম করার সুযোগও শেষ হয়ে যায়।
হাদিসে বলা হয়েছে:
اِذا ماتَ الاِنْسانُ اِنْقَطَعَ عَمَلُهُ
“মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়।”
পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর মানুষের চোখ, জিহ্বা, হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আর কোনো আমল করার সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ আমল করার সব উপকরণই অকেজো হয়ে যায়।
দুনিয়া হলো আমল করার স্থান। মানুষ যতক্ষণ পৃথিবীতে অবস্থান করে, ততক্ষণ তার জন্য আমল করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার কাছ থেকে আর কোনো নতুন আমল সংঘটিত হয় না।
এ কারণেই বিভিন্ন হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষের ওপর যখন সমস্যা ও বিপদ-আপদ নেমে আসে, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে মৃত্যুর প্রার্থনা না করে। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের আর কোনো আমল করার সুযোগ থাকে না। ফলে তার মর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে অবনতিই ঘটে।
বরং আল্লাহর কাছে দীর্ঘ জীবন প্রার্থনা করা উচিত—তবে বরকতময় জীবন, যাতে মানুষ নেক আমল করতে এবং নিজের উন্নতি সাধন করতে পারে। এটিও মানুষের জন্য একটি সৌভাগ্য।
হাদিসে এসেছে:
طوبی لِمَن طالَ عُمرُهُ و حَسُنَ عَمَلُهُ
“সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যার আয়ু দীর্ঘ এবং যার আমল উত্তম।”
পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর মানুষ বরযখের জগতে প্রবেশ করে। এই জগতের অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর জীবন থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন।
হাদিসে এসেছে, পৃথিবীর নীচতার অন্যতম নিদর্শন হলো—একমাত্র এই জগতেই আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয়। অন্যদিকে অন্যান্য জগতের সৃষ্টিগুলো মহান আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যে রয়েছে।
পৃথিবীর নীচতার আরেকটি দিক হলো, এখানে ঈমানদারদের সঙ্গে অবিশ্বাসীরা পাশাপাশি বসবাস করে এবং পরহেজগারদের সঙ্গে পাপাচারীরাও একই সমাজে অবস্থান করে।
কিন্তু মানুষ যখন মৃত্যুর পথ অতিক্রম করে অন্য জগতে প্রবেশ করে, তখন এই মিশ্রণ আর থাকে না। সেখানে “কবুতর কবুতরের সঙ্গে এবং বাজপাখি বাজপাখির সঙ্গে” থাকবে। অর্থাৎ নেককাররা এক স্থানে এবং অসৎ ব্যক্তিরা অন্য স্থানে থাকবে।
পৃথিবী হলো সব জগতের মধ্যে সবচেয়ে সীমিত; বরযখ একটি মহান জগত এবং কিয়ামতের জগত তার চেয়েও মহত্তর।
কিয়ামতে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে, যেগুলোকে ‘প্রতিশ্রুত জান্নাত’ ও ‘প্রতিশ্রুত জাহান্নাম’ বলা হয়। একইভাবে বরযখের জগতেও জান্নাত ও জাহান্নাম রয়েছে, যেগুলোকে ‘বরযখের জান্নাত’ ও ‘বরযখের জাহান্নাম’ বলা হয়।
হাদিসে এসেছে:
اِنَّ الْقَبْرَ رَوْضَةٌ مِنْ رِیاضِ الجَنَّةِ اَوْ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرِ النّیران
“কবর হয় জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান, অথবা জাহান্নামের গর্তগুলোর একটি গর্ত।”
এই হাদিস বরযখের জগতে জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এরপর বরযখের জগতের পর কিয়ামতের জগত শুরু হবে।
কিয়ামতের দিন অত্যন্ত ভয়াবহ একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তখন কেবল একটি নির্দেশই দেওয়া হবে:
إلی الجنّة» অথবা «إلی النّار
অর্থাৎ—“জান্নাতের দিকে” অথবা “জাহান্নামের দিকে।”
হয় ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে, অথবা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর নির্দেশ দেওয়া হবে। এর বাইরে তৃতীয় কোনো অবস্থা থাকবে না।
সেখানেই মানুষের অন্তরে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হবে—তার জন্য কোন নির্দেশ অপেক্ষা করছে? জান্নাতের দিকে যাওয়ার নির্দেশ, নাকি জাহান্নামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ? এই উদ্বেগ অত্যন্ত ভারী; কারণ জাহান্নাম হলো দুর্ভাগ্য, লাঞ্ছনা ও দুর্দশার স্থান।
পৃথিবী সীমিত হওয়ার কারণে এখানকার পুরস্কার ও শাস্তিও তুলনামূলকভাবে সীমিত। এটি এমন একটি ছোট পাত্রের মতো, যাতে অল্প পরিমাণ পানি ধারণ করা যায়।
অন্যদিকে বরযখ যেহেতু একটি মহান জগত, তাই সেখানে পুরস্কার ও শাস্তিও আরও গুরুতর হবে। আর কিয়ামতের জগত যেহেতু সর্বাধিক মহত্তর, সেখানে পুরস্কার ও শাস্তি আরও তীব্র ও কঠিন হবে। কারণ সেই জগতের পরিসরও আরও ব্যাপক।
বিষয়টি বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কোনো ব্যক্তি—আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন—পৃথিবীতে ব্যভিচারের মতো একটি গুনাহ করল। এক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে।
প্রথম অবস্থা: কেউ তার এই গুনাহ সম্পর্কে জানতে পারল না, কোনো আদালতও বসলো না এবং কোনো শাস্তির রায়ও হলো না। কিন্তু ওই ব্যক্তি গুনাহ করার পর সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হলো, নিজের কাজের জন্য লজ্জিত হলো এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল যে, আর কখনো এই গুনাহের দিকে ফিরে যাবে না। যদি তার অনুতাপ ও সংকল্প সত্যিকার হয়, তাহলে আল্লাহ তার এই তওবার বরকতে আমলনামা থেকে ওই গুনাহ মুছে দেবেন; এমনভাবে যেন সে কোনো গুনাহই করেনি।
দ্বিতীয় অবস্থা: আদালত ওই গুনাহ সম্পর্কে জানতে পারল, রায় দেওয়া হলো এবং শাস্তি কার্যকর করা হলো। যদি কোনো অবিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং তার ওপর শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তি—যেমন একশ বেত্রাঘাত—কার্যকর করা হয়, তাহলে এই শাস্তি কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ওই গুনাহ থেকে সে পবিত্র হয়ে যাবে; যদিও তার অন্যান্য গুনাহগুলো স্বতন্ত্রভাবে থেকে যাবে।
তৃতীয় অবস্থা: আদালত গুনাহ সম্পর্কে জানতে পারল এবং শাস্তির রায়ও দেওয়া হলো, কিন্তু শাস্তি কার্যকর করা হলো না; যেমন—ওই ব্যক্তি পালিয়ে গেল। যদি পৃথিবীতে এই শাস্তি কার্যকর না হয় এবং ব্যক্তি বরযখের জগতে প্রবেশ করে, তাহলে বরযখ যেহেতু একটি মহান জগত, সেখানকার শাস্তিও গুরুতর হবে। পৃথিবীতে যে শাস্তি হতো, তার তুলনায় সেখানে তার তীব্রতা আরও বেশি হবে।
যদি বরযখেও সে পবিত্র না হয় এবং কিয়ামতের জগতে পৌঁছে যায়, তাহলে কিয়ামত যেহেতু সর্বাধিক মহত্তর জগত, সেখানকার শাস্তি আরও কঠিন হবে।
এ কারণেই মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ, দয়া ও করুণার কারণে চান—বান্দার গুনাহ যেন এই পৃথিবীতেই, অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে সীমিত এই জগতেই, পরিশোধিত ও ক্ষমা হয়ে যায়; যাতে বিষয়টি বরযখের মতো মহান জগত বা কিয়ামতের মতো সর্বাধিক মহত্তর জগত পর্যন্ত না গড়ায়।
হাদিসে এসেছে:
إذا أرادَ اللّهُ بعَبدٍ خیراً عَجَّلَ عُقوبَتَهُ فی الدنیا
“আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করেন।”
এর কারণ হলো, পৃথিবী একটি সীমিত জগত। তাই আল্লাহ চান, তুলনামূলকভাবে হালকা শাস্তির মাধ্যমে তাঁর বান্দা এখানেই পবিত্র হয়ে যাক।
অন্যদিকে হাদিসে এসেছে:
وإذا أرادَ بعَبدٍ سوءاً أمسَکَ علَیهِ ذُنوبَهُ حتّی یوافِیَ بها یومَ القیامةِ
“আল্লাহ যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তার গুনাহগুলো সংরক্ষণ করে রাখেন, যতক্ষণ না সে সেগুলো নিয়ে কিয়ামতের দিনে উপস্থিত হয়।”
এর অর্থ হলো, ওই ব্যক্তি তার অতিরিক্ত গুনাহ ও অবাধ্যতার কারণে দুনিয়ার তুলনামূলক হালকা শাস্তির মাধ্যমে পবিত্র হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে; ফলে তাকে আরও কঠিন শাস্তির মাধ্যমে পবিত্র হতে হবে।
অবশেষে, মানুষের জন্য কল্যাণের ইচ্ছা করা হবে নাকি অকল্যাণের—তা তার নিজের কর্মের সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আপনার কমেন্ট