বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৫:২২
ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ইসলামের সম্পর্ক

ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ-যা নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর স্বকীয়তা রক্ষার সাথে সম্পর্কিত। হাওজা নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা জয়নুল আবেদীন বলেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক ইসলাম কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বাস্তব মডেল-আর এই মডেলেই প্রতিরোধ ও রাজনীতি একই মুদ্রার দুই পাশ। তিনি মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নি বিভাজনের সমালোচনা করে বলেন, কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা সব মুসলিমের মধ্যে সাধারণ-এই সাধারণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম। ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে পেরে আমরা সম্মানিত। প্রথমেই জানতে চাই, আপনি "ইসলামী প্রতিরোধ" (মুকাওয়ামাত) ধারণাটি কীভাবে বুঝেন? এটি কি কেবল সামরিক প্রতিরোধ, নাকি এর রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা রয়েছে?

মাওলানা জয়নুল আবেদীন: ওয়ালাইকুমুস সালাম। ইসলামী প্রতিরোধ একটি বহুমাত্রিক ধারণা। পশ্চিমা প্রচলিত ধারণায় প্রতিরোধ মানেই সহিংসতা বা সামরিক সংঘাত-কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় মুকাওয়ামাত তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান, যা নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর স্বকীয়তা রক্ষার সাথে সম্পর্কিত।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেক্ষাপটে, প্রতিরোধ কেবল বাহ্যিক হুমকির মোকাবিলা নয়-এটি একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন, যা বেলায়াতে ফকীহ-এর কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক ইসলামের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক ইসলাম কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বাস্তব মডেল হতে পারে। এই মডেলেই প্রতিরোধ ও রাজনীতি একই মুদ্রার দুই পাশ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তাহলে কি আপনি বলতে চান যে, ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ মূলত রাজনৈতিক ইসলামের একটি সম্প্রসারিত রূপ?

মাওলানা জয়নুল আবেদীন: হুবহু। রাজনৈতিক ইসলাম মানে ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামী নীতির প্রয়োগ। ইরানে এই প্রয়োগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো প্রতিরোধের সংস্কৃতি।

ইমাম খোমেনী (রহ.) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, ইরানের ইসলামী ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক ইসলাম কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়-এটি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি। ফিলিস্তিনের প্রশ্ন, লেবাননের প্রতিরোধ, ইয়েমেনের সংকট-ইরান এগুলোকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখে না, বরং ইসলামী নৈতিকতার দৃষ্টিতে দেখে।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক ইসলাম বিভিন্ন রূপ নিতে পারে-ইরানের ভেলায়াতে ফকীহ মডেল, হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ মডেল, বা মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাংগঠনিক মডেল। ইরানের দৃষ্টিতে, এই রূপগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও লক্ষ্য এক-ইসলামী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুসলিম বিশ্বে ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ মডেলের গ্রহণযোগ্যতা কেমন? অনেক সমালোচক বলেন, ইরানের প্রতিরোধ কৌশল শিয়া-কেন্দ্রিক এবং এটি সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে।

মাওলানা জয়নুল আবেদীন: এই সমালোচনা আংশিক সত্য, আংশিক অতিরঞ্জিত। সত্য হলো, ইরানের ইসলামী প্রতিরোধের একটি স্পষ্ট শিয়া পরিচয় রয়েছে-কারণ এটি শিয়া ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস থেকে উদ্ভূত। কিন্তু অতিরঞ্জিত হলো এই দাবি যে, এটি স্বাভাবিকভাবেই সুন্নিদের বিরোধী।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামী প্রতিরোধের মূল ধারণা-জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, মুস্তাদাফিনের (নিপীড়িতদের) পাশে থাকা-কুরআনের সর্বজনীন নীতি, যা শিয়া-সুন্নি উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। হামাস একটি সুন্নি ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন, এবং ইরান তাদের সমর্থন করে। হিজবুল্লাহ শিয়া, কিন্তু লেবাননের জাতীয় প্রতিরোধে সুন্নি ও খ্রিস্টানদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বিভাজনের দায় একপাক্ষিক নয়। ইরানও বোঝে যে, ঐক্য ছাড়া প্রতিরোধ টেকসই নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ইসলামী ঐক্য কেবল কৌশলগত প্রয়োজন নয়-এটি একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা সব মুসলিমের মধ্যে সাধারণ, এবং এই সাধারণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের বিভাজন দূর করতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ কৌশল কীভাবে রাজনৈতিক ইসলামের তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? বিশেষ করে ভেলায়াতে ফকীহ নীতির সাথে?

মাওলানা জয়নুল আবেদীন: ভেলায়াতে ফকীহ হলো রাজনৈতিক ইসলামের একটি বিশেষ মডেল, যা ইরানে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই মডেলে, ধর্মীয় নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে একীভূত। প্রতিরোধ এই কাঠামোর একটি অপরিহার্য অঙ্গ, কারণ ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অভ্যন্তরীণ শাসন নয়-বরং বাহ্যিক শক্তির আধিপত্য প্রতিহত করা।

ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর দৃষ্টিতে, ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধতা নির্ভর করে এটি কতটা ইসলামী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার ওপর। এই ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো - সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তাই ইরানের কাছে, ইসলামী প্রতিরোধ কোনো "পররাষ্ট্র নীতি" নয়-এটি ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্বের যুক্তিরই অংশ।

তবে আমি এটা স্পষ্ট করতে চাই: রাজনৈতিক ইসলাম কেবল শক্তির রাজনীতি নয়। এটি নৈতিকতার রাজনীতিও। ইরান বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না-কারণ ইসলামী নৈতিকতা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রকে ন্যায্যতা দেয় না। কিন্তু ইরান নিজের প্রতিরক্ষার অধিকার রক্ষা করবে, কারণ দুর্বলতা কখনোই নৈতিকতা নয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ প্রশ্ন-মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য ইরানের ইসলামী প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ইসলামের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

মাওলানা জয়নুল আবেদীন: প্রধান শিক্ষা হলো-ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত মুক্তির পথ নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারেরও পথ। রাজনৈতিক ইসলাম এই সত্যটিকে স্বীকৃতি দেয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।

কিন্তু ইরানের অভিজ্ঞতা আরেকটি শিক্ষাও দেয়: রাজনৈতিক ইসলাম কেবল ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হলে তার নৈতিক ভিত্তি ক্ষয় হয়। ইসলামী প্রতিরোধের মূল শক্তি হলো তার নৈতিক অবস্থান-জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বলের পাশে থাকা। এই নৈতিক অবস্থান ছাড়া প্রতিরোধ কেবল আরেকটি ক্ষমতার লড়াই।

মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রয়োজন-মতপার্থক্য দূরে রেখে অভিন্ন স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। শিয়া-সুন্নি বিভাজন কেবল শত্রুর হাতে খেলনা। আমাদের উচিত ন্যূনতম সাধারণ ভিত্তি-কুরআন, নবুয়ত, ন্যায়বিচার-থেকে শুরু করে বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ইসলামী প্রতিরোধ তখনই সফল হবে, যখন এটি সমগ্র উম্মাহর নৈতিক প্রতিরোধে পরিণত হবে-কেবল একটি দেশ বা একটি মাজহাবের প্রতিরোধ নয়।

আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha