মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ২০:০৭
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কি ‘পিছু হটাই’ শেষ পথ? মার্কিন বিশ্লেষকের প্রশ্ন

সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কাজে লাগিয়ে যে যুদ্ধ দ্রুত সমাধান করা যাবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল, কয়েক মাসের সংঘাতের পর তা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর শুধু সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং কীভাবে এই সংঘাতের অবসান ঘটানো যায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা এই যুদ্ধে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ওয়াশিংটন তার সর্বোচ্চ লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। একই সময়ে সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষক কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিসের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে এমন একটি ফলাফল নিয়ে বের হতে চান, যাকে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে শুধু সামরিক হামলা চালানো যথেষ্ট হবে না। তাঁর মতে, এর জন্য ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কার্যত নির্মূল করতে হবে।

কিন্তু ডেভিসের বিশ্লেষণের মূল কথা হলো—এ ধরনের ফলাফল চাপিয়ে দেওয়ার মতো সক্ষমতা মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেই।

ডেভিসের এই বক্তব্যকে কেবল ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। তিনি যে সমস্যাটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের একটি মৌলিক কৌশলগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত—সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বকে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্র তার বিমান, নৌ ও গোয়েন্দা সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে এবং দেশটির সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু সামরিক শক্তির এই শ্রেষ্ঠত্বকে একটি দেশের আচরণ, রাজনৈতিক কাঠামো বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক বেশি জটিল বিষয়।

যুদ্ধটি যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, সরকারি ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মার্কিন কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (CBO) হিসাব অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির সামরিক অভিযানে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয় প্রতি মাসে গড়ে আরও প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে। একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের একটি প্রতিবেদনে গোলাবারুদের ঘাটতি এবং সেগুলোর উৎপাদন ও পুনরায় মজুত করার সক্ষমতায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের (CRS) একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সংঘাত কার্যত পারস্পরিক ক্ষয়যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান তার হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

CRS-এর মূল্যায়নে ওয়াশিংটনের সামনে চারটি সম্ভাব্য পথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:

• বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা;

• একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা;

• সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা;

• অথবা একটি বিস্তৃত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করা।

এই পরিস্থিতি ডেভিসের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট করে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি অংশ দুর্বল করা হয়, তাহলে ওয়াশিংটন তার সামরিক অভিযানের কিছু সাফল্য তুলে ধরতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য যদি হয় ইরানের পাল্টা সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা, দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা এবং একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে সামরিকভাবে যা অর্জন করা সম্ভব এবং রাজনৈতিকভাবে যা অর্জন করা সম্ভব—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান অনেক বড় হয়ে যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলেই এই ব্যবধান কমবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

হামলা আরও জোরদার করলে ইরানের ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়বে এবং সংঘাতটি আরও বিস্তৃত হয়ে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা বা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তিনি বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছেন।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কিছু গোলাবারুদের মজুত কমে আসা এবং মার্কিন উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি শুধু ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ডেভিস যে ‘পশ্চাদপসরণের’ কথা বলেছেন, তা কেবল অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে বোঝায় না। মূল প্রশ্ন হলো—যুদ্ধ থেকে কীভাবে একটি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রস্থানপথ তৈরি করা যায়।

এমন একটি প্রস্থানপথ, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারে, কিন্তু সরাসরি পরাজয় স্বীকার না করেই কোনো চুক্তি, সমঝোতা বা নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধের ফলাফলকে নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়।

এখানেই ইরানের সঙ্গে সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, পিছিয়ে আসা বা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে প্রথমদিকে ঘোষিত লক্ষ্য থেকে সরে আসা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

ফলে ওয়াশিংটনের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু এই প্রশ্ন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র আরও কতটা সামরিক আঘাত হানতে সক্ষম। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সামরিক আঘাতগুলো আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল এনে দিতে পারবে কি না।

ড্যানিয়েল ডেভিসের বক্তব্য মূলত এই বিচ্ছিন্নতার দিকেই ইঙ্গিত করে: কোনো দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে, কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠত্বকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ওয়াশিংটন যদি শেষ পর্যন্ত মনে করে যে সামরিক উপায়ে যুদ্ধের সর্বোচ্চ লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়, তাহলে ‘পশ্চাদপসরণ’কে ইরানের ওপর চাপের অবসান হিসেবে না দেখে চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে তখন আলোচনার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের মতো উপায় গুরুত্ব পেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা নির্ধারণ করবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র কতদিন ধরে হামলা চালিয়ে যেতে পারে, তা নয়। বরং মূল প্রশ্ন হবে—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় এবং এর মাধ্যমে বাস্তবে অর্জনযোগ্য রাজনৈতিক ফলাফলের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় তৈরি হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha