মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ২০২৬ - ১৪:১৩
আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস কি গুলুর অন্তর্ভুক্ত?

হাওজা / পবিত্র কুরআন হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো নবীদের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত ইলমে গায়েবের বিষয়টি প্রমাণ করেছে।

সংক্ষিপ্তসার:

হাওজা / পবিত্র কুরআন হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো নবীদের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত ইলমে গায়েবের বিষয়টি প্রমাণ করেছে। একইভাবে বিভিন্ন রেওয়ায়েতে ইমামদের (আ.) জন্যও এ মর্যাদার সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহর অনুমতিতে আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস কোনো গুলু বা অতিরঞ্জন নয়; বরং কুরআন ও রেওয়ায়েত প্রমাণিত একটি বাস্তবতাকে স্বীকার করা।

উত্তর:

ইমামতের পরিসরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে-এমন বিষয়গুলোর মধ্যে আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েব অন্যতম। এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে শিয়া আলেম ও তাঁদের বিরোধীদের মধ্যে বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। কেউ কেউ এমন আয়াতের ভিত্তিতে, যেগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্যদের থেকে ইলমে গায়েবকে অস্বীকার করে, ইমামদের (আ.) জন্য ইলমে গায়েবের বিশ্বাসকে গুলু এবং তাঁদের মর্যাদার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন বলে মনে করেন।

অন্যদিকে, মুতাওয়াতির রেওয়ায়েত ও কুরআনের বিভিন্ন প্রমাণ নবী ও আল্লাহর ওলিদের বিশেষ জ্ঞান প্রদান করার বিষয়টি প্রমাণ করে। তাই ইমামগণ (আ.)-এর প্রকৃত মর্যাদা স্পষ্ট করা এবং গুলু বা অতিরঞ্জনকে তাঁদের বাস্তব মর্যাদা ও ফজিলত থেকে পৃথক করার জন্য রেওয়ায়েতভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি ও অপরিহার্য।

আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য ইলমে গায়েবের যৌক্তিক সম্ভাবনা ও কুরআনিক প্রমাণ

বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কোনো মানুষকে ইলমে গায়েব প্রদান করা মোটেই অসম্ভব নয়। মহান আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ ও মানবীয় সীমার ঊর্ধ্বে কোনো জ্ঞান দান করতে পারেন। পবিত্র কুরআনেও নবী ও আল্লাহর ওলিদের জন্য এ ধরনের বিশেষ জ্ঞানের একাধিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, হযরত ঈসা (আ.) বলেছেন:

«وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ»[১]

আমি তোমাদের জানিয়ে দিই, তোমরা কী খাও এবং তোমাদের ঘরে কী সঞ্চয় করে রাখো।

একইভাবে হযরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন। হযরত মূসা (আ.) এবং আরও বহু নবীও গায়েবি বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন। অতএব নবীদের ইলমে গায়েব প্রদান করার মূলনীতি কুরআন দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত এবং এটিকে গুলু বলা যায় না। [২]

কুরআনের আয়াত ও ইলমে গায়েব

পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলো ইলমে গায়েবকে মহান আল্লাহর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করেছে। যেমন:

«عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا» [৩]

তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েবের বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না।

তবে এসব আয়াতকে এমন অন্যান্য আয়াতের আলোকে বুঝতে হবে, যেগুলো নবীদের ইলমে গায়েব প্রদান করার বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে। অন্য কথায়, মহান আল্লাহ সত্তাগত ও স্বতন্ত্র ইলমে গায়েব নিজের জন্য নির্দিষ্ট রেখেছেন; কিন্তু তিনি নিজ অনুমতিতে এ জ্ঞানের কিছু অংশ তাঁর নবী ও আল্লাহর ওলিদের দান করতে পারেন।

এরপর মহান আল্লাহ বলেন:

«إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ»[৪]

তবে তাঁর মনোনীত কোনো রাসূলকে।

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মহান আল্লাহ তাঁর মনোনীত রাসূলদের গায়েবের কিছু বিষয় সম্পর্কে অবহিত করেন। অতএব কিছু আয়াতের ভিত্তিতে নবী ও তাঁদের ওসিদের প্রদান করা ইলমে গায়েবকে অস্বীকার করা যায় না।

রেওয়ায়েতে আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েব

ইমামদের (আ.) থেকে বর্ণিত বহু রেওয়ায়েত তাঁদের ইলমে গায়েবের ওপর প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আল-কাফি গ্রন্থে “রাসূলুল্লাহ (সা.) ও ইমামদের (আ.) সামনে আমল পেশ করা” শিরোনামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে। সেখানে বান্দাদের আমল সম্পর্কে ইমামদের (আ.) অবগত থাকার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [৫]

ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: প্রতিদিন সকালে বান্দাদের নেক ও বদ আমল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে পেশ করা হয়। অতএব, তোমরা নিজেদের আমলের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।

এরপর ইমাম (আ.) এই আয়াত তিলাওয়াত করেন:

«وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ»[৬]

বলুন, তোমরা আমল করো। অচিরেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদের আমল দেখতে পাবেন। [৭]

একইভাবে ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন: ইমাম ও মহান আল্লাহর মধ্যে নূরের একটি স্তম্ভ রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি বান্দাদের আমল দেখতে পান। [৮]

এসব রেওয়ায়েত স্পষ্টভাবে বান্দাদের আমল সম্পর্কে ইমামদের (আ.) গায়েবি ও প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অবগতির বিষয়টি প্রমাণ করে।

বিরোধীদের আপত্তির জবাব

কিছু আহলে সুন্নত আলেম, বিশেষত ওহাবি চিন্তাধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, ইমামদের (আ.) ইলমে গায়েবকে গুলু বা অতিরঞ্জন বলে মনে করেন। তাঁদের বিশ্বাস, ইলমে গায়েব কেবল মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।

আব্দুল্লাহ কাসিমি এ বিষয়ে লিখেছেন: সব মুসলমানই জানেন যে, ইলমে গায়েবের গুণে নবীদের আল্লাহর সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্ব নেই। কুরআন ও সুন্নাহতে বহু দলিল রয়েছে, যা ইলমে গায়েবকে কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট বলে প্রমাণ করে। [৯]

এই আপত্তির জবাবে বলা যায়, এ দাবি কুরআনের আয়াতগুলোর সীমিত ও অসম্পূর্ণ বোঝাপড়ার ফল। যেমনটি বলা হয়েছে, কুরআন ইলমে গায়েবকে সর্বাংশে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের থেকে অস্বীকার করে না; বরং সত্তাগত ও স্বতন্ত্র ইলমে গায়েব মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট বলে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তাঁর নবী ও ওলিদের এ জ্ঞানের কিছু অংশ দান করার বিষয়টিও স্বীকার করে।

এ ছাড়া ইমামদের (আ.) থেকে বর্ণিত বহু রেওয়ায়েতও এ বিষয়টির ওপর জোর দেয়। শিয়া আলেমদের মধ্যে সাইয়্যেদ মুরতাজা, মোল্লা সাদরা ও আল্লামা তাবাতাবায়ীর মতো বিশিষ্ট আলেমরাও এ বিশ্বাসের সমর্থন করেছেন। [১০]

উপসংহার:

রেওয়ায়েত ভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস শুধু গুলু বা অতিরঞ্জন নয়; বরং তা কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আহলে বাইত (আ.)-এর ইলমে গায়েব বলতে এটা বোঝায় না যে, তাঁরা মহান আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী কিংবা স্বতন্ত্রভাবে গায়েবের জ্ঞান রাখেন। বরং এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন।

পবিত্র কুরআন নবীদের ইলমে গায়েব প্রদান করার বহু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে এবং বিভিন্ন রেওয়ায়েত ইমামদের (আ.) জন্যও এ মর্যাদা প্রমাণ করেছে। এ মর্যাদা অস্বীকার করা শুধু রেওয়ায়েতভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদা ও ফজিলতের ক্ষেত্রেও এক ধরনের অবমূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ইমামদের (আ.) ইলমে গায়েবের প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহতে রয়েছে এবং এতে কোনো ধরনের গুলু বা শিরকের অবকাশ নেই। এ বিশ্বাস আহলে বাইত (আ.)-এর উচ্চ মর্যাদার প্রতি গভীর ঈমান এবং তাঁদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত হুজ্জত হিসেবে যথাযথভাবে চেনার নিদর্শন।

সূত্র:

[১] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৪৯।

[২] সুলাইমানিয়ান, মাকামাতে ইমামান, পৃ. ২৯৯।

[৩] সূরা আল-জিন, আয়াত ২৬।

[৪] সূরা আল-জিন, আয়াত ২৬।

[৫] আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃ. ২১৯।

[৬] সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১০৫।

[৭] আল-কাফি, কিতাবুল হুজ্জাহ, “নবী ও ইমামদের সামনে আমল পেশ করা” অধ্যায়, হাদিস ৩।

[৮] উয়ুনু আখবারির রেজা, খণ্ড ১, পৃ. ২১৪; আল-খিসাল, খণ্ড ২, পৃ. ৫২৮।

[৯] আস-সিরাউ বাইনাল ইসলামি ওয়াল ওয়াসানিয়্যাহ, খণ্ড ১, ভূমিকা।

[১০] রাসায়েলে সাইয়্যেদ মুরতাজা, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩; শরহু উসূলিল কাফি, খণ্ড ২, পৃ. ৫৪৪; দর মাহজারে আল্লামা তাবাতাবায়ী, পৃ. ২০৪।

লেখা: মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha