বুধবার ৭ অক্টোবর ২০২৬ - ১৭:৪৭
আহলে বাইত (আ.)-এর সৃষ্টি, স্থিতি, রিজিক, জীবনদান, জ্ঞান, হেদায়াত এবং অন্যান্য তকওয়িনী ও শরয়ি বিষয়ে মধ্যস্থতায় বিশ্বাস কি গুলুর অন্তর্ভুক্ত?

হাওজা / মধ্যস্থতা বলতে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে তাঁর ফয়েজের মাধ্যম হওয়াকে বোঝায়; আল্লাহর কাছ থেকে স্বাধীন হওয়াকে নয়।

সারসংক্ষেপ:

মধ্যস্থতা বলতে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে তাঁর ফয়েজের মাধ্যম হওয়াকে বোঝায়; আল্লাহর কাছ থেকে স্বাধীন হওয়াকে নয়। যেমন, কুরআন হযরত ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রেও এই ভূমিকা প্রমাণ করেছে। কেবল তখনই গুলু সংঘটিত হয়, যখন এসব মর্যাদাকে আল্লাহ থেকে স্বাধীনভাবে ইমামদের প্রতি আরোপ করা হয়।

উত্তর:

বিষয়টির উপস্থাপন ও গুরুত্ব

আহলে বাইত (আ.)-এর অন্যতম উচ্চ মর্যাদা, যা শিয়া চিন্তাবিদদের কাছে সর্বদা গুরুত্ব পেয়ে এসেছে, তা হলো সৃষ্টি ও তকওয়ীনের ব্যবস্থায় তাঁদের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা। বহু রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে, আহলে বাইত (আ.) শুধু সৃষ্টিজগতের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর ফয়েজের মাধ্যমই নন; বরং সৃষ্টির স্থিতি, রিজিক, হেদায়াত, জীবনদান এবং অন্যান্য তকওয়িনী ও তাশরিয়ি (সৃষ্টিগত ও আইনগত অথবা প্রাকৃতিক ও বিধানগত) বিষয়েও তাঁদের ভূমিকা রয়েছে। তবে কেউ কেউ এই বিশ্বাসকে ইমামদের মর্যাদা সম্পর্কে গুলু ও অতিরঞ্জনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং এটিকে তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেছেন। এই উত্তরে রেওয়ায়েতগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলসমূহ বিস্তারিত পর্যালোচনার মাধ্যমে এই মধ্যস্থতার প্রকৃতি, গুলু ও বাতিল তাফওয়িজ থেকে এর পার্থক্য এবং কার্যকারণ-নির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করা হবে।

মধ্যস্থতার ধারণা এবং তকওয়ীনের ব্যবস্থায় এর অবস্থান

মধ্যস্থতা বলতে এই বোঝায় না যে আহলে বাইত (আ.) স্বাধীনভাবে ও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। বরং এর অর্থ হলো, তাঁরা চূড়ান্ত কারণ এবং ফয়েজের মাধ্যম হিসেবে আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন অবস্থান করেন এবং আল্লাহর সমস্ত ফয়েজ তাঁদের অস্তিত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির কাছে পৌঁছে। এই বিষয়টি বহু আয়াত ও রেওয়ায়েতের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়।

ক) সৃষ্টি ও সৃষ্টিজগতের স্থিতিতে মধ্যস্থতা:

পবিত্র কুরআন হযরত ঈসা (আ.)-কে এমন একজন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, যিনি আল্লাহর অনুমতিতে মৃতকে জীবিত করতেন, রোগীদের সুস্থ করতেন এবং মাটি দিয়ে পাখি তৈরি করতেন:

﴿وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي﴾

এবং যখন তুমি আমার অনুমতিতে মাটি দিয়ে পাখির আকৃতির মতো কিছু তৈরি করতে, অতঃপর তাতে ফুঁ দিতে, তখন আমার অনুমতিতে তা পাখিতে পরিণত হতো। [১]

﴿وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ﴾

এবং আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করি এবং আল্লাহর অনুমতিতে মৃতদের জীবিত করি। [২]

এ ধরনের বিষয় যদি গুলু বা শিরক হতো, তাহলে কখনোই কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্য তা মর্যাদা হিসেবে উল্লেখ করা হতো না। অতএব, তকওয়িনী বিষয়ে মধ্যস্থতার মূলনীতি শুধু অসম্ভব নয়; বরং কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর মতো নবীদের জন্য তা প্রমাণিত হয়েছে।

আহলে বাইত (আ.)-এর সৃষ্টি ও জগতের স্থিতিতে মধ্যস্থতার ওপরও বহু বর্ণনা নির্দেশ করে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: «لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ»; তুমি না থাকলে আমি আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করতাম না। [৩] একইভাবে হাদিসে কুদসিতে এসেছে: আহলে বাইত (আ.) না থাকলে আমি আদমকে সৃষ্টি করতাম না। [৪] আমিরুল মুমিনীন (আ.) মুআবিয়ার কাছে এক চিঠিতে বলেছেন: «فَإِنَّا صَنَائِعُ رَبِّنَا وَ النَّاسُ بَعْدُ صَنَائِعُ لَنَا»; আমরা আমাদের প্রতিপালকের সৃষ্টি, আর মানুষ আমাদের সৃষ্টি। [৫] এসব রেওয়ায়েত স্পষ্টভাবে সৃষ্টিতে আল্লাহর ফয়েজের মাধ্যম হিসেবে আহলে বাইত (আ.)-এর ভূমিকার নির্দেশ করে।

খ) জগতের স্থিতিতে মধ্যস্থতা:

আহলে বাইত (আ.)-কে আসমান ও জমিনের জন্য “নিরাপত্তা” হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: «أَهْلُ بَيْتِي أَمَانٌ لِأَهْلِ الْأَرْضِ كَمَا أَنَّ النُّجُومَ أَمَانٌ لِأَهْلِ السَّمَاءِ»।[৬] ইমাম সাদিক (আ.)-ও বলেছেন: পৃথিবী যদি ইমাম ছাড়া থাকে, তাহলে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। [৭] এসব রেওয়ায়েত দেখায় যে ইমামের অস্তিত্ব জগতের স্থিতির কারণ এবং এটি তকওয়ীনের ব্যবস্থায় আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতার অন্যতম উদাহরণ।

মধ্যস্থতা ও গুলু এবং বাতিল তাফওয়িজের মধ্যে পার্থক্য

মধ্যস্থতার অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য একে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিচ্যুতি-গুলু ও বাতিল তাফওয়িজ-থেকে পৃথক করতে হবে।

ক) মধ্যস্থতায় গুলু:

গুলু তখনই সংঘটিত হয়, যখন আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাগুলো তাঁদের জন্য স্বাধীনভাবে এবং বান্দেগি ও আল্লাহর অনুমতির সীমার বাইরে প্রমাণ করা হয়। আহলে বাইত (আ.) আল্লাহর অনুমতি ছাড়া স্বাধীনভাবে তকওয়িনী বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন-এমন বিশ্বাস শিরক ও কুফর। ইমাম রেজা (আ.) গুলাতদের প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন: «مَنْ قَالَ بِالتَّشْبِيهِ وَ الْجَبْرِ فَهُوَ كَافِرٌ مُشْرِكٌ... إِنَّمَا وَضَعَ الْأَخْبَارَ عَنَّا فِي التَّشْبِيهِ وَ الْجَبْرِ الْغُلَاةُ» [৮] অতএব, তকওয়িনী বিষয়ে আহলে বাইত (আ.)-এর স্বাধীন ক্ষমতায় বিশ্বাস করা গুলু ও শিরক হিসেবে গণ্য হয়।

খ) বাতিল তাফওয়িজ:

বাতিল তাফওয়িজ বলতে বোঝায়, আল্লাহ সৃষ্টি, রিজিক, জীবনদান ও মৃত্যু প্রদানের বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে আহলে বাইতের কাছে অর্পণ করেছেন এবং নিজেকে এসব বিষয় থেকে সরিয়ে নিয়েছেন-এমন বিশ্বাস। এই ধারণা, যার শিকড় ইহুদি চিন্তাধারায় রয়েছে, কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী:

﴿وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ... بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ﴾। [৯]

ইমামগণ (আ.)-ও এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। নাহিয়ায়ে মুকাদ্দাসা থেকে প্রাপ্ত তাওকিতে এসেছে: «نَحْنُ صَنَائِعُ رَبِّنَا وَ الْخَلْقُ بَعْدُ صَنَائِعُنَا... إِنَّا لَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ شَيْئًا»।[১০] অতএব, আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, তার সমান্তরাল নয়।

বৈধ মধ্যস্থতার বর্ণনাগত দলিল

কুরআন ও হাদিস বিভিন্ন ক্ষেত্রে আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতার ওপর স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে:

ক) রিজিকের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা:

আল্লাহ কুরআনে নিজেকেই মূল রিজিকদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, [১১] তবে একই সঙ্গে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো মাধ্যমের প্রতিও রিজিক প্রদানের বিষয়টি আরোপ করেছেন:

﴿وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ﴾।

এবং যখন ইবরাহিম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এটিকে একটি নিরাপদ নগরী করুন এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দ্বারা রিজিক দান করুন। [১২]

এছাড়াও সূরা নিসার ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন নিজেদের সম্পদ থেকে নির্বোধদের রিজিকের ব্যবস্থা করে। অতএব, আল্লাহর ইচ্ছার অধীন থাকার শর্তে মাধ্যমের প্রতি রিজিক প্রদানের বিষয়টি আরোপ করা শুধু শিরক নয়; বরং তা কুরআন দ্বারা সমর্থিত। বর্ণনায়ও এসেছে যে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন: আল্লাহ বান্দাদের রিজিক নির্ধারিত সময়ে বণ্টন করেন এবং আমাদের হাত দিয়ে তা প্রবাহিত করেন। [১৩]

এছাড়াও নাহিয়ায়ে মুকাদ্দাসা থেকে প্রদত্ত এক উত্তরে এসেছে: ইমামগণ (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং তিনি সৃষ্টি করেন, তাঁরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন এবং তিনি রিজিক দান করেন-তাঁদের প্রার্থনার জবাব দেওয়া এবং তাঁদের অধিকারের মর্যাদা প্রদানের কারণে। [১৪]

খ) জীবনদান ও মৃত্যু প্রদানের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা:

কুরআন জীবনদান ও মৃত্যু প্রদানকে আল্লাহর প্রতি আরোপ করেছে, [১৫] তবে একই সঙ্গে আল্লাহর অনুমতিতে এই বিষয়গুলো হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতিও আরোপ করেছে। [১৬] অতএব, আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত কোনো কোনো বান্দাকে এই ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন। রেওয়ায়েতেও এসেছে যে ইমাম হুসাইন (আ.) এবং মুসা ইবনে জাফর (আ.) শাহাদাতবরণ করেছেন এবং তাঁদের নিহত না হওয়াকে গুলাতদের বিশ্বাস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।[১৭]

গ) জ্ঞান ও তাওহিদের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা:

আহলে বাইত (আ.)-কে আল্লাহর পরিচয়ের ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমিরুল মুমিনীন (আ.) বলেছেন: «تَوْحِيدُ اللَّهِ مِنْ فُرُوعِنَا... نَحْنُ الْأَعْرَافُ الَّذِينَ لَا يُعْرَفُ اللَّهُ إِلَّا بِسَبِيلِ مَعْرِفَتِنَا»।[১৮] ইমাম বাকির (আ.)-ও বলেছেন: «بِنَا عُرِفَ اللَّهُ وَ بِنَا عُبِدَ اللَّهُ»।[১৯] এসব রেওয়ায়েত দেখায় যে আল্লাহর সঠিক পরিচয় আহলে বাইতের পরিচয়ের মাধ্যমে সম্ভব এবং এটি আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোতে তাঁদের মধ্যস্থতার অন্যতম উদাহরণ।

ঘ) শাফায়াত ও গুনাহ ক্ষমার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা:

কুরআন রাসূল (সা.)-কে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে:

﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا﴾

তারা যখন নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল, তখন যদি তোমার কাছে আসত, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আল্লাহকে তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু হিসেবে পেত। [২০]

এছাড়াও সূরা আনফালের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর উপস্থিতির বরকতে তাঁর উম্মতের ওপর থেকে আজাব প্রত্যাহার করেন। অতএব, গুনাহ ক্ষমার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা একটি কুরআনসম্মত ও বৈধ বিষয় এবং রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারীরাও এই মর্যাদায় তাঁর অংশীদার।

ঙ) সৃষ্টিজগতের ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষমতার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা:

আহলে বাইত (আ.)-এর অন্যতম উচ্চ মর্যাদা হলো আল্লাহর অনুমতিতে সৃষ্টিজগতের ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষমতা। এই মর্যাদা শুধু আহলে বাইতের জন্য নির্দিষ্ট নয়; আল্লাহর ওলিগণও এর অধিকারী। হাদিসে কুদসিতে এসেছে: আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। তখন আমি তার কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যাই... সে আমার কাছে প্রার্থনা করলে আমি তাকে দান করি এবং আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে আশ্রয় দিই। [২১] এই রেওয়ায়েত দেখায় যে প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের ওপর হস্তক্ষেপের মর্যাদায় পৌঁছতে পারে। এছাড়াও শিয়াদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য জিয়ারত হিসেবে পরিচিত জিয়ারতে জামেয়া কাবিরায় আহলে বাইত (আ.)-এর জন্য “জ্ঞানের ভাণ্ডারের রক্ষক”, “শহরসমূহের স্তম্ভ”, “ঈমানের দরজা”, “আল্লাহর হুজ্জত” এবং “প্রজ্ঞার উৎস”-এর মতো মর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে। [২২] এসব মর্যাদা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন এবং তাঁর অনুমতিতে; এগুলো আল্লাহ থেকে তাঁদের স্বাধীনতা বোঝায় না।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার

রেওয়ায়েতগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে সৃষ্টি, স্থিতি, রিজিক, জীবনদান, জ্ঞান, হেদায়াত এবং অন্যান্য তকওয়িনী ও শরয়ি বিষয়ে আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতায় বিশ্বাস শুধু গুলু নয়; বরং এটি আল্লাহর কার্যগত তাওহিদ এবং কার্যকারণ-নির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতা তাঁদের স্বাধীনভাবে কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপের অর্থে নয়; বরং এর অর্থ হলো তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন এবং তাঁর ফয়েজের মাধ্যম হিসেবে অবস্থান করেন। পবিত্র কুরআন হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো নবীদের জন্য এ ধরনের মধ্যস্থতা প্রমাণ করেছে এবং ইমামদের অসংখ্য বর্ণনাও এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছে।

গুলু তখনই সংঘটিত হয়, যখন এসব মর্যাদা আহলে বাইতের জন্য স্বাধীনভাবে এবং বান্দেগি ও আল্লাহর অনুমতির সীমার বাইরে প্রমাণ করা হয়। একইভাবে বাতিল তাফওয়িজ-যার অর্থ হলো সব বিষয় ইমামদের কাছে সম্পূর্ণরূপে অর্পণ করা এবং আল্লাহর সরে দাঁড়ানো-এটিও প্রত্যাখ্যাত। এর বিপরীতে, বৈধ মধ্যস্থতা হলো কার্যকারণ-নির্ভর ব্যবস্থায় আহলে বাইত (আ.)-এর আল্লাহর ফয়েজের মাধ্যম হিসেবে অবস্থান করা, যা আল্লাহর কার্যগত তাওহিদেরই প্রতিফলন এবং তাঁর রহমত ও ক্ষমতার নিদর্শন।

সুতরাং, রেওয়ায়েতগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের কাঠামোর মধ্যে আহলে বাইত (আ.)-এর মধ্যস্থতায় বিশ্বাস শুধু গুলু নয়; বরং এটি শিয়াদের সঠিক আকিদার একটি অংশ এবং ইমামতের মর্যাদা সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধি ও আহলে বাইতের প্রতি ঈমানকে শক্তিশালী করার কারণ। যেমন, জিয়ারতে জামেয়া কাবিরায় এসেছে: «فَمَا شَيْءٌ مِنْهُ إِلَّا وَ أَنْتُمْ لَهُ السَّبَبُ وَ إِلَيْهِ السَّبِيلُ»; এমন কোনো কিছু নেই, যার জন্য আপনারা কারণ এবং যার দিকে যাওয়ার পথ আপনারা নন। [২৩] এই বক্তব্য স্পষ্টভাবে অস্তিত্বের ব্যবস্থায় আহলে বাইত (আ.)-এর ফয়েজের মাধ্যম হিসেবে অবস্থানকে ব্যাখ্যা করে এবং দেখায় যে এই মর্যাদা গুলু নয়; বরং সত্য ও তাওহিদেরই বাস্তব রূপ।

সুত্র:

[১] সূরা মায়েদা, আয়াত ১১০।

[২] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৪৯।

[৩] উয়ুনুল আখবার, খণ্ড ১, পৃ. ১৫৬; ইলালুশ শরায়ে, পৃ. ৪।

[৪] ফারায়েদুস সামতাইন, খণ্ড ১, পৃ. ৩৬।

[৫] নাহজুল বালাগা, পৃ. ৩৮৬; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৩৩, পৃ. ৫৮।

[৬] কিফায়াতুল আসার, পৃ. ২৯; ইসবাতুল হুদাত, খণ্ড ২, পৃ. ১১৫।

[৭] আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃ. ১৭৯।

[৮] আত-তাওহিদ, পৃ. ৩৬৪।

[৯] সূরা মায়েদা, আয়াত ৬৪।

[১০] আল-গাইবাহ, পৃ. ২৮৫; আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ২, পৃ. ২৭৮।

[১১] সূরা রূম, আয়াত ৪০; সূরা হুদ, আয়াত ৬।

[১২] সূরা বাকারা, আয়াত ১২৬।

[১৩] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৬, পৃ. ২৩, হাদিস ৫।

[১৪] আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ২, পৃ. ২৮৪; আল-গাইবাহ, পৃ. ১৭৮।

[১৫] সূরা রূম, আয়াত ৪০; সূরা মুলক, আয়াত ২।

[১৬] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৪৯; সূরা মায়েদা, আয়াত ১১০।

[১৭] উয়ুনু আখবারির রেজা, খণ্ড ২, পৃ. ২০৩।

[১৮] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৮, পৃ. ৩৩৮।

[১৯] আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃ. ১৭১।

[২০] সূরা নিসা, আয়াত ৬৪।

[২১] আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫২।

[২২] আল-ফকিহ, খণ্ড ২, পৃ. ৬১০; উয়ুনুল আখবার, খণ্ড ২, পৃ. ২৭২।

[২৩] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৯৯, পৃ. ১৪৪।

লেখা: মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha