হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইয়েমেনিরা সৌদি আরবের আগ্রাসন ও অবরোধের জবাবে দেশটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। গত কয়েক দিনে সৌদি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোহাম্মদ তাহের আনআম গত রাতে এক বক্তব্যে শত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলায় ইয়েমেনিদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইয়েমেনের জনগণ রাজপথে নেমেছেন এটা জানাতে যে, তাঁরা শত্রুর মোকাবিলা করবেন।
মোহাম্মদ তাহের আনআম আরও বলেন, ইয়েমেনের জনগণ রাজপথে নেমেছেন এটা জানাতে যে, তাঁরা নিজেদের নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন, সৌদি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন এবং অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চাপ অব্যাহত রাখার দাবি জানাচ্ছেন।
ইয়েমেনের ওপর যে আগ্রাসন চালাবে, তাকে জবাব দেওয়া হবে
সৌদি আরবের ফাঁদে পা না দিতে সব দেশকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, কোনো দেশই আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়াবে না। কারণ, সবাই জানে যে সৌদি আরবের বিপরীতে ইয়েমেন আগ্রাসনকারী পক্ষ নয় এবং কারও ওপর হামলা চালায় না।
এই ইয়েমেনি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে দেশই ইয়েমেনকে লক্ষ্যবস্তু করবে, তাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে। পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে সেই দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ইয়েমেনের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরও বলেন, ইয়েমেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে আমাদের যোদ্ধাদের মাধ্যমে মুক্ত করা হবে। তায়েজ শহরের বাইরে অবশিষ্ট এলাকাগুলোর মধ্যে জাবাল হাবাশি হবে সর্বশেষ মুক্ত হওয়া অঞ্চল।
বাব আল-মান্দাব বা জুবাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদিদের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা
মোহাম্মদ তাহের আনআম স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমরা তায়েজ শহরে প্রবেশ করব। তবে আমরা আশা করি, শহরের ভেতরে কোনো যুদ্ধ হবে না এবং সৌদি শত্রুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাড়াটে যোদ্ধারা নিজেরাই পিছু হটবে।
তিনি উল্লেখ করেন, পশ্চিম উপকূলে সংঘর্ষের ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতির পর এই সংকট থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার জন্য সৌদি আরব মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই ইয়েমেনি কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরব বাব আল-মান্দাব বা জুবাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ভাড়াটে যোদ্ধাদের পাঠিয়েছে। তারা ক্রমাগত মনগড়া কাহিনি তৈরি করছে, কাল্পনিক বিজয়ের কথা বলছে এবং এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মিথ্যা দাবি করছে।
ইয়েমেনের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরও বলেন, সৌদি আরবের উচিত বাব আল-মান্দাবের কথা ভুলে গিয়ে সেই বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের দিকে মনোযোগ দেওয়া, যেগুলোকে আমরা লক্ষ্যবস্তু করছি।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সৌদি আরবকে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের কোনো সুযোগ আমরা দেব না। বরং তাদের ইয়েমেনিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব অপদস্থ ও অসহায় হয়ে পড়েছে
অন্যদিকে, আনসারুল্লাহর গণমাধ্যম বিভাগের প্রধান এবং সাবা সংবাদ সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নাসরুদ্দিন আমেরও এ বিষয়ে এক বক্তব্যে বলেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী একসময় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। কিন্তু আজ তারা সম্পূর্ণ অসহায় ও অপদস্থ। এমনকি তাদের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে পারছে না।
আল-মাসিরা ওয়েবসাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাসরুদ্দিন আমের বলেন, গত দুই বছর ধরে সৌদি আরব ইসরায়েলি শাসনকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেও দুর্বল করে ফেলেছে। এখন তারা উদ্ধারকর্তার সন্ধান করছে এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য হারিয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সৌদিরা এমনকি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটানো একটি ড্রোনকেও প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। তাঁর মতে, এটি ইয়েমেনের সামরিক, শিল্প ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
নিজেদের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে ইয়েমেনিরা ঐক্যবদ্ধ
ইয়েমেনের নেতৃত্ব ও জনগণের মধ্যে অসাধারণ সমন্বয় ও সংহতির কথা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, অবরোধ প্রত্যাহার, নিজেদের সম্পদ ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো-যেমন বাব আল-মান্দাব-সুরক্ষিত রাখা এবং সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলি শাসন ও সৌদি আরবের মতো বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করার বিষয়ে ইয়েমেনের জনগণকে প্রশ্ন করা হলে তাঁরা নিঃসন্দেহে নেতিবাচক উত্তর দেবেন।
ইয়েমেনের গণমাধ্যম বিভাগের প্রধান বলেন, লাখ লাখ ইয়েমেনি তাঁদের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানাতে এবং নিজেদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে রাজপথে নেমে আসেন। বর্তমান পর্যায়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ অবস্থায় ইয়েমেনের জনগণের উচিত সব সময়ের মতো সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও শত্রুর মোকাবিলায় উপস্থিত থাকা। আমরা স্পষ্টভাবেই তাঁদের এই উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বিভ্রান্ত হয়ে শত্রুপক্ষের সঙ্গে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের স্বদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা ইয়েমেনের দখলকৃত এলাকাগুলোতে সৌদি শত্রুর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অতীতের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে, তারা এই শত্রুর প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পেরেছে। এই শত্রু তার পাশে দাঁড়ানো লোকদের অপমান করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পরিত্যাগ করে।
মাঠের যুদ্ধে পরাজয়ের পর সৌদি আরব গণমাধ্যমের যুদ্ধে নেমেছে
সৌদিরা মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের পরাজয় আড়াল করতে চায় বলে উল্লেখ করে এই ইয়েমেনি কর্মকর্তা বলেন, সৌদি শত্রুর সামরিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় তারা গণমাধ্যমে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে। এ কারণে এই যুদ্ধে গণমাধ্যমের লড়াই উল্লেখযোগ্য অংশ-৫০ শতাংশেরও বেশি-দখল করে আছে।
শেষে নাসরুদ্দিন আমের আল-আরাবিয়া, আল-হাদাস, আল-জাজিরা প্রভৃতি গণমাধ্যমের মতো শত্রুপক্ষের বয়ান প্রচারকারী সংবাদমাধ্যমের অপব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, পেশাদার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কখনোই পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলে সংঘটিত কথিত সংঘর্ষের মতো সাজানো যুদ্ধের কাহিনি তৈরি করে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে পারে না।
আপনার কমেন্ট