হাওজা নিউজ এজেন্সি: গায়েবাত বিষয়ে যে প্রশ্নটি প্রায়শই উঠে তা হলো— এই গায়েবাত কি তাঁর শরীর মোবারককে সম্পূর্ণ চোখের আড়ালে নিয়ে গেছে, নাকি তিনি দৃশ্যমান থেকেও মানুষের কাছে অচেনা রয়ে গেছেন? এ আলোচনায় কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
গায়েবাতের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
মানুষের দেহ গায়েব হয়ে যাওয়া বা তার কার্যক্রম আড়ালে থাকা— আল্লাহর নবী, ওলি এবং বিশেষ মুমিনদের জীবনে নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে এর বহু প্রমাণ বিদ্যমান।
কুরআনেই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
وَ إِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَیْنَکَ وَ بَیْنَ الَّذِینَ لَا یُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَاباً مَسْتُوراً
অর্থ: “আর যখন তুমি কুরআন তিলাওয়াত কর, তখন আমরা তোমার আর তাদের মধ্যে, যারা আখেরাতে ঈমান আনে না, একটি আচ্ছাদিত পর্দা বসিয়ে দিই।”
[সূরা ইসরা: ৪৫]
তাফসীরকাররা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন আল্লাহ তাঁকে কাফেরদের দৃষ্টির আড়ালে রাখতেন। তারা তাঁর ক্ষতি করতে চাইত, কিন্তু পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও তাঁকে দেখতে পেত না।
ইতিহাসে এমন ঘটনাও লিপিবদ্ধ আছে যেখানে আবু সুফিয়ান, আবু জাহেল কিংবা উম্মে জামিল নবীজী (সা.)-এর পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে অথচ তাঁকে একেবারেই দেখতে পায়নি।
উম্মে জামিলের ঘটনা
ইবনে হিশামের সীরাহ গ্রন্থে বর্ণিত আছে— একদিন উম্মে জামিল নবীজীর (সা.) কাছে এসে দাঁড়াল, কিন্তু তাঁর চোখে নবীজী ধরা দিলেন না। ঘটনাটি শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন,
لَقَدْ أَخَذَ اللهُ بِبَصَرِهَا عَنِّی
অর্থ: “আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিকে আমার দিক থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং আমাকে তাঁর চোখ থেকে আড়াল করেছেন।”
হিজরতের অলৌকিক মুহূর্ত
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময়ও এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। কুরাইশরা হত্যার উদ্দেশ্যে নবীজীর (সা.) ঘর ঘিরে রাখে, অথচ তিনি সহজেই তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে নিজের বিছানায় শোবার নির্দেশ দেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে শত্রুদের মাথায় মাটি ছিটিয়ে তিলাওয়াত করেন:
یٰس وَ الْقُرْآنِ الْحَکِیمِ … فَهُمْ لَا یُبْصِرُونَ» (সূরা ইয়াসিন: প্রথমাংশ)
অর্থ: “ইয়াসিন। শপথ জ্ঞানপূর্ণ কুরআনের … আর তারা কিছুই দেখতে পায় না।”
এরপর তিনি সহজেই বেরিয়ে গেলেন, অথচ কেউ তাঁকে চিনতে পারল না।
আয়াত ও হাদীসে গায়েব হওয়ার প্রমাণ
কুরআনে আরও এসেছে:
وَ جَعَلْنَا مِنْ بَیْنِ أَیْدِیهِمْ سَدّاً وَ مِنْ خَلْفِهِمْ سَدّاً فَأَغْشَیْنَاهُمْ فَهُمْ لَا یُبْصِرُونَ (সূরা ইয়াসিন: ৯)
অর্থ: “আমরা তাদের সামনে একটি প্রাচীর এবং পেছনে একটি প্রাচীর বানালাম এবং তাদের ঢেকে দিলাম। ফলে তারা কিছুই দেখতে পারল না।”
তাফসীরসমূহে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় অসংখ্য হাদীস এসেছে, যেখানে দৃষ্টির আড়ালে থাকার ঘটনা প্রমাণিত।
শুধু তাই নয়, ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-কে খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের প্রেরিত সৈন্যরা চিনতেই পারেনি। এ ঘটনা শিয়া ও সুন্নি উভয় আলেমই উল্লেখ করেছেন।
গায়েবাত: শরীর আড়ালে বনাম পরিচয় আড়ালে
এতদূর আলোচনায় বোঝা গেল— শরীর গায়েব হওয়া একটি বাস্তবতা। তবে অনেক সময় শরীর দৃশ্যমান থেকেও পরিচয় গোপন থাকতে পারে। এজন্য সবসময় অলৌকিকতার প্রয়োজন হয় না; অনেক সময় আমরা সামনে কাউকে দেখি কিন্তু চিনতে পারি না।
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর গায়েবাত: দুই রূপ
গায়েবাতের উদ্দেশ্য হলো— ইমাম মাহদী (আ.ফা.) মানুষের হাত থেকে রক্ষা পান এবং তাঁর মিশন অক্ষুণ্ণ থাকে। হাদীসসমূহ মিলিয়ে দেখা যায়— তাঁর গায়েবাত কখনো শরীর আড়ালে থাকার মাধ্যমে, কখনো পরিচয় আড়ালে থাকার মাধ্যমে, আবার কখনো উভয় প্রকারে সংঘটিত হয়েছে।
কেউ তাঁকে দেখে চিনতে পারেনি, আবার কেউ একেবারেই তাঁকে দেখেনি— যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে ঘটেছে।
শেষ কথা: শরীর আড়ালে থাকা অবশ্যই অলৌকিকতার মাধ্যমে ঘটে, কিন্তু পরিচয় আড়ালে থাকা সাধারণ নিয়মেও সম্ভব। তবে দীর্ঘকাল ধরে এ অবস্থা বজায় রাখা আল্লাহর বিশেষ কুদরতি হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।
আল্লাহ সর্বশক্তিমান— তিনি তাঁর হুজ্জাত, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর হিফাজতের জন্য সবধরনের উপায়, স্বাভাবিক বা অতিপ্রাকৃত— ব্যবহার করেন এবং করবেন।
উৎস: আয়াতুল্লাহ লুৎফুল্লাহ সাফি গুলপয়গনির কিতাব পাসুখ বে দাহ পুরসেশ পেইরামুনে ইমামাত (ইমামত সম্পর্কিত দশটি প্রশ্নের উত্তর) থেকে, প্রয়োপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনসহ।
আপনার কমেন্ট