বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৮:৫০
পরিবারে সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি নামাজ

ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে অবস্থিত হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)’র পবিত্র মাজার শরীফের বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ হামিদ মীর-বাকেরি নামাজকে পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, সন্তানদের নামাজের বিষয়ে বাবা-মাকে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। কারণ, মানুষের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং বিভিন্ন ক্ষতি ও বিপদ থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নামাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রাতে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)’র পবিত্র মাজার শরীফে আয়োজিত এক ধর্মীয় জ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ হামিদ মীর-বাকেরি হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর কোমে আগমনের বার্ষিকী উপলক্ষে আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে তাঁর মর্যাদা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) এমন অল্পসংখ্যক ইমামজাদির অন্যতম, যাঁর বিষয়ে কোনো নিষ্পাপ ইমামের সূত্রে বর্ণিত জিয়ারত (জিয়ারতে মা’সূর) পাওয়া যায়। আহলে বাইতের ইমামগণও এই মহীয়সী নারীর জিয়ারতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

শহীদরা সমাজের ওপর থাকা অধিকারের অধিকারী
ইসলামী বিপ্লব ও পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করে মীর-বাকেরি বলেন, আমাদের জীবনে বহু মানুষের অধিকার রয়েছে—শিক্ষক, চিকিৎসক, আলেম এবং এমন অনেক মানুষ, যারা মানুষের বিকাশ ও জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। তবে এসব সেবা এমন একটি নিরাপদ পরিবেশে সম্ভব হয়েছে, যে নিরাপত্তা শহীদদের রক্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ না থাকলে একজন আলেম শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মসজিদে মানুষকে হেদায়াত করতে পারতেন না; চিকিৎসকও নিশ্চিন্তে রোগীদের চিকিৎসা করতে পারতেন না। একইভাবে শিক্ষক, গবেষক ও উদ্ভাবকরাও নিরাপদ পরিবেশে তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারতেন না।

হাওযায়ে ইলমিয়ার এই শিক্ষক ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে শহীদের মর্যাদা তুলে ধরে বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ শহীদদের মৃত বলে ঘোষণা করেননি; বরং তাঁদের জীবিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন। হাদিসেও শহীদের জন্য বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.): জিয়ারতে মা’সূরপ্রাপ্ত এক মহীয়সী ইমামজাদি
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মীর-বাকেরি হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন, এই মহীয়সী নারীর মর্যাদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তাঁর জন্য কোনো নিষ্পাপ ইমামের সূত্রে বর্ণিত জিয়ারত রয়েছে। বর্ণনা অনুযায়ী, এই জিয়ারতটি ইমাম রেজা (আ.) তাঁর জন্য শিক্ষা দিয়েছেন এবং আজ তা শিয়াদের কাছে বিদ্যমান।

তিনি বলেন, জিয়ারতে মা’সূরপ্রাপ্তি ইমামজাদিদের মধ্যে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর বিশেষ মর্যাদার পরিচায়ক। আহলে বাইতের ইমামগণও তাঁদের অনুসারীদের এই মহীয়সী নারীর জিয়ারতের জন্য উৎসাহিত করেছেন।

শাফায়াত: হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর মর্যাদার আরেকটি দিক
ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে অবস্থিত হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)’র পবিত্র মাজার শরীফের এই বক্তা তাঁর জিয়ারতের একটি অংশের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই মহীয়সী নারীর জিয়ারতে তাঁর কাছে শাফায়াতের আবেদন করা হয়েছে। এটি আল্লাহর কাছে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর উচ্চ মর্যাদা ও অবস্থানের নির্দেশক।

তিনি আরও বলেন, হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর শাফায়াত শুধু পরকালেই সীমাবদ্ধ নয়; পার্থিব জীবনেও বহু মুমিন এই মহীয়সী নারীর তাওয়াসসুলের মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন।

হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর জ্ঞানগত মর্যাদা
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মীর-বাকেরি হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর জ্ঞানগত মর্যাদাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বর্ণনায় এসেছে, একদল শিয়া তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে মদিনায় এসেছিলেন। কিন্তু সে সময় ইমাম মুসা কাযিম (আ.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) তাঁদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন। পরে ইমাম কাযিম (আ.) তাঁর দেওয়া উত্তরগুলো জানতে পেরে তাঁর প্রশংসা করেন।

তিনি বলেন, এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) বিশেষ জ্ঞানগত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্বকে সাধারণ কোনো ইমামজাদির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

পরিবার: বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালনের প্রথম ক্ষেত্র
বক্তব্যের অন্য অংশে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মীর-বাকেরি পরিবারের প্রতি মানুষের দায়িত্বসংক্রান্ত কোরআনের আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের অন্যতম অধিকার হলো তাকে সুন্দর নাম দেওয়া। তাই নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাবা-মাকে নামের অর্থ ও তাৎপর্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি নামাজকে পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সন্তানদের নামাজের বিষয়ে বাবা-মাকে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। কারণ, মানুষের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং বিভিন্ন ক্ষতি থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নামাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সবশেষে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর কোমে আগমন এবং নগরবাসীর পক্ষ থেকে তাঁকে অভ্যর্থনা ও সম্মান জানানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাজার শরীফের এই বক্তা বলেন, এটি কোমের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং এ অঞ্চলের মানুষের আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha