হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ই শাবান, ইমাম সাজ্জাদ (আলাইহিস সালাম)-এর জন্মবার্ষিকী। আবু হামজা সুমালি বলেন:
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) গভীর রাতের অন্ধকারে দরিদ্রদের জন্য রুটি ও খাবার কাঁধে বহন করতেন এবং পরিচয় গোপন রেখে দান করতেন। তিনি বলতেন:-“গোপন সদকা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে।”
ধৈর্য
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর অন্যতম উজ্জ্বল গুণ ছিল বিপদের মুখে ধৈর্য ধারণ করা এবং যারা তাঁর প্রতি অসম্মান বা অন্যায় করত, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া। ইতিহাসে সব সময়ই এমন লোক ছিল যারা কখনো অজ্ঞতার কারণে, কখনো দুনিয়ামুখী হওয়ার কারণে আল্লাহর ওলিদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে তাদের কষ্ট দিত।
একদিন এক ব্যক্তি আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-কে দেখে তাঁকে কঠোর ভাষায় অপমান ও গালাগালি করল।
ইমামের সঙ্গীরা তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলে ইমাম তাদের বাধা দিয়ে বললেন:-“তার সঙ্গে কোনো রকম আচরণ করো না।”
এরপর তিনি ঐ ব্যক্তির দিকে ফিরে বললেন:-“আমাদের বাস্তবতা এর চেয়েও বেশি তোমার কাছে অজানা। যদি তোমার কোনো প্রয়োজন থাকে, বলো-আমরা তা পূরণ করব।”
ইমামের ধৈর্য, মহত্ত্ব এবং কোমল ও স্নেহপূর্ণ ভাষায় লোকটি গভীরভাবে প্রভাবিত হলো। লজ্জা তার পুরো সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, এমনকি সে আর লজ্জায় ইমামের মুখের দিকে তাকাতেও পারল না।
ইমাম সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খাদেমদের নির্দেশ দিলেন-তাকে এক হাজার দিরহাম দেওয়া হোক।
এরপর থেকে সেই ব্যক্তি যখনই ইমামকে দেখত, বলত:-“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি রাসূলুল্লাহর সন্তান এবং ওহি ও নবুয়তের পরিবারের একজন।”
ক্ষমা ও উদারতা
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর এক চাচাতো ভাই, হাসান ইবনে হাসান, তাঁর সঙ্গে মনোমালিন্য পোষণ করতেন। একদিন হাসান মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে উপস্থিত ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-কে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে তাঁকে কষ্ট দিলেন।
ইমাম তাঁর কথার জবাবে সামান্যতম প্রতিক্রিয়াও দেখালেন না-যতক্ষণ না হাসান মসজিদ ত্যাগ করলেন।
রাতে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর বাড়িতে গিয়ে বললেন:-“ভাই! আজ তুমি মসজিদে লোকজনের সামনে আমার সম্পর্কে যা বলেছ-যদি তা সত্য হয়, তবে আমি আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি; আর যদি তোমার আরোপিত কথাগুলো মিথ্যা হয়, তবে আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইছি। আল্লাহর শান্তি, দয়া ও বরকত তোমার ওপর বর্ষিত হোক।”
এই কথা বলে ইমাম চলে গেলেন।
হাসান কখনোই এমন আচরণ আশা করেননি; তিনি তো কঠোর ও তীব্র জবাব শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। হঠাৎ তিনি নিজেকে এক বিশাল মহত্ত্ব ও মর্যাদার পাহাড়ের সামনে দাঁড়ানো দেখলেন।
তিনি লজ্জিত হয়ে চোখ ভরা অশ্রু নিয়ে ইমামের পেছনে ছুটে গেলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
ইমাম দয়ার সঙ্গে তাঁর দিকে তাকালেন এবং তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
বিনয়
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) সবসময় দরিদ্রদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন এবং তাদের সঙ্গেই খাবার গ্রহণ করতেন-এমনভাবে যে তাঁকে তাদের একজন বলেই মনে হতো। এই আচরণের মাধ্যমে তিনি মানুষকে বোঝাতেন যে আল্লাহর সত্তার সামনে আত্মঅহংকার কোনোভাবেই শোভন নয়; কারণ তিনিই আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) শান্ত ও বিনয়ী ভঙ্গিতে চলাফেরা করতেন এবং কখনোই সংযম ও ভারসাম্যের সীমা অতিক্রম করতেন না।
সফরের সময় তিনি নিজেকে সঙ্গীদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেন না এবং তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। এক সফরে, যেখানে তিনি বরাবরের মতো কাজে ব্যস্ত ছিলেন, এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে চিনে ফেলে অন্যদের বলল:-“আপনারা কি এই ব্যক্তিকে চেনেন না? তিনি আলী ইবনে হুসাইন (আ.)!”
তারা যখন ইমামকে চিনতে পারল, তখন তাঁর পায়ে পড়ে গেল এবং তাঁর হাত-পা চুম্বন করতে লাগল। এরপর তাঁর প্রতি যে অবহেলা তারা করেছে বলে মনে করছিল, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল।
একদিন ইমাম এমন একদল কুষ্ঠরোগীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা একসঙ্গে বসে খাবার খাচ্ছিল। তারা তাঁকে তাদের সঙ্গে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালে তিনি বললেন:-“আমি যদি রোজাদার না হতাম, তবে অবশ্যই গ্রহণ করতাম।”
বাড়িতে ফিরে এসে তিনি উত্তম খাবার প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। পরে তিনি তাদের ইফতারের জন্য দাওয়াত করলেন এবং নিজেও তাদের সঙ্গে বসে খাবার খেলেন।
ক্ষমতাবান অবস্থায় ক্ষমা
হিশাম ইবনে ইসমাইল ছিলেন মদিনার শাসক, যিনি তাঁর শাসনামলে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ওপর ব্যাপক জুলুম করেছিলেন। অবশেষে ওয়ালিদ তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং মদিনায় ঘোষণা দেওয়া হয়:-“হিশামের শাসনামলে যাদের ওপর জুলুম হয়েছে বা যাদের অধিকার নষ্ট হয়েছে, তারা চাইলে এখন তার কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায় করতে পারে।”
এই অবস্থায় হিশাম সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর পক্ষ থেকে; কারণ তিনি ইমামের প্রতি সবচেয়ে বেশি অন্যায় করেছিলেন। কিন্তু তার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে, ইমাম যখন তার মুখোমুখি হলেন, তখন তাকে সালাম দিলেন এবং নিজের সঙ্গীদেরও বললেন যেন তারা এই দুর্বল ও অসহায় লোকটির প্রতি কোনো ধরনের কঠোরতা না দেখায়।
ইমাম তাকে আশ্বস্ত করে বললেন:-“হে হিশাম ইবনে ইসমাইল! যতটা পারো মজলুম ও অসহায় মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করো, আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ভয় নেই।”
গোপন দান
আবু হামজা সুমালি (মৃত্যু ১৫০ হিজরি) বলেন:
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) রাতের অন্ধকারে দরিদ্রদের জন্য রুটি ও খাদ্য কাঁধে বহন করতেন এবং পরিচয় গোপন রেখে তা দান করতেন। তিনি বলতেন:-“গোপন সদকা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে।”
ইমামের শাহাদাতের পর যখন তাঁকে গোসল দেওয়া হচ্ছিল, তখন দেখা গেল তাঁর কাঁধ ও পিঠে শক্ত চামড়ার দাগ রয়েছে। কারণ জানতে চাইলে বোঝা গেল-এসব দাগ ছিল দরিদ্রদের জন্য খাদ্যের বোঝা বহনের চিহ্ন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর এক চাচাতো ভাই ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। ইমাম সবসময় গোপনে ও অজ্ঞাত পরিচয়ে তাকে সাহায্য করতেন।
যেহেতু সে সাহায্যকারীর পরিচয় জানত না, তাই প্রায়ই ইমামের কাছে অভিযোগ করত-কেন তিনি তার খোঁজখবর নেন না। তবুও ইমাম কখনো বলেননি যে সেই অজ্ঞাত সাহায্যকারী তিনি নিজেই-এমনকি মৃত্যুর আগ পর্যন্তও না।
ইমামের ওফাতের পর সেই চাচাতো ভাই সত্য জানতে পারল এবং ইমামের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চাইতে লাগল।
মদিনার বহু দরিদ্র পরিবার রাতের বেলায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির দান থেকে উপকৃত হতো। তারা কখনোই জানতে পারেনি তিনি কে-যতক্ষণ না আলী ইবনে হুসাইন (আ.) ইন্তেকাল করলেন এবং সেই সাহায্য হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। তখনই তারা বুঝতে পারল-সেই অজ্ঞাত দাতা ছিলেন জয়নুল আবেদিন (আ.)।
রাতের অন্ধকারে ইবাদত ও দান
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা যুহরির সূত্রে বর্ণনা করেন:
এক শীতল ও বৃষ্টিভেজা রাতে আমি আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-কে মদিনার গলিতে দেখলাম। তাঁর কাঁধে ছিল কিছু আটা ও জ্বালানি কাঠ। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম:-“হে রাসূলুল্লাহর সন্তান! কাঁধে কী বহন করছেন?”
তিনি বললেন:-“আমার সামনে একটি সফর রয়েছে। আমি তার জন্য পাথেয় প্রস্তুত করেছি এবং তা নিরাপদ স্থানে রাখতে চাই।”
আমি বললাম:-“আমার খাদেমকে কি আপনাকে সাহায্য করতে অনুমতি দেবেন?”
তিনি বললেন: “না।”
আমি আবার বললাম:-“তাহলে আমাকে অন্তত সাহায্য করতে দিন।”
তিনি আবারও বললেন:-“না। যে জিনিস আমার সফরে কাজে আসবে, তা আমি নিজেই বহন করব। আল্লাহর দোহাই, আমাকে একা থাকতে দাও।”
কিছুদিন পর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম:-“সেই রাতের সফর কেমন ছিল?”
তিনি বললেন:-“ওটা সেই সফর ছিল না যা তুমি ভেবেছিলে। আমার উদ্দেশ্য ছিল আখিরাতের সফর। হারাম থেকে দূরে থাকা, দান করা ও সৎকর্মের মাধ্যমে আমি তার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
প্রয়োজনমন্দদের আহার করানো
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
আমার পিতা বহুবার এতিম ও দরিদ্রদের পাশে বসতেন এবং নিজ হাতে তাদের খাবার খাওয়াতেন। যাদের পরিবার বড় ছিল, তাদের জন্য খাবার পাঠাতেন।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
আলী ইবনে হুসাইন (আ.) রোজার দিনগুলোতে অনেক সময় নিজেই রান্না করতেন এবং ইফতারের সময় সেই খাবার দরিদ্রদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। অনেক সময় তাঁর নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকত না, তিনি খেজুর ও রুটি দিয়েই ইফতার করতেন।
দরিদ্রদের সঙ্গে ইমামের আচরণ কখনোই ক্ষমতাবান কারও দ্বারা দুর্বল ব্যক্তিকে উপকার করার মতো ছিল না; বরং তিনি চেষ্টা করতেন যেন সাহায্য নিতে গিয়ে তারা অপমানিত না হয়।
এ জন্যই তিনি প্রয়োজন প্রকাশের আগেই সাহায্য করতেন এবং বলতেন:-“ধন্য সে ব্যক্তি, যে আমার আখিরাতের পাথেয় বহন করে আমাকে সাহায্য করে।”
ইমাম সাদিক (আ.)-এর বর্ণনায় ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ইবাদত
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
ইসলামি উম্মাহর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) ছাড়া কেউ আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর মতো ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারেননি। তিনি এমনভাবে ইবাদত করতেন, যেন জান্নাত ও জাহান্নামকে স্বচক্ষে দেখছেন।
তিনি আরও বলেন:
আহলে বাইতের মধ্যে আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য ছিল জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর; কারণ তিনি ইবাদতে এতটাই অগ্রগামী ছিলেন যে তাঁর পুত্র ইমাম বাকির (আ.) তা দেখে বিস্মিত হয়ে কেঁদে ফেলতেন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তখন বললেন:-“যে গ্রন্থে আলী (আ.)-এর ইবাদতের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে, তা নিয়ে এসো।”
তিনি কিছুক্ষণ পড়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন:-“কে আছে, যে আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর মতো এত ইবাদত করতে পারে?”
বর্ণিত আছে, তিনি প্রতিদিন-রাতে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। যখন তাঁকে বলা হলো যে তিনি তাঁর দাদা আলী (আ.)-এর চেয়েও বেশি ইবাদত করেন, তখন তিনি বললেন:-“আমি আলীর (আ.) এক দিনের আমল পর্যবেক্ষণ করেছি এবং বুঝেছি-এক বছরের আমল দিয়েও তা সমান করা সম্ভব নয়।”
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর নামাজ
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যখন ওজু করতেন এবং নামাজের জন্য প্রস্তুত হতেন, তখন তাঁর চেহারার রং বদলে যেত। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন:-“তুমি কি জানো, আমি কার দরবারে দাঁড়াতে যাচ্ছি?”
অনেক সময় দেখা যেত, তিনি ওজু করে নামাজের সময়ের অপেক্ষায় বসে আছেন। আল্লাহর সামনে গভীর বিনয় ও বান্দাহির অনুভূতিতে তাঁর মুখে উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠত।
তাবেঈ তাওউস ইবনে কায়সান ইয়ামানি বলেন:
আমি হিজরে ইসমাঈলে ইমামকে ইবাদত ও মুনাজাতে লিপ্ত দেখেছি। নামাজে দাঁড়ালে কখনো তাঁর মুখ হলুদ, কখনো লাল হয়ে যেত। আল্লাহভীতি তাঁর পুরো দেহে প্রকাশ পেত। তিনি এমনভাবে নামাজ আদায় করতেন, যেন সেটিই তাঁর শেষ নামাজ। দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকতেন, আর সিজদা থেকে উঠলে তাঁর শরীর ঘামে ভিজে যেত। তিনি সবসময় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবরের মাটি সঙ্গে রাখতেন এবং কেবল তার ওপরই কপাল রাখতেন।
সাইয়্যিদুস সাজিদীন-এর সিজদাসমূহ
ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর সিজদার আধিক্য ও প্রতিটি সিজদার দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণেই তাঁকে “সাইয়্যিদুস সাজিদীন”-অর্থাৎ সিজদাকারীদের নেতা-উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই দীর্ঘ ও প্রচুর সিজদার ফলে তাঁর কপালের চামড়া খসখসে হয়ে গিয়েছিল।
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
আমার পিতা কোনো নিয়ামত স্মরণ করতেন না-এমন নয় যে সেই স্মরণের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন।
কুরআন তিলাওয়াতের সময় যখন তিনি সিজদার আয়াতে পৌঁছাতেন, তখনও সিজদা করতেন। তেমনি বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে, কোনো অঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হলে, ফরজ নামাজ শেষে অথবা যখনই তিনি কোনো সৎকাজ সম্পাদনে সফল হতেন কিংবা দুইজন মুমিনের মধ্যে মিল-মীমাংসা করতেন-সব ক্ষেত্রেই তিনি সিজদায় পড়ে আল্লাহর শোকর আদায় করতেন।
ইমামের এক খাদেম বর্ণনা করেন:
একদিন আমার মনিব খোলা প্রান্তরে গেলেন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তিনি প্রান্তরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইবাদতে মগ্ন হলেন।
সিজদার সময় তিনি ছোট-বড় পাথরের ওপরই কপাল রাখতেন এবং কান্না ও বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করতেন। আমি তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করলাম। সেদিন আমি গুনে দেখেছি-তিনি তাঁর সিজদায় এক হাজারবার বলেছিলেন:
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-সত্য ও নিশ্চিতভাবে;
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-ইবাদত ও দাসত্বের সঙ্গে;
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-ঈমান ও প্রত্যয়ের সঙ্গে।”
যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা তুললেন, তখন তাঁর চেহারা ও দাড়ি অশ্রুতে ভিজে গিয়েছিল।
হজের আনুষ্ঠানিকতায় ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর আধ্যাত্মিক জ্যোতি
ইতিহাসবিদরা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জন্য বিশটি হজের সফরের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন-যেসব সফরে তিনি মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী পথ হেঁটেই অতিক্রম করেছেন। যদিও তাঁর সঙ্গে বাহন থাকত, তবু তিনি দৃঢ় সংকল্প করতেন যে আল্লাহর ঘরের পথে নিজ পায়ে চলেই অগ্রসর হবেন এবং প্রিয়তমের পথে নিজের শরীর ও শক্তিকে উৎসর্গ করবেন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর অন্তরের ইরফান ও আল্লাহপ্রেম তাঁর সব ইবাদতের ওপর দীপ্তি ছড়িয়ে দিত এবং তাঁর সমগ্র জীবনকে রাব্বানী রঙ ও আধ্যাত্মিক মহিমায় রাঙিয়ে তুলত।
তিনি যখন ইহরামের পোশাক পরিধান করতেন, তখন আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর মহিমার চিন্তায় তাঁর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে যেত। তিনি এমন গভীর আধ্যাত্মিক আকর্ষণে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন যে “লাব্বাইক” উচ্চারণ করতেও সক্ষম হতেন না।
তাঁর সঙ্গীরা এই অবস্থা দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে জিজ্ঞেস করতেন:-“আপনি লাব্বাইক বলছেন না কেন?”
তিনি উত্তরে বলতেন:-“আমি আশঙ্কা করি-আমি লাব্বাইক বললেও যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর আসে: ‘লা লাব্বাইক’।”
আপনার কমেন্ট