হাওজা নিউজ এজেন্সি: পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নতুন আগ্রাসনের ইঙ্গিতের মুখে, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ইরানের মিত্র শক্তিগুলো সমন্বিতভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে দেশটির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোনো যুদ্ধ সারা অঞ্চলজুড়ে সংঘাত সৃষ্টি করবে— যা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কেউই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
গত ৪৮ ঘন্টায় প্রকাশিত একাধিক সমন্বিত বিবৃতিতে ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ঘোষণা করেছে যে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন হামলা লেভান্ট ও আরব উপদ্বীপজুড়ে একটি “ব্যাপক যুদ্ধ”র সূত্রপাত ঘটাবে। তাদের বিবৃতিতে এসব প্রতিরোধ গ্রুপ স্পষ্ট করেছে যে তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে “কবরস্থান” এবং সামুদ্রিক পথগুলোকে “নিষিদ্ধ অঞ্চল”-এ পরিণত করবে।
সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সতর্কতা এসেছে ইরাক থেকে, যেখানে শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী কাতাইব হিজবুল্লাহ প্রচলিত যুদ্ধের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে। রবিবার জারি করা বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব মার্কিন সামরিক জোরদারির বিষয়টি উপহাসসহ সতর্ক করেছেন যে, নতুন কোনো আক্রমণ “পিকনিক” হবে না।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে: “আজ ভ্রান্ত শক্তিসমূহ—ইহুদিবাদী ও অত্যাচারীরা—ইরানকে বশীভূত করতে একত্রিত হয়েছে। আমরা শত্রুদের সতর্ক করছি যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এমন এক যুদ্ধ হবে, যেখানে তোমরা নানাবিধ আকস্মিক ও তিক্ত মৃত্যুর স্বাদ পাবে এবং আমাদের এই অঞ্চলে তোমাদের কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে না।”
ইরাক ও সিরিয়া জুড়ে তাদের কঠোর ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের ব্যাপক নেটওয়ার্ক রয়েছে— এই গোষ্ঠীটি তাদের সদস্যদেরকে “দুইটি মঙ্গলের একটি— ‘বিজয় অথবা শাহাদাত’-এর জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।”
কাতাইব হিজবুল্লাহ ইরাক ও পূর্ব সিরিয়ায় অবস্থানরত অবশিষ্ট মার্কিন সৈন্যদের অত্যন্ত নিকটবর্তী এলাকায় সক্রিয়।
লেবাননে, হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম বলেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসনের দ্বিতীয় দফায় এই ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় থাকবে না। এক টেলিভিশন ভাষণে শেখ কাসেম তেহরানের সাথে ধর্মীয় ও কৌশলগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, যা জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে। তিনি ঘোষণা করেন, “আমেরিকা ও ইসরাইল যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, আমরা নিরপেক্ষ থাকব না। আমরা ইরানের বিরুদ্ধে হুমকিকে আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করি।”
হিজবুল্লাহ নেতা আরও বলেন যে ইরানের প্রতিরক্ষা তাদের জন্য একটি ধর্মীয় দায়িত্ব, কারণ ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়যেদ আলী খামেনেয়ী হচ্ছেন দ্বাদশ শিয়া ইমামের ‘প্রতিনিধি’।”
হিজবুল্লাহর কাছে উচ্চ-নির্ভুলতা সম্পন্ন গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা ইসরাইলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে সক্ষম। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর হামলার সময় দশ হাজারেরও বেশি ইসরাইলি বসতিবাদী উত্তরের দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, যাদের অনেকেই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হামলা না হওয়া সত্ত্বেও ফিরে আসেনি। কোনো নবায়িত সংঘাতে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—বিদ্যুৎ গ্রিড, বন্দর ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বাড়াতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আঞ্চলিক মিত্রকে বিপর্যস্ত করতে সক্ষম।
ইরাক ও লেবাননের বাহিনী সরাসরি মার্কিন সৈন্য ও ইসরাইলকে আঘাত করতে প্রস্তুত থাকলেও, ইরানের অন্য শক্তিশালী মিত্র ইয়েমেন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম সংকটপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ হরমুজ প্রণালী—যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রবাহিত হয়— বন্ধ করার ইঙ্গিত দেওয়ার পর ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলন সোমবার ঘোষণা করেছে যে, ইরানের ওপর মার্কিন হামলার ঘটনায় তারা “লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সকল নৌবহর ও জাহাজ ডুবিয়ে দেবে।”
গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে আনসারুল্লাহ পূর্বে কয়েক মাস ধরে ইসরাইলি মালিকানাধীন বা ইসরাইলগামী জাহাজ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। হিব্রু ভাষার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানের ফলে ইসরাইলের ইয়ালাত বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনি হামলা বন্ধ করতে হস্তক্ষেপ করলেও, পরে আনসারুল্লাহ মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করতে শুরু করলে যুদ্ধবিরতির আবেদন জানায়।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লোহিত সাগরের সামরিকীকরণের সম্মিলিত প্রভাব বৈশ্বিক তেলের দামে তাৎক্ষণিক ও বিপর্যয়কর উল্লম্ফন ঘটাবে, যা পশ্চিমা অর্থনীতিগুলোকে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলা অভিযান শুরু করেছিল, যা বিশ্লেষকদের মতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম ঘণ্টাগুলোতে নিহত সামরিক কমান্ডারদের দ্রুত প্রতিস্থাপন করে এবং দখলকৃত অঞ্চলগুলোর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরাইলি শহরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে। তেহরান এছাড়াও এ অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
গত বছর ইরানের কোনো আঞ্চলিক মিত্রই সরাসরি সংঘাতে অংশ নেয়নি, তবে ১২ দিন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ সমাপ্তির দুই দিন পর ইরানি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছিলেন যে দেশটি পুনর্গঠন ও সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্দীপনের কাজ শুরু করবে, পাশাপাশি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে যেকোনো মুহূর্তে নতুন আক্রমণ আসতে পারে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ধারণা করেছিল যে, এই মাসের শুরুতে ইরানে সংঘটিত দাঙ্গাগুলো দ্বিতীয় দফা আগ্রাসনের পথ প্রশস্ত করবে। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে মোসাদ ও সআইএ প্রশিক্ষিত ও মদদপুষ্ট সশস্ত্র ব্যক্তিরা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্যই ছিল ইরানিদেরকে রাস্তায় নামানো ও জাতীয় পর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।
প্রায় ৩,১০০ জনের মৃত্যু—যার মধ্যে প্রায় ২,৫০০ সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছিলেন—সত্ত্বেও সরকার ও সচেতন জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় অস্থিরতা এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে প্রশমিত হয়ে যায় এবং ইসরায়েল-আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর আরেকটি ইরানবিরোধী ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় রুপ নেয়।
আপনার কমেন্ট