হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, শহীদ সাইয়্যেদ মোরতেজা আভিনি তাঁর “উন্নতি ও বিকাশ” শীর্ষক প্রবন্ধে—যা “উন্নয়ন ও পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি” গ্রন্থে প্রকাশিত—ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে বিশ্বে এক নতুন সাংস্কৃতিক যুগের সূচনা এবং এক মৌলিক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, এই রূপান্তর ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও শিল্প থেকে শুরু করে রাজনীতি ও সভ্যতা পর্যন্ত সবকিছুর ভিত্তি উল্টে দেবে এবং এক নতুন নকশা নির্মাণ করবে।
গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক বাঁক অতিক্রমের সন্ধিক্ষণ
কলমের শহীদদের সর্দার সাইয়্যেদের দৃষ্টিতে, আল্লাহর অনুগ্রহে ইসলামি বিপ্লব এমন এক সময়ে বিজয় অর্জন করে, যখন মানবজাতি চরম কষ্টের শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি এক গুরুত্বপূর্ণ সত্যের ওপর জোর দেয়—২২ বাহমান ১৩৫৭ (ইরানি বর্ষপঞ্জি) কেবল ইসলামি বিপ্লবের বিজয়বার্ষিকী নয়, বরং এর সূচনাদিবস। কারণ চূড়ান্ত বিজয় তখনই সম্ভব, যখন ইসলামি সভ্যতা বাস্তবায়িত হবে। সুতরাং বিপ্লবের অর্থ হলো সেই প্রকৃত লক্ষ্য ও গন্তব্যে পৌঁছাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাঁক অতিক্রম করা।
এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিপ্লবের দুই নেতার জোরালো তাগিদ এবং সেই ধারাবাহিকতায় সাইয়্যেদ মোরতেজা আভিনির স্পষ্টভাবে বিপ্লবের সাংস্কৃতিক দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ—আমাদের বিপ্লবী পথে অগ্রসর হওয়ার রূপরেখা স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ যতটা আমরা ইসলামি বিপ্লবের সাংস্কৃতিক সত্যে বিশ্বাস ও কার্যক্রম নিবদ্ধ করব, ততটাই কঠিনতা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার মাঝেও বিপ্লবের মহান লক্ষ্যসমূহ অগ্রসর করতে সক্ষম হব এবং এভাবেই আল্লাহর অনুগ্রহে সমকালীন বিশ্বে এক গভীর সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করতে পারব।
যে বিপ্লব পাশ্চাত্য সভ্যতা ও চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে
ইমাম সাদিক (আ.) গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষক ড. মাহদি ইসলামী মনে করেন: যদি ইসলামি বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে তা বিশ্ব ঔদ্ধত্যবাদী শক্তির এমন তীব্র শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ হতো না। প্রকৃত অর্থে, ইরানের ইসলামি বিপ্লব ছিল বিশ্বব্যাপী ঔদ্ধত্যশীল ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি ও সভ্যতাগত কাঠামোতে পরিবর্তনের সূচনা—এক এমন সূচনা, যা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্যে এবং ইসলামি বিপ্লবে বিশ্বাসী ও অনুরাগীদের, বিশেষত মহান বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামমুখর ময়দানের মুজাহিদদের প্রচেষ্টায়, বিশ্বে কুফর ও নাস্তিক্যবাদী সংস্কৃতির আধিপত্যের অবসান ঘটাবে।
তিনি আরও বলেন: বাস্তবতা হলো, ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল পাশ্চাত্য আধুনিকায়নের চাপিয়ে দেওয়া মডেলের বিপরীতে ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক পরিচয়ের পুনর্জাগরণ।
ইসলামি বিপ্লবের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা
ইসলামী বিপ্লবের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান ও সূচকসমূহ ব্যাখ্যার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন: এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সম্ভবত ইসলামি–ইরানি পরিচয়ের পুনর্জাগরণ। কারণ এই বিপ্লব ইসলামকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রান্তিকতা থেকে কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে এবং এর মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইরানি জাতীয় চেতনার মধ্যে এক গভীর বন্ধন সৃষ্টি করেছে।
তিনি যোগ করেন: এই পুনর্জাগরণ কখনোই অগ্রগতির অস্বীকৃতি নয়। বরং ইসলামি বিপ্লব চেয়েছে একত্ববাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ভেতর থেকেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ নির্ধারণ করতে। এই প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান, শিল্প ও শিক্ষা—আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দ্বৈততার শেকল থেকে মুক্ত হয়ে—ঐশী ও কুরআনিক ভিত্তিতে মানবিক উৎকর্ষ সাধনের সেবায় নিয়োজিত হওয়া উচিত।
ইসলামি বিপ্লবের বরকতে খাঁটি সংস্কৃতির উৎপাদন
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন: ইসলামি বিপ্লব জাতীয় আত্মবিশ্বাস ও খাঁটি সংস্কৃতি উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এই স্বাধীনতাকামিতা কেবল পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি স্থানীয় ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশের পথও সুগম করেছে, যেগুলো পূর্বে আমদানিকৃত মডেলের ছায়ায় দমিয়ে রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে ন্যায়বিচারের দাবি রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়—এক এমন সংস্কৃতি, যা
বঞ্চিত ও নিপীড়িতদের পক্ষে দাঁড়ায় এবং পূর্ববর্তী অভিজাত ও ঔদ্ধত্যশীল সংস্কৃতিজনিত শ্রেণিবৈষম্যকে প্রত্যাখ্যান করে।
তিনি আরও বলেন: ইসলামি বিপ্লবের বরকতে সামাজিক ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—ত্যাগ, জিহাদ ও পরিবার সংস্কৃতিকে সমাজের নৈতিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আদর্শের পথে আত্মত্যাগ, যা পবিত্র প্রতিরোধকালে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পরিণত হয়, যা ব্যক্তিগত দায়িত্বকে সামষ্টিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। একই সঙ্গে মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা হিসেবে পরিবারের গুরুত্ব অনুধাবন করে, ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার মাধ্যমে বস্তুবাদী সংস্কৃতির আক্রমণের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
তিনি উল্লেখ করেন: অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লব একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প হিসেবে বিশ্বাস, স্বাধীনতা ও অগ্রগতির মতো ধারণাসমূহের সমন্বয়ে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়েছে, যেখানে ভোগবাদীর পরিবর্তে অর্থ ও মূল্যবোধের উৎপাদক হওয়া মুখ্য এবং বিদেশি সভ্যতার ওপর নির্ভরতার বদলে নিজের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্বাতন্ত্র্যকে ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রার ভিত্তি করা হয়।
দেশের সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এক পথনির্দেশ
হাওজা ইলমিয়া মহিলা শাখার গবেষক নারজেস শোকরজাদে বলেন: ইসলামি বিপ্লব থেকে উৎসারিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণে বিপুল সংগ্রাম ও ত্যাগ প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি বিপ্লবের প্রজ্ঞাবান নেতা আলবোর্জ শহীদের কংগ্রেসের কর্মী ও আয়োজকদের সঙ্গে সাক্ষাতে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইঙ্গিত করে বলেন: “একটি ভালো কাজের চিন্তা ও পরিকল্পনা—কাজের অর্ধেক; দ্বিতীয় অর্ধেক, যা আরও গুরুত্বপূর্ণ, হলো সেই কাজের অনুসরণ, ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন।”
এই আপাতদৃষ্টিতে সহজ বাক্যটির ভেতরে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রয়েছে—তা হলো, সঠিক চিন্তা, যথাযথ পরিকল্পনা এবং দৃঢ় অনুসরণের মাধ্যমে অকার্যকর বা স্বল্প-প্রভাবসম্পন্ন কাজের ব্যাপক উৎপাদন রোধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন: নিঃসন্দেহে ইসলামি বিপ্লব ও এর বিস্ময়কর সাফল্যসমূহ সংরক্ষণের পথে আমাদের সচেতন থাকতে হবে যে, আড়ম্বরপূর্ণ ও প্রদর্শনমূলক সাংস্কৃতিক কাজ, যা প্রকৃত প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ, তা মূলত ক্ষণস্থায়ী এক মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের মতো। উদাহরণস্বরূপ, একটি আবেগঘন বক্তৃতা বা একটি অনুভূতিপ্রবণ ভিডিও সাময়িকভাবে দর্শকের আবেগ জাগিয়ে তুলতে পারে, কিন্তু সেই প্রভাব জলের ঢেউয়ের মতো দ্রুত মিলিয়ে যায়। অথচ ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের ৪৭ বছর পর এবং শত্রুর বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের তীব্রতা বিবেচনায়, আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী, গভীর ও সূক্ষ্ম কাজ—যা রূপ ও বিষয়বস্তু উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় হবে।
আপনার কমেন্ট