শুক্রবার ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৩:৪০
কেন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে হলো?

কেন ট্রাম্প— বহু হুমকি, সামরিক মহড়া এবং অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ভঙ্গি নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথে পিছু হটলেন—এই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: যখন ট্রাম্প একের পর এক হুমকি এবং ইরানের উপর আক্রমণের ভঙ্গি দেখানোর পর হঠাৎ করে বললেন, “ইরান মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ করায় আমরা আপাতত হামলা থেকে বিরত থাকছি”, তখন ইসলামী বিপ্লবের নেতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই রাজনৈতিক নাটকের জবাব দেন। তাঁর প্রথম ভাষণে স্পষ্টভাবে তিনি বলেন, “ইরানের জনগণ ফিতনার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে; ফিতনাবাজদের মেরুদণ্ডও ভেঙে দেবে— হোক তারা দেশের ভেতরের অপরাধী বা বাইরের অপরাধী, কাউকেই ছেড়ে দেওয়া হবে না।”

এই বক্তব্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছিল—ট্রাম্পের হাতে বাস্তবে কিছুই নেই। ইরানবিরোধী হুমকির খরচ এড়াতে ট্রাম্প যে অজুহাতের দড়ি ধরে পালাতে চেয়েছিলেন, বিপ্লবী নেতা সেটিকে একেবারেই অকার্যকর করে দেন।

শুরু থেকেই ট্রাম্পের দাবি ছিল অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর। কারণ ইরানে বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, যেখানে সব দিক খতিয়ে দেখতে সময় লাগে। কোনো রায় হুট করে দেওয়া হয় না, তেমনি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকরও করা হয় না। কিন্তু এই স্পষ্ট ও দৃঢ় বক্তব্য ট্রাম্পকে কার্যত কোণঠাসা করে ফেলে।

এই ভাষণের পর ট্রাম্প পুরোপুরি এক অচলাবস্থায় পড়ে যান। তিনি হামলা চালাতে পারছিলেন না—কারণ যদি বাস্তব সক্ষমতা থাকত, তবে হামলা বাতিলের জন্য এমন অজুহাত খুঁজতে হতো না। আবার নিজের অবস্থান থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার পথও তাঁর ছিল না। তিনি বিষয়টিকে নিজের জন্য ‘মর্যাদার প্রশ্নে’ পরিণত করেছিলেন, অথচ এই মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা তিনি সঠিকভাবে হিসাব করেননি।

এত হুমকি, নৌবহর পাঠানো এবং প্রচারণামূলক যাত্রার পর যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি দৃশ্যমান ‘সাফল্য’ প্রয়োজন ছিল। তা না হলে পুরো ঘটনাপ্রবাহ তাদের জন্য চরম অপমান ছাড়া কিছুই বয়ে আনত না। সেই পরিস্থিতিতে একমাত্র পথ ছিল—আবার আলোচনার টেবিলে ফেরা, যাতে তারা দাবি করতে পারে যে এই সব হুমকি ও চাপ ‘নিষ্ফল’ ছিল না।

ইরানও নিজের শর্তে আলোচনা করতে সম্মত হয়—এমন আলোচনা, যার মূল লক্ষ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

আলোচনার শুরুর দিকের পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলোচনার আগে ট্রাম্প একাধিক শর্ত আরোপ করেছিলেন—
• ইরানকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে,
• আলোচনার স্থান যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করবে,
• আলোচনার বিষয় শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলোও যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী সমাধান করতে হবে।

কিন্তু এই শর্তগুলোর একটিও গৃহীত হয়নি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই পিছু হটতে হয়েছে। এটিই আজকের যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র—একটি শক্তি, যা শুধু আর্নল্ড বা হারকিউলিসের মতো ভঙ্গি দেখাতে পারে, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা নেই।

আজ ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র তীব্র চাপে রয়েছে। গত এক বছরে তিনি আমেরিকান জনগণের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। একের পর এক প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়েছে:
• ইউক্রেন যুদ্ধ তিন দিনে শেষ হয়নি,
• চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ কার্যকর ফল দেয়নি,
• ইয়েমেন ধ্বংস হয়নি,
গ্রিনল্যান্ড, মিনিয়াপোলিসসহ নানা উচ্চকিত প্রকল্পও বাস্তব রূপ পায়নি,
• ভেনেজুয়েলাতেও মাদুরোর সরকার টিকে আছে।

এর পাশাপাশি ‘এপস্টিন ফাইল’–সংক্রান্ত চাপ ট্রাম্পকে আরও সংকটে ফেলেছে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আজ তার ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল সময় পার করছে।

তবে একটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও দক্ষ— গণমাধ্যমের খেলা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো ও সাজানো খবর তৈরি করাই এখন তাদের প্রায় একমাত্র অস্ত্র; যদিও এই অস্ত্র শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাই আরও ক্ষুণ্ণ করছে।

এমন পরিস্থিতিতে, আসন্ন সময়ে আলোচনাকে ঘিরে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha