শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৭:৩৫
বেলায়েতে ফকিহের দলিল
(আকলি বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ)

বেলায়েতে ফকিহের প্রমাণ দুই দিক থেকে বিশ্লেষণযোগ্য: ১. আকলি (বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি) ২. নাকলি (কুরআন ও হাদিসভিত্তিক বর্ণনা) অর্থাৎ, একদিকে মানববুদ্ধি একজন মুসলমানকে গায়েবাতের যুগে একজন যোগ্য ফকিহের আনুগত্য করতে নির্দেশ দেয়, অন্যদিকে ইসলামী বর্ণনাসমূহও এই নেতৃত্বকে সমর্থন করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমাম মাহদী (আল্লাহ তাআলা তাঁর আগমন ত্বরান্বিত করুন)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের লক্ষ্যে “আদর্শ সমাজের দিকে” শিরোনামে মাহদাভিয়্যাত বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনা উপস্থাপন করা হচ্ছে।

বেলায়েতে ফকিহ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোর একটি হলো এর প্রমাণসমূহ। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়ে আসছে—কেন ইসলামী সমাজে একজন ফকিহ অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পাবেন এবং কেন তিনিই সমগ্র সমাজের ওপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী হবেন?

এর উত্তরে বলা যায়, বেলায়েতে ফকিহের পক্ষে আকলি ও নাকলি— উভয় প্রকার শক্তিশালী প্রমাণ বিদ্যমান।

বেলায়েতে ফকিহের আকলি প্রমাণের বিশ্লেষণ
মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক জীব। সে সমাজবদ্ধ জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই নিজের মানবিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় পৌঁছাতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজের দুটি মৌলিক উপাদান অপরিহার্য—
১. ঐশী আইন
এমন আইন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হওয়ায় সকল প্রকার ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা ও ভুল থেকে মুক্ত। এই আইন সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এবং এর বাস্তবায়ন মানুষের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই ঐশী আইন হলো কুরআন ও সুন্নাহ, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবনব্যবস্থা

২. জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ শাসক
যিনি ঐ ঐশী আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

এটি সুস্পষ্ট যে, এই দুইটির যেকোনো একটি অনুপস্থিত হলে মানবসমাজ অবশ্যম্ভাবীভাবে বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হবে।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির অনিবার্য ফলাফল হলো— নবীদের প্রয়োজনীয়তা এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর মাসুম ইমামদের ইমামতের অপরিহার্যতা। কারণ আল্লাহর বিধান কার্যকর করার জন্য সর্বোত্তম ও সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন মাসুম ইমাম—যিনি চিন্তা, বিশ্বাস, আচরণ ও কর্মে সম্পূর্ণরূপে পাপ, ভুল ও বিচ্যুতি থেকে মুক্ত।

গায়েবাতের যুগে করণীয়
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়— যখন মাসুম ইমামের কাছে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব নয়, অর্থাৎ গায়েবাতের যুগে, তখন মুসলিম সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে?

এ ক্ষেত্রে আকল বা মানববুদ্ধির উত্তর হলো—
যেহেতু সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় পৌঁছানোর প্রয়োজন এখনো বিদ্যমান, তাই মাসুম ইমামের সবচেয়ে নিকটবর্তী যোগ্য ব্যক্তিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।

মাসুম ইমামের নেতৃত্বের যোগ্যতার মূল কারণগুলো হলো—
• দ্বীন ও শরিয়তের ওপর পূর্ণাঙ্গ ও গভীর জ্ঞান
• সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতা
• ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রবৃত্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা
• সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতা, • প্রজ্ঞা ও দক্ষতা

কেন বেলায়েতে ফকিহ?
গায়েবাতের যুগে যিনি এই বৈশিষ্ট্যগুলো সর্বাধিক পরিমাণে ধারণ করেন, তিনি হলেন— একজন তাকওয়াবান, ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও যুগসচেতন ফকিহ।
কারণ—
• অ-ফকিহ বা যিনি ফকিহ নন এমন ব্যক্তি ইসলামী আইন, বিধান ও দর্শনে পূর্ণ পারদর্শী নন
• জ্ঞানী হলেও তাকওয়াহীন ব্যক্তি প্রবৃত্তি, ক্ষমতার লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থের শিকার হতে পারেন
• প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ ব্যক্তি সমাজ পরিচালনায় সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হন

অতএব, মুসলিম সমাজের শাসনভার অজ্ঞ, অনৈতিক বা অদক্ষ ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য নয়।

এই সমস্ত যুক্তির সমষ্টিগত ফলাফলই হলো বেলায়েতে ফকিহের আকলি ভিত্তি ও যৌক্তিকতা।

গ্রন্থসূত্র: “নেগিনে অফারিনেশ” থেকে (প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও সম্পাদনাসহ) সংকলিত

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha