শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৩:৪৩
ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে আয়াতুল্লাহ খামেনির দূরদর্শী নেতৃত্ব: একটি বিশ্লেষণ

হাওজা নিউজ এজেন্সিকে সাক্ষাত্কার দিয়েছেন মুস্তাক আহমেদ পশ্চিমবঙ্গ, আসামে প্রচারিত ইসলামিক বাংলা ভাষায় প্রকাশিত 'সত্যের পথে পত্রিকা'র সম্পাদক মুস্তাক আহমদ

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, 

ভূমিকা:
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রনীতি কয়েক দশক ধরেই আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনির নেতৃত্বে এই নীতি কেবল আঞ্চলিকই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও একটি গতিশীল ও প্রভাবশালী ভূমিকা রেখে চলেছে। তাঁর এই দীর্ঘমেয়াদী, স্পষ্টভাষী ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকাকে অনেকেই "দূরদর্শী নেতৃত্ব" বলে অভিহিত করেন। এই নেতৃত্বের রূপরেখা, আদর্শিক ভিত্তি, কৌশলগত সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আজ আমাদের সাথে আছেন ইসলামি চিন্তাবিদ গবেষক ও লেখক জনাব মুস্তাক আহমেদ। স্বাগতম, জনাব।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুস্তাক আহমেদ, প্রথমেই জানতে চাইব, আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন "দূরদর্শী নেতৃত্ব" এই পরিভাষাটি? এবং ইরানের প্রেক্ষাপটে, আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বকে এই সংজ্ঞায় ফেলা যায় কি না?

মুস্তাক আহমেদ: আপনাকে ও আপনাদের পাঠককুলকে ধন্যবাদ। দূরদর্শী নেতৃত্ব বলতে আমি বুঝি এমন একটি দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা, যা তাত্ক্ষণিক আবেগ বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, জাতির দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, আদর্শিক চেতনা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে একটি সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে রক্ষা ও অগ্রসর করে। এটি কেবল প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে অনুমান করে প্রস্তুতি নেওয়া ও প্রবাহকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা।

ইরানের ক্ষেত্রে, আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্ব এই সংজ্ঞার প্রায় নিখুঁত প্রকাশ। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে একটি অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিবেশে ইরানের হাল ধরেছেন। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য, কিন্তু তা এমনভাবে যা বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োগযোগ্য। তিনি "প্রতিরোধক অর্থনীতি", "প্রতিরক্ষা-নিবিড় কূটনীতি" এবং "আঞ্চলিক সমর্থন নেটওয়ার্ক" এর মতো ধারণাগুলোকে কেবল স্লোগান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর দূরদর্শিতার প্রমাণ মিলবে এই সত্যে যে, তীব্রতম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক অবরোধের মধ্যেও ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে এবং বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি কাকতালীয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির ফসল।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তাহলে বলতে চাইছেন, তাঁর নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ? এই আদর্শবাদী ভিত্তি কি আধুনিক বিশ্বে ইরানের জন্য বিচ্ছিন্নতা বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, নাকি শক্তি যুগিয়েছে?

মুস্তাক আহমেদ: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। হ্যাঁ, ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ – বিশেষভাবে "নির্ভরশীলতা-বিহীনতা" (অর্থাৎ পূর্ব বা পশ্চিম কোন দিকেরই প্রভাব মেনে না নেওয়া), "নিপীড়িতদের পক্ষাবলম্বন" এবং "আমেরিকান ও ইহুদিবাদী আধিপত্যের বিরোধিতা" – নিঃসন্দেহে তাঁর নেতৃত্বের মেরুদণ্ড। কিন্তু এখানে দূরদর্শিতার বিষয়টি হলো, খামেনি এই আদর্শকে একটি অনমনীয় ডগমা হিসেবে নয়, বরং একটি গতিশীল নীতিনির্ধারণী কাঠামো হিসেবে প্রয়োগ করেছেন।

এই আদর্শিক ভিত্তি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে – যেমন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ক্রমাগত উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞার বোঝা – অন্যদিকে এটি ইরানের জন্য একটি অকল্পনীয় শক্তির উৎসও হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি জাতিকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্য ও পরিচয় দিয়েছে, যা শুধু জাতীয়তাবাদ নয়, বরং একটি বিশ্বাসভিত্তিক মিশনের অনুভূতি জাগিয়েছে। এটি ইরানকে আঞ্চলিকভাবে এমন সব শক্তিসমূহ ও গোষ্ঠীর কাছে একটি 'আদর্শিক মেরুকরণের' কেন্দ্রে পরিণত করেছে যারা নিজেদেও পশ্চিমা বা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত দেখতে চায়। সিরিয়ার সরকার, হেজবুল্লাহ, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ—এদের সাথে ইরানের সম্পর্ক কেবল কৌশলগত স্বার্থের নয়, বরং একটি আদর্শিক বন্ধনের উপরও দাঁড়িয়ে। এই আদর্শিক শক্তি ইরানকে একটি 'নরম শক্তি' প্রদান করেছে, যা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অবরুদ্ধ করা কঠিন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কয়েকটি স্তম্ভ আমরা দেখি: যেমন, "পশ্চিম-বিরোধিতা" নয় বরং "পশ্চিম-প্রতিরোধ", "আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আত্মনির্ভরতা", "সীমিত সম্পদ নিয়ে পরাশক্তির মোকাবেলা" ইত্যাদি। এই কৌশলগুলোর বাস্তবায়নে আপনি কী কী সাফল্য দেখেছেন?

মুস্তাক আহমেদ: বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা বলা যায়:

১. আঞ্চলিক প্রভাবের বিস্তার ও সুসংহতকরণ: ইরাক ও সিরিয়ায় আমেরিকান ও জিহাদি হুমকির মুখে শিয়া-অধ্যুষিত সরকারগুলোকে টিকিয়ে রেখে, ইরান একটি "শিয়া করিডোর" বা "প্রতিরোধ অক্ষ" বলতে যা বোঝায়, তা স্থাপনে সফল হয়েছে। এটি ইরানের নিরাপত্তাকে তার সীমানার বাইরে প্রসারিত করেছে এবং তেল রপ্তানির পথে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে।

২. প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অভূতপূর্ব উন্নয়ন: নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, স্থানীয়ভাবে উন্নত ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন প্রযুক্তি ও নৌ সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এটি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা তৈরি করেছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলার ঝুঁকিকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে। বিশেষত, ইমাদ ও ফাতেহ মিসাইল প্রযুক্তি আঞ্চলিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

৩. কূটনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা: "নির্ভরশীলতা-বিহীনতার" নীতি ইরানকে আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে তার নিজস্ব অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। সিরিয়া সংকটে, ইয়েমেন সংকটে, বা পরমাণু চুক্তির প্রশ্নে, ইরান বাইরের চাপে নতি না স্বীকার করে নিজস্ব গণনা অনুযায়ী চলতে পেরেছে।

৪. অর্থনৈতিক অবরোধকে টিকিয়ে থাকা: "প্রতিরোধক অর্থনীতি"-র ধারণা নিষেধাজ্ঞার কঠিন সময়ে দেশটিকে সম্পূর্ণভাবে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যদিও অর্থনৈতিক ক্ষতি ভয়াবহ, কিন্তু রাষ্ট্রটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং অর্থনীতিকে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও কিছু আঞ্চলিক শক্তির তীব্র উদ্বেগ ও বিরোধিতা রয়েছে। সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, লেবাননে ইরানের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এটি কি আত্মরক্ষামূলক বলয়ে পরিণত হয়েছে, নাকি আক্রমণাত্মক প্রভাব বিস্তারের নীতি?

মুস্তাক আহমেদ: এটি আত্মরক্ষামূলক বলয় ও প্রভাব বিস্তারের নীতির একটি জটিল সমন্বয়। ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি মূলত আত্মরক্ষামূলক। এর যুক্তি হলো: যদি সিরিয়ার সরকার (ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র) পতন হতো, বা ইরাক আমেরিকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যেত, বা হেজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ত, তবে ইরান নিজেই শত্রু শক্তির দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ত। তাই, এগুলোকে "গভীর প্রতিরক্ষা" বা "এডভান্সড পারিমিটার" হিসেবে দেখা হয়।

তবে বাস্তবতা হলো, এই আত্মরক্ষামূলক কৌশলটি ইরানকে একটি আঞ্চলিক সুপারপাওয়ারে পরিণত করেছে। ইরাকের রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি একটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। হেজবুল্লাহ লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি। ইয়েমেনে হুথি নেতৃত্ব ইরানের সমর্থন ছাড়া সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে এতদিন টিকে থাকতে পারত কিনা সন্দেহ। সুতরাং, প্রাথমিক উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা হলেও এর ফলাফল হয়েছে আঞ্চলিক কর্তৃত্বের বিস্তার। এই কর্তৃত্বই ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুদের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে। এটি একটি দূরদর্শী "প্রতিরোধক-প্রতিরক্ষা" মডেল।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) ইরানের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরীক্ষা ছিল। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রস্থান এবং পরবর্তী ইরানের অবস্থান – এখানে খামেনির নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কী প্রতিফলন দেখেছেন? অনেকেই বলেন, চুক্তি করা এবং ভাঙা উভয় ক্ষেত্রেই ইরান কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত লাভবান হয়েছে।

মুস্তাক আহমেদ: পরমাণু চুক্তি খামেনির দূরদর্শিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমত, তিনি চুক্তিতে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখিয়েছেন যে ইরান সম্পূর্ণরূপে একঘরে নয়, এবং তার কূটনৈতিক বিকল্প রয়েছে। চুক্তি সম্পাদন করে তিনি নিষেধাজ্ঞার একটি বড় অংশ তুলে নিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেন জুগিয়েছিলেন।

কিন্তু এখানেই তাঁর দূরদর্শিতা বেশি করে ফুটে উঠেছে। তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন যে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং চুক্তির সুফল পুরোপুরি না আসা পর্যন্ত ইরান তার সমস্ত কার্ড ছাড়বে না। প্রকৃতপক্ষেও তাই ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে গেলে, খামেনি কিন্তু চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করেননি। বরং তিনি একটি ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের নীতি ঘোষণা করেন, যেখানে ইউরোপীয় পক্ষগুলো তাদের দায়িত্ব পালন না করলে ইরান ধীরে ধীরে তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে।

এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় (বিশেষত ইউরোপ) কে চাপে ফেলেছেন, অন্যদিকে পরমাণু কর্মসূচিকে অগ্রসর করার কারিগরি ও রাজনৈতিক সক্ষমতা বজায় রেখেছেন। এখন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ আগের চেয়ে অনেক বেশি, এবং এর পরমাণু অবকাঠামোও উন্নত। অর্থাৎ, চুক্তির সময় ইরান কিছু ছাড় দিয়েছিল কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞান রেখেছিল। চুক্তি ভাঙার পর, সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা আগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এটি একটি অত্যন্ত গণনাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মনোভাবেরই নির্দেশক।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: "পূর্ব দিকে মনোযোগ" নীতি – বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন – ইরানের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? এই সম্পর্কগুলো কি কৌশলগত জোট, নাকি প্রয়োজনভিত্তিক অংশীদারিত্ব?

মুস্তাক আহমেদ: এটি এখন ইরান পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমের সাথে সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে, রাশিয়া ও চীনের দিকে মোড় নেওয়া একটি বাধ্যতামূলক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল।

রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত কৌশলগত, বিশেষত সিরিয়া সংকটে সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত। রাশিয়া ইরানের জন্য পশ্চিমা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। তবে এটি একটি অস্থির মিত্রতা; উভয়ের স্বার্থ কখনো কখনো সংঘাতপূর্ণ হয় (যেমন কাস্পিয়ান সাগর বা আজারবাইজানে)।

চীনের সাথে সম্পর্ক এর আকার আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদী। ২৫ বছরব্যাপী কৌশলগত চুক্তিটি এর প্রমাণ। চীন ইরানের জন্য: ১) নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তেল ক্রেতা, ২) অবকাঠামো বিনিয়োগকারী, এবং ৩) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঢাল। চীনের "বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ"-এ ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর।

তবে আমি একে "কৌশলগত অংশীদারিত্ব" বলব, "জোট" নয়। কারণ ইরান এখনও তার "নির্ভরশীলতা-বিহীন" নীতি থেকে সরে আসেনি। চীন বা রাশিয়ার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে ইরান রাজি নয়, এবং চীন বা রাশিয়াও ইরানের জন্য আমেরিকার সাথে সরাসরি সংঘাতে যাবে না। এটি একটি প্রয়োজনভিত্তিক, স্বার্থকেন্দ্রিক, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যা ইরানকে পশ্চিমা চাপ সহ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্থান করে দিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আলোচনার জন্য অনেক ধন্যবাদ, মাওলানা রুহুল আমিন। শেষ প্রশ্ন: ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, আয়াতুল্লাহ খামেনির পরবর্তী প্রজন্ম বা উত্তরসূরিরা কি এই দূরদর্শী, আদর্শনির্ভর কিন্তু বাস্তবতাসম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন? নাকি ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার মুখে বড় ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে?

মুস্তাক আহমেদ: এটি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খামেনির নেতৃত্ব ব্যক্তিগত কারিশমা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানের অটুট সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর উত্তরসূরি, যেই হোন না কেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও বৈদেশিক নীতির দক্ষতা প্রথমে খামেনির সাথে তুলনীয় হবে না।

তবে আমি মনে করি, পররাষ্ট্রনীতির মূল কাঠামোটি – প্রতিরোধের নীতি, আঞ্চলিক সমর্থন নেটওয়ার্কের প্রতিরক্ষা, এবং পশ্চিমের আধিপত্য মেনে না নেওয়া – এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটি শুধু একজন নেতার পছন্দ নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর) গভীরে প্রোথিত একটি দর্শন।

তবে বাস্তবতা কিছু সমন্বয় চাপিয়ে দেবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, এবং সম্ভবত আরও জটিল আঞ্চলিক সম্পর্ক (যেমন সৌদি আরবের সাথে সাম্প্রতিক বৈরিতার সমাপ্তি) নতুন নেতৃত্বকে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করতে বাধ্য করবে। কিন্তু আমি মনে করি না যে মৌলিক দিকনির্দেশনা পরিবর্তন হবে। কারণ, এই নীতিই ইরানকে অস্তিত্ব ও প্রভাব রক্ষায় সহায়তা করেছে। পশ্চিমের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন সম্ভব, কিন্তু তা হবে ইরানের শর্তে, এবং ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা অস্বীকার না করে। সেটাই হবে প্রকৃত দূরদর্শিতা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আজ আমাদের সাথে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ। আপনার বিশ্লেষণ আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha