সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৯:৪০
আল্লাহর মনোনীত ইমাম বনাম মানুষের বানানো ইমাম

আল্লাহর মনোনীত ইমাম বনাম মানুষের বানানো ইমাম

(কোরআন ও আহলে বাইতের আলোকে এক আত্মজাগরণ)

কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন আহলে বাইত যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি আহলে বাইত ছাড়া কোরআনের ব্যাখ্যাও বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, 

রিপোর্ট: মুস্তাক আহমদ 

পবিত্র কোরআন কখনো মানুষকে অন্ধ অনুসরণের দিকে ডাকেনি, বরং কোরআন বারবার সতর্ক করেছে—যে আনুগত্য আল্লাহ নির্ধারণ করেননি, সে আনুগত্য ধ্বংসের পথ। আল্লাহ তায়ালা বলেন— “যদি তোমরা তোমাদেরই মতো একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” — সূরা মোমিনুন: ৩৪
   এই আয়াত কেবল অতীত কোনো জাতির ইতিহাস নয়; এটি সব যুগের উম্মাহর জন্য একটি মাপকাঠি। প্রশ্ন একটাই— কোন মানুষের আনুগত্য ধ্বংস ডেকে আনে, আর কোন আনুগত্য মুক্তির পথ দেখায়?

(১)কোরআনের দৃষ্টিতে আনুগত্যের সীমানাঃ
———পবিত্র কোরআন আনুগত্যকে তিনটি স্তম্ভে সীমাবদ্ধ করেছে— “হে মুমিনগণ! আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে যাঁরা কর্তৃত্বশীল (উলুল আমর), তাঁদের।” 
— সূরা নিসা: ৫৯
     এই আয়াতে “উলুল আমর” কোনো সাধারণ শাসক বা সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা নন। কারণ— আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য নিরশর্ত, অতএব উলুল আমরের আনুগত্যও হতে হবে নির্ভুল ও গুনাহমুক্ত
গুনাহগার, কোন সাধারন মানুষ বা জালেম বা ক্ষমতালোভী কেউ আল্লাহর আনুগত্যের কাতারে বসতে পারে না।

(২) ইমাম জাফর আস-সাদিক (আঃ) ও সূরা মোমিনুনের তাফসীরঃ
——— এই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করেছেন ইমাম জাফর আস-সাদিক (আলাইহিস সালাম)। সূরা মোমিনুনের ৩৪ নং আয়াতের তাফসীরে তিনি বলেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর মনোনীত ইমাম ব্যতীত মানুষের তৈরি করা কোনো ইমামের অনুসরণ করে, সে নিজেই মুশরিক; কারণ সে আল্লাহর সাথে শিরক করেছে।”
— আল-শেখ আস-সদূক, পৃ. ৭৯
— বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৮, পৃ. ৩৬৬
— ওসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ১৮, পৃ. ৫৬১
— হায়াতুল কুলুব, খণ্ড ৩
এখানে শিরক মানে মূর্তিপূজা নয়;
এখানে শিরক মানে আল্লাহ নির্ধারিত হিদায়াতের পরিবর্তে মানুষের বানানো নেতৃত্বকে দ্বীনের মাপকাঠি বানানো।

(৩) নবুওয়াতের পর হিদায়াত: আহলে বাইতের ভূমিকাঃ
——— নবী করিম (সঃ) তাঁর বিদায় হজে স্পষ্টভাবে উম্মাহকে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন— “আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী আমানত রেখে যাচ্ছি—আল্লাহর কিতাব ও আমার আহলে বাইত। যতদিন তোমরা এ দুটিকে আঁকড়ে ধরবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।” (— হাদিসে সাকালাইন)
অতএব কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন আহলে বাইত যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি আহলে বাইত ছাড়া কোরআনের ব্যাখ্যাও বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
জুলুম ও জালেমদের ব্যাপারে ‘সন্দেহ’ কেন ভয়ংকর
ইমাম জাফর আস-সাদিক (আঃ) আরও বলেন—
“যে ব্যক্তি আমাদের শত্রুদের এবং আমাদের উপর জুলুমকারীদের কুফর সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে, সে নিজেও কাফের।”
— আল-শেখ আস-সদূক
— বিহারুল আনওয়ার
— ওসাইলুশ শিয়া
এটি কোনো আবেগী উক্তি নয়; এটি নৈতিক অবস্থানের ঘোষণা। কারণ— জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঈমানের অংশ, জালেমকে নিরপেক্ষ চোখে দেখা মানে জুলুমকে বৈধতা দেওয়া৷ 

(৪) কারবালার শিক্ষা এখানেই—
——— সত্য ও মিথ্যার মাঝে কোনো মধ্যপথ নেই।
কারবালা: ইমামতের জীবন্ত দলিল, মনে রাখা দরকার ইমাম হুসাইন (আঃ) ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি;
তিনি ভ্রষ্ট ইমামত ও জাল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কোরআনের সত্যকে রক্ষা করেছেন জীবন দিয়ে।
তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন— সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মানদণ্ড নয়, ক্ষমতা হিদায়াতের দলিল নয়, সত্য সবসময় আল্লাহর মনোনীত হিদায়াতের সাথে থাকে
আজকের উম্মাহর প্রতি প্রশ্ন৷ 

আজ কোরআন ও আহলে বাইতের আলোকে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা জরুরি— আমরা কি সত্যিকারের উলুল আমরকে চিনি?
নাকি আমরা ক্ষমতা, পরিচিতি ও সংখ্যার মোহে মানুষের বানানো ইমামকে অনুসরণ করছি? আমরা কি জুলুমের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানে আছি, না সন্দেহের আড়ালে আত্মরক্ষা করছি?

 অতএব মুক্তির পথ একটাই —
——— কোরআন ও আহলে বাইত একসাথেই ঘোষণা করে— হিদায়াত আল্লাহ নির্ধারণ করেন, মানুষ নয়।
মানুষের বানানো ইমাম ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর মনোনীত ইমামই কেয়ামত পর্যন্ত হিদায়াতের নিরাপদ পথ। তাই আজও সময় আছে— ফিরে আসার, চিনে নেওয়ার, আর সত্যের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha