মঙ্গলবার ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৯:৫৩
আত্মসংযম ও আত্ম-পর্যবেক্ষণ ছাড়া আত্ম-পরিচয় সম্ভব নয়

মানুষের আত্মিক উন্নয়ন ও আল্লাহমুখী জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিজের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি বা মুরাকাবাত-ই নফস। আত্মাকে শুদ্ধ করা, নিজের অবস্থান চেনা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে হলে বাহ্যিক আচরণ ও অন্তরের অবস্থাকে কুরআনের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অপরিহার্য। এই গভীর বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিশিষ্ট আরিফ ও দার্শনিক আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.)।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.) তাঁর এক গ্রন্থে আত্ম-পর্যবেক্ষণ বা নিজের ওপর সচেতন নজরদারির গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, আত্ম-জ্ঞান (নফসের মারেফাত) অর্জনের পথে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পূর্ণ মনোযোগ ও স্থিরতার সঙ্গে আত্মার উপর নজর রাখা। অর্থাৎ মানুষ যেন সর্বদা আল্লাহকে স্মরণে রাখে— নিজেকে আল্লাহর উপস্থিতিতে অনুভব করে এবং তাঁর দৃষ্টির সামনে নিজের প্রতিটি কাজ, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে বিবেচনা করে।

তিনি আরও বলেন, মানুষের বাহ্যিক ও অন্তঃস্থ জীবন—অর্থাৎ আচরণ, কথা, চিন্তা, নিয়ত ও মননের প্রতিটি স্তর—তার প্রকৃত বিকাশের পথ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া জরুরি। আর এই বিকাশের পথের একমাত্র সঠিক নির্দেশনা হলো পবিত্র কুরআন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

 إِنَّ هٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ

“নিশ্চয় এই কুরআন সেই পথ প্রদর্শন করে যা সবচেয়ে সঠিক।”

আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.) ব্যাখ্যা করে বলেন, কুরআনের এই নির্দেশনাকে মানুষের জীবনের মূল স্রোতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ, ইবাদত, লেনদেন ও নৈতিক চরিত্রে—কুরআনের শিক্ষা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

তিনি একটি সুন্দর উপমা ব্যবহার করেন। যেমন একজন বাগানের মালি একটি চারাকে ফলবান বৃক্ষে পরিণত করতে চাইলে কেবল নির্দেশনা দিলেই হয় না; বরং সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। ঠিক তেমনি মানুষের আত্মিক জীবনও আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচর্যার দাবি রাখে। এই পরিচর্যাই হলো আত্ম-পর্যবেক্ষণ।

আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.) আরও বলেন, ধর্মই মানুষের প্রকৃত বিকাশের পথ। ধর্ম হলো সরল পথ (সিরাতুল মুস্তাকিম), আল্লাহর পথ এবং আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার সুনির্দিষ্ট দিশা। যে ব্যক্তি এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়, সে আসলে নিজের ওপরই জুলুম করে।

এই প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:

 وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, সে নিঃসন্দেহে নিজের ওপর জুলুম করে।” অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা মানে কেবল শরয়ী বিধান ভঙ্গ করা নয়; বরং এটি মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ, মানবীয় পরিপূর্ণতা এবং আল্লাহর দিকে অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করে দেয়।

আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, নিজের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি ছাড়া আত্ম-জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখা, কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী বাহ্যিক ও অন্তঃস্থ জীবন পরিচালনা করা এবং আল্লাহর সীমার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখাই মানুষের আত্মিক উন্নয়ন ও আল্লাহমুখী পরিপূর্ণতার একমাত্র পথ।

সূত্র: রিসালায়ে  ‘ইন্নাহুল হক্ক’ (اِنَّهُ الْحَقّ), পৃষ্ঠা ১৬১
আল্লামা হাসানজাদেহ আমুলি (রহ.)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha