শনিবার ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৯:০৫
পাকিস্তান–মার্কিন সম্পর্ক: প্রয়োজন শেষে ‘টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলা’ হয়েছে

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অভিযোগ করেছেন যে, কৌশলগত স্বার্থে ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে শোষণ করেছে এবং লক্ষ্য পূরণ হলে “টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলেছে”। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি, এলিট শ্রেণির ভূমিকা এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টিতে নিজের মতামত তুলে ধরছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি গভেষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইত্তেফাকের এ সংবাদ প্রতিবেদন সংক্রান্ত মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খানের মন্তব্যটি তুলে ধরছি:

সত্যিই এটা পাকিস্তানের জন্য খুবই চরম লজ্জাকর ও অবমাননাকর। তাই দেশটি মাযুরা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)-এর প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান-এর মতো স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম থাকার নীতি অবলম্বন করতে পারে।

মাযুরার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) তবিয়তই (প্রকৃতি ও স্বরূপ) হচ্ছে ঠিক এটাই—অর্থাৎ ব্যবহার ও শোষণের পর টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেওয়া। আর ঠিক এই কাজটাই মাযুরা তার তথাকথিত মিত্র পাকিস্তানের সঙ্গেও করেছে। মাযুরার কথা বা আদেশ-নিষেধ শুনেই তো সাবেক মাযুরা-ঘেঁষা পাকিস্তানি সরকারসমূহ আফগানিস্তান-সংক্রান্ত যুদ্ধে দুইবার জড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশটি অভ্যন্তরীণভাবেই চরম সন্ত্রাসবাদ সমস্যায় কবলিত হয়ে গেছে, যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি।

পাকিস্তান–মার্কিন সম্পর্ক: প্রয়োজন শেষে ‘টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলা’ হয়েছে

এই তো গত শুক্রবারেও পাকিস্তানের এক শিয়া মসজিদে তাকফিরি দায়েশের আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে বহু পাকিস্তানি শিয়া মুসলমান হতাহত হয়েছেন। সুতরাং পাকিস্তান তো নিজেই মাযুরা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)-এর সৃষ্ট সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসের শিকার! আর এই সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহ—আল-কায়েদা ও তালেবান—খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি বলে সমালোচকেরা দাবি করেন; আর এসব সংগঠন তৈরিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আইএসআই মাযুরাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।

কাজেই এখন পাকিস্তান নিজেই সেই সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে অহরহ। তাহলে আর কতকাল পাকিস্তানি এলিট শ্রেণি ও শাসকচক্র মাযুরার প্রভাবাধীন থাকবে? মাযুরার আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারকে রুখে দাঁড়াতে হবে। পাকিস্তানের উচিত মাযুরার দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করা।

কিন্তু মাযুরা'র (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে এবং মাযুরার পদসেবা ও পদলেহন করলে ব্যবহৃত ও শোষিত হওয়ার পর—অর্থাৎ কাজ শেষ হয়ে গেলে—পাকিস্তানকে টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলবেই। পাকিস্তানের আত্মমর্যাদাবোধ থাকতে হবে এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের উচিত উল্টো মাযুরাকেই টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলা। এটা কি করবে বা করেছে পাকিস্তানের পাশ্চাত্য ও মার্কিনপন্থী এলিট শ্রেণি ও শাসকচক্র—যাদের অন্তর্ভুক্ত স্বয়ং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও? এটা না করার দরুন খোদ মাযুরাই পাকিস্তানকে শোষণ ও ব্যবহারের পর ময়লা-আবর্জনার ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে—যা খাজা আসিফ নিজেই স্বীকার করেছেন ও বলেছেন। সত্যিই এটা কত বড় অপমান ও লজ্জা পাকিস্তানের জন্য!

বিধর্মী ইহুদি-খ্রিস্টানরা কখনোই পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশকে নিজেদের মিত্র ও আপন বলে গণ্য করে না—এমন ধারণাও এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানকে ইরানের মতো সৎ সাহস দেখাতে ও সংগ্রাম করে যেতে হবে মাযুরার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উচিত ইরানের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকা, কাজ করা ও সহযোগিতা করা।

পাকিস্তানসহ গোটা মুসলিম বিশ্বের মূল সমস্যাটাই হলো পশ্চিমাপন্থী শিক্ষিত এলিট শ্রেণি ও শাসকচক্র। এরাই পাশ্চাত্য ও মাযুরার সঙ্গে সহযোগিতা করে মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম ও প্রশস্ত করে দিয়েছে ও দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এদের মাধ্যমেই পশ্চিমারা এখনও মুসলিম বিশ্বের সবকিছু শুষে নিচ্ছে এবং অন্যায়-অত্যাচার ও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। তাই মুসলিম দেশসমূহের এই পাশ্চাত্যপন্থী এলিট শ্রেণি ও শাসকচক্রকে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুশমন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের ভরাডুবি ও দুর্গতির জন্য মূলত পাশ্চাত্যপন্থী ও মাযুরা-ঘেঁষা পাকিস্তানি এলিট শ্রেণি ও শাসকচক্রই দায়ী। এ সব এলিট দিয়ে দেশ ও দশের প্রকৃত উন্নতি হবে না। দুর্নীতিপরায়ণ চোর-চোট্টা ও ক্ষমতালোভী এই এলিট চক্রের ক্ষতিকর প্রভাব ও দুর্নীতি থেকে গোটা মুসলিম উম্মাহর মুক্তি একান্ত বাঞ্ছনীয়।

মহান আল্লাহকে ত্যাগ করে পশ্চিমাদের—বিশেষ করে মাযুরার—ওপর নির্ভর করলে পাক এলিট ও শাসকচক্রের ঈমানের অবস্থা কেমন হবে? খাঁটি মুমিন কখনো ইসলামের শত্রুদের দ্বারা ব্যবহৃত হয় না। খাঁটি ঈমান থাকলে পাক এলিট ও শাসকচক্র অবশ্যই পাকিস্তানকে মাযুরা কর্তৃক শোষণের শিকার ও ব্যবহৃত হতে দিত না। আসলেই কি পাক এলিট ও শাসকচক্র ঈমানদার?

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান-এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সঠিক, খাঁটি ও নির্ভেজাল মুহাম্মদী ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তনই পাকিস্তানসহ সকল মুসলিম দেশের একান্ত কর্তব্য।

কৌশলগত সম্পর্ক, ভারত ইস্যু ও পাকিস্তানের নীতিগত পুনর্বিবেচনা
এতদ্‌প্রসঙ্গে জনৈক ব্যক্তি লিখেছেন: “মূল সমস্যা হলো ভারত। ভারত পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। ফলে পাকিস্তান কৌশলে আমেরিকা এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে।”

তার এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলা যায়—কৌশলগত সম্পর্ক রাখতে গিয়েই পাকিস্তান মাযুরা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)-এর ফাঁদে পড়ে গেছে এবং চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; যা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ-এর বক্তব্য থেকেও প্রতীয়মান হয়। “শোষণ ও ব্যবহারের পর টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলা”—এই কথার অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তান মাযুরার কাছ থেকে বাস্তবিক অর্থে তেমন কোনো সুফল পায়নি; বরং ক্ষতিরই শিকার হয়েছে।

অতএব প্রশ্ন ওঠে—মাযুরার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে পাকিস্তানের লাভ কী? এ সম্পর্ক কোনো উইন-উইন (লাভ-লাভ) সম্পর্ক নয়; বরং সমালোচকদের মতে এটি উইন-ডিফিট (লাভ-ক্ষতি) সম্পর্ক—যেখানে লাভের পক্ষ মাযুরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ পাকিস্তান। খাজা আসিফের বক্তব্য থেকেও এমন ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভারতের মোকাবিলায় টিকে থাকতে পাকিস্তান চীন ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে—এমন মতও প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছরের স্বল্পস্থায়ী ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময় চীন ও ইরান পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে বেশি সহায়ক ছিল—এমন দাবি করা হয়। বিশেষ করে ইরান শান্তিপূর্ণ উপায়ে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইতিবাচক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল, যা পাকিস্তান ও ভারত—উভয়ের জন্যই কল্যাণকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

যা হোক, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নীতিতে সংশোধন ও ইসলাহ (সংস্কার) আনা প্রয়োজন—এমন আহ্বানও জানানো হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, চীনের মোকাবিলায় কিংবা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে মাযুরা কখনোই ১৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট ভারতকে সহজে ছাড়বে না, পাকিস্তান যতই ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন করুক না কেন।

অতএব এখন সময় এসেছে পাকিস্তানের সার্বিক জাতীয় নীতি, কৌশল ও স্ট্র্যাটেজিতে আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন আনার। পাকিস্তান পার্লামেন্টে খাজা আসিফের বক্তব্যেও যে ভীতি ও আশঙ্কার সুর শোনা গেছে—তা এই প্রয়োজনীয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।

আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমাদের—বিশেষ করে মাযুরার—সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ভারত এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত না। সমালোচকদের মতে, ভবিষ্যতে চীন ও মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রয়োজনে ভারতকে ব্যবহার করার লক্ষ্যেই মাযুরা তাকে সমর্থন দিচ্ছে। তাই তাদের দৃষ্টিতে ভারতের চেয়েও মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় হুমকি হলো মাযুরা নিজেই।

এই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যায়োনিস্ট ও নাসরানী (খ্রিষ্টান) শক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ভারতের হিন্দুত্ববাদ—উভয়কেই তারা কুফর, শিরক ও বস্তুবাদের চরম রূপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের মতে, এ দুই শক্তি একীভূত হয়ে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বিস্ময়ের কিছু নেই। এমন পরিস্থিতিতে মাযুরা ও ভারত যৌথভাবে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সুতরাং, এ মতানুসারে পাকিস্তানকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে মাযুরার ব্যাপারে এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha