সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০০:৩৪
বেলায়াতে ফকিহর দলিল (নাকলি বা দালিলিক প্রমাণ)

ইসলামী আইনবিদের নেতৃত্ব বা বেলায়েতে ফকীহ প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাকলি দলিল (কুরআন ও হাদিস-ভিত্তিক প্রমাণ) হলো ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর একটি পত্র (তাওকীʿ)। এই পত্রে ইমাম মাহদী (আ.ফা.) শিয়াদেরকে গায়েবাতের যুগে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়ে ‘আমাদের হাদিসের বর্ণনাকারীদের’ কাছে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নিচে এই দলিল ও তার ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাহদাভিয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনা “আদর্শ সমাজের দিকে” শিরোনামে ইমাম মাহদী (আ.)-সংক্রান্ত জ্ঞান ও শিক্ষা প্রচারের লক্ষ্যে পরিবেশিত হচ্ছে।

ইমামে যামানা (আ.)-এর তাওকীʿ (১)
মহান শিয়া আলেম শাইখ সাদুক (রহ.) তার 'কামালুদ্দ্বীন ওয়া তামামুন নে'মাত' গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইয়াকুবের ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর কাছে লিখিত পত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। সেই পত্রে ইমামের দরবারে কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল।

ইমাম যামানা (আ.) উত্তরে বলেছেন,

وَ أَمَّا الْحَوَادِثُ الْوَاقِعَةُ فَارْجِعُوا فِیهَا إِلَی رُوَاةِ حَدِیثِنَا فَإِنَّهُمْ حُجَّتِی عَلَیْکُمْ وَ أَنَا حُجَّةُ اللَّهِ عَلَیْهِمْ

আর ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহে আমাদের হাদিসের বর্ণনাকারীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করো; নিঃসন্দেহে তারা তোমাদের ওপর আমার পক্ষ থেকে প্রমাণ (হুজ্জাত) এবং আমি তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ।”

(কামালুদ্দ্বীন ওয়া তামামুন নে'মাত, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮৪)

তাওকীʿ-এর প্রথম অংশে ইমাম (আ.ফা.) নির্দেশ দিয়েছেন যে, গায়েবাতের যুগে শিয়াগণ আহলে বাইত (আ.)-এর হাদিস বর্ণনাকারীদের কাছে ফিরে যাবে এবং সংঘটিত ও উদ্ভূত বিষয়গুলোতে তাদের কাছ থেকে নিজেদের কর্তব্য জানবে।

এ প্রসঙ্গে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন যে, 'রুওয়াতে হাদিসনা' (আমাদের হাদিসের বর্ণনাকারী) বলে কাদের বোঝানো হয়েছে এবং 'হাওয়াদেসে ওয়াকেʿআ' (ঘটে যাওয়া ঘটনা) বলতে কী অর্থ করা হয়েছে।

'হাওয়াদেস' শব্দটি 'হাদেসা'র বহুবচন। ইমাম বলেছেন, সংঘটিত হওয়া ঘটনাসমূহে হাদিস বর্ণনাকারীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে। সুতরাং স্পষ্ট হয় যে, 'ঘটনা' বলতে সেই সকল বিষয় উদ্দেশ্য যা মুসলমানদের দ্বীন ও ধর্মীয়তার সাথে সম্পর্কিত এবং হাদিস বর্ণনাকারীদের সেই সকল বিষয়ে মুমিনদের কর্তব্য স্পষ্ট করে দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, উদ্দেশ্য কি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিষয় যা রেসালে আমালিয়ায় বিবৃত হয়েছে, নাকি সামাজিক বিষয় যেমন কাফেরদের সাথে জিহাদ, বিদেশীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা, বিদেশী সরকারগুলোর সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ইত্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত?

ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর 'ঘটে যাওয়া ঘটনা' বলতে শুধু নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয় উদ্দেশ্য—এটা খুবই দূরবর্তী সম্ভাবনা; কারণ স্বয়ং ইমামদের (আ.)-এর সময়েও ধর্মীয় পণ্ডিতদের কাছে প্রত্যাবর্তন এবং তাদের কাছে এসব বিষয়ে জানা প্রচলিত ছিল। দূরবর্তী স্থান বা ইমামদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে শিয়াগণ ইমামদের প্রতিনিধি ও নায়েবদের কাছে প্রত্যাবর্তন করতেন।

মূলত এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, যখন ইমামের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়—ইমাম উপস্থিত ও বিদ্যমান থাকুন অথবা গায়েবাতেই থাকুন না কেন—তখন কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে যারা জ্ঞাত, সেই ধর্মীয় আলেমদের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

অতএব, 'ঘটে যাওয়া ঘটনা' বলতে মুসলিমদের সামাজিক বিষয়সমূহ উদ্দেশ্য এবং এই অর্থ 'ঘটনা' শব্দটির আভিধানিক অর্থের সাথেও সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ও সংগত।

ইমামদের হাদিসের বর্ণনাকারী কারা?
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর তাওকীʿ অনুসারে, ইমামের শিয়াগণ তাঁর গায়েবাতের যুগে উদ্ভূত সমস্যায় হাদিস বর্ণনাকারীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবেন। এটা পরিষ্কার যে, ইমামদের (আ.)-এর বাণী থেকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্তব্য সম্পর্কিত বিধান বুঝতে ইসলামী ও ধর্মীয় বিজ্ঞানে অত্যন্ত উচ্চস্তরের বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন। ইমামদের হাদিস থেকে শরয়ী বিধান আহরণ অত্যন্ত জটিল কাজ। এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে শিয়াগণ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রকৃত আলেম ও ইসলাম বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রত্যাবর্তন করতেন।

অতএব, 'হাদিসের বর্ণনাকারী' বলে শুধু হাদিস বর্ণনাকারী ব্যক্তি উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য এমন ব্যক্তি যিনি প্রথমত, হাদিসের সূত্রসমূহ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন এবং নির্ভরযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য নয়—এরূপ হাদিসের মধ্যে প্রভেদ করতে সক্ষম; দ্বিতীয়ত, ইমামদের বাণীর সকল দিক এবং তাদের কথা থেকে শরঈ বিধান আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত এবং ইমামদের কথা সঠিকভাবে বুঝার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি ও উপকরণ অর্জন করেছেন।

সমস্ত মুসলিম ও জ্ঞানী-গুণীর স্বীকৃতি অনুসারে, এমন যোগ্য ব্যক্তি কেবলমাত্র ধর্মীয় ফকীহ ও মুজতাহিদগণই হন। তারাই সকল ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়ে কুরআন ও ইমামদের বাণী থেকে আল্লাহর বিধান আহরণ করেন এবং সকল বিষয়ের বিধান শিয়াদের কাছে পৌঁছে দেন।

উপরোক্ত ধারণা হাদিসের পরবর্তী অংশ "فانهم حجتی علیکم" (তারা তোমাদের ওপর আমার পক্ষ থেকে হুজ্জাত) এর সাথেও সংগত। কারণ, 'হুজ্জাত' বা প্রমাণ হওয়া সেই সকল বিষয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ যেখানে ওই ব্যক্তির অভিমত ও ইজতিহাদ মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, তখনই এই 'হাদিস বর্ণনাকারী' অপরের জন্য 'প্রমাণ' হবেন যখন ইমামের বাণী থেকে তার ইজতিহাদ ও ধারণা অপরের জন্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে, যদি শুধু ইমামের বাণীর উদ্ধৃতি দেয়াই উদ্দেশ্য হতো, তবে তিনি বলতেন না যে, তারাই স্বয়ং তোমাদের ওপর আমার পক্ষ থেকে প্রমাণ।

এক্ষেত্রে শিয়া মাযহাবের বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ ফকীহ, শাইখ আনসারী (রহ.)-এর বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন,

“ইমামের বাক্যের জাহির (বাহ্যিক অর্থ) থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, 'ঘটনাসমূহ' বলতে ঐ সকল বিষয় উদ্দেশ্য যা আকল, শরিয়ত ও প্রচলিত প্রজ্ঞার বিচারে কোনো নেতা ও [সম্প্রদায়ের নেতা]-এর কাছে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক। আর 'ঘটনা' শুধু শরয়ী মাসআলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ—এ ধারণা অত্যন্ত দূরবর্তী।”

(মাকাসেবে মুহাররামা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৫৪)

এই আলোচনা চলবে...

উৎস: ‘নেগিনে অফারিনেশ’ থেকে (সামান্য সম্পাদনাসহ) গৃহীত।

__________________________________________________

পাদটীকা: ১. তাওকীʿ একটি পরিভাষা যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমাম মাহদী (আ.)-এর পত্রসমূহের জন্য ব্যবহৃত হয়। সেই পত্রসমূহে শিয়াদের প্রশ্নের উত্তর লেখা হতো এবং চার বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছানো হতো।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha