হাওজা নিউজ এজেন্সি: গত ২২ বাহমান (১১ ফেব্রুয়ারি) ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিজয়বার্ষিকীর সমাবেশে তথাকথিত 'বাল' মূর্তিতে আগুন দেওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
কেউ কেউ একে নিছক আবেগপ্রবণ কাজ বলে সমালোচনা করেন, আবার অনেকে এর গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের কথা বলেন।
তবে এই ঘটনা নিয়ে নানা সন্দেহ দেখা দেয়—এটি কি শয়তানের শক্তি বৃদ্ধি করার শামিল? নাকি কোনো ধর্মবিরোধী ষড়যন্ত্র? এই প্রেক্ষাপটে ধর্মসম্প্রদায় ও নব্য-আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম মেহদি কিয়াসি কারগার মোকাদ্দামের সাক্ষাৎকারের সারাংশ তুলে ধরছি:
'বাল' কী এবং কেন এটি পোড়ানো হয়?
'বাল' হলো সেমিটিক ও কেনানীয় ধর্মমতের অন্যতম প্রাচীন দেবতা। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে সিরিয়া, ফিনিশিয়া ও প্রাচীন ফিলিস্তিন অঞ্চলে এর পূজা হতো। ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও ওল্ড টেস্টামেন্টে বালকে সহিংসতা, আধিপত্য এবং মানব বলির সঙ্গে জড়িত এক শক্তির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাল ও তার পরবর্তী রূপ মোলোক শিশু পোড়ানো ও মানুষ বলি দেওয়ার জন্য কুখ্যাত ছিল। এই বৈশিষ্ট্যই বালকে 'নৈতিকতাশূন্য নিরঙ্কুশ ক্ষমতার' প্রতীকে পরিণত করে—এমন এক শাসনের প্রতীক যা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিবেক, ধর্ম ও মানবতাকে বিসর্জন দেয়।

২২ বাহমানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সর্বোচ্চ নেতার আহ্বানে ইরানি জনগণের ঐতিহাসিক উপস্থিতির মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শন। কিন্তু এই উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে 'বাল' প্রতীকটির ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট বার্তা বহন করে। এটি বর্তমান বিশ্বের আধিপত্য ব্যবস্থার ভিতরের আসল চেহারা—বলিদান, নিষ্ঠুরতা, বিবেকহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার ধারা—কে মূর্ত করে তোলার একটি প্রচেষ্টা।
'বাল' কোনো মূর্তি নয়, বরং একটি কলুষিত চিন্তাধারা
অনেকে মনে করেন বাল, মোলোক বা সামেরির বাছুর প্রাচীন ইতিহাসের বিষয়, আধুনিক রাজনীতির সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতে, ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়নে আমরা 'ধর্মীয় নিদর্শনের ধারাবাহিকতা' দেখতে পাই। বাল, মোলোক বা রেম্ফান—এগুলো একই সত্যের বিভিন্ন নাম: যে সত্যে শয়তানি শক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মানবতার সীমা লঙ্ঘন করে। প্রাচীন বিশ্বে এই সত্য শিশু বলি ও মানুষ পোড়ানোর মাধ্যমে প্রকাশ পেত; আজ তা যৌন দাসত্বের নেটওয়ার্ক, ব্ল্যাকমেইল, নৈতিকতা ধ্বংস এবং মানুষকে পণ্যে পরিণত করার মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। রূপ বদলালেও মূল চরিত্র অপরিবর্তিত।
জেফরি এপস্টাইনের ঘটনা এই ধারারই একটি নগ্ন উদাহরণ। নথি থেকে জানা যায়, এপস্টাইনের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নাম ছিল 'বাল'—যা নিছক আকস্মিক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা।

কেউ কেউ একে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু বিশেষজ্ঞের ভাষায়, বিশ্লেষণ আর কল্পনার পার্থক্য হলো প্রমাণের ওপর ভিত্তি করা। ধর্মীয় গ্রন্থ, ঐতিহাসিক দলিল ও বাস্তব প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত কথা কখনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও ক্ষমতার সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়নে ক্ষমতালোভীদের ধর্মীয় রীতি ও প্রতীক অনুসন্ধান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাল পোড়ানোর মানে শয়তানের দুর্বলতা, শক্তি নয়
সবচেয়ে আলোচিত সন্দেহটি হলো—এই প্রতীক পোড়ানো কি নিজেই শয়তানি রীতি পালন ও তার শক্তি মুক্তি দেওয়া নয়? বিশেষজ্ঞের জবাব একেবারে স্পষ্ট: না।
প্রথমত, বাল-এর পূজার নির্দিষ্ট রীতি ছিল—ধাতব মূর্তি গরম করে তার ভেতর মানুষ বলি দেওয়া। তাই এই প্রতীক ধ্বংস করার যে কোনো উপায়, এমনকি আগুনে পোড়ানোও, সেই পূজার পুরোপুরি বিপরীত।
দ্বিতীয়ত, পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বোয়া-হার ৯৭ নম্বর আয়াতে হযরত মুসা (আ.)-এর কাজ স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে—তিনি সামেরির বাছুরকে পুড়িয়ে ছাই করে দেন এবং তা ধ্বংস করেন। এটি শিরকের মূর্তির মোকাবিলায় ঐশী নির্দেশনা।
তৃতীয়ত, যদি এটি শয়তানি রীতি হতো, তাহলে এই কাজের সময় যে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছিল, 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দেওয়া হয়েছিল এবং কালেমা পাঠ করা হয়েছিল—তা অর্থহীন হয়ে যেত। অথচ আল্লাহর নামই সব শয়তানি রীতির বিনাশকারী।
অতএব, 'বাল পুড়িয়ে শয়তানের শক্তি বৃদ্ধি' করার ধারণাটি সঠিক নয়।
কুসংস্কার ও ভয় না ছড়ানোর গুরুত্ব
শয়তানের শক্তি, প্রতীক ও কুসংস্কার নিয়ে বেশি আলোচনা সমাজে ভয় ও কুসংস্কার ছড়াতে পারে—এই উদ্বেগ যথার্থ। শয়তানের বিষয়ে ভুল পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো তার শক্তিকে অতিরঞ্জিত করা এবং তাকে অজেয় রহস্যময় সত্তায় পরিণত করা।
কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, শয়তান সীমিত ক্ষমতার অধিকারী একটি প্রতারক সৃষ্টি, যা বিশ্বাস, বুদ্ধি ও মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে অসহায়।
কুসংস্কার শুরু হয় যখন আমরা অজ্ঞতাবশত বা আবেগের বশে শয়তানকে ধর্ম যা বলেছে তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা দিয়ে ফেলি। ধর্ম শয়তানকে চেনায় তাকে মোকাবিলা করার জন্য; কুসংস্কার শয়তানকে বড় করে দেখায় মানুষকে ছোট করে ফেলার জন্য। তাই বিকৃত প্রতীক ও রীতিনীতি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং তার পেছনে থাকা মানবতাবিরোধী চিন্তাকে উন্মুক্ত করা।
যে সমাজের তাওহিদে বিশ্বাস সুদৃঢ়, সে সমাজ যেমন সরলও হয় না, তেমনি আতঙ্কিতও হয় না। শয়তানের সবচেয়ে বড় পরাজয়—তাকে ভয় না পেয়ে বুদ্ধি, দৃঢ় বিশ্বাস ও সচেতনতার আলোয় তাকে পরাস্ত করা। ইসলামি বিপ্লব শুরু থেকেই এই নীতির ওপর জোর দিয়েছে।
গৌণ বিষয় যেন মূল বার্তাকে না ঢেকে দেয়
২২ বাহমানের মূল বার্তা ছিল ইরানি জনগণের নেতার চারপাশে একাত্ম হয়ে দাঁড়ানো। বিশ্বের আধিপত্য ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ইহুদিবাদ আসলে এই ঐক্যকেই ভয় পায়—কোনো প্রতীকী পদক্ষেপকে নয়। বিভেদ সৃষ্টি, নেতৃত্বকে দুর্বল দেখানোর প্রতিটি অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই শয়তানপূজারী মিথ্যা শক্তিগুলোরই খেলা ধরে।
একটি প্রতীক পোড়ানোর ঘটনাকে যদি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা হয়, তাহলে তা মূল বার্তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারে। শত্রুরা ঠিক এই সুযোগটাই খোঁজে—জনশক্তির বিশাল চিত্রটাকে একটি বিশেষ ঘটনায় সীমাবদ্ধ করে ফেলতে। তাই এই বিষয়ে গণমাধ্যমের সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। কারণ ঐক্যবদ্ধ জনতার উপস্থিতিই ছিল সেই দিনের মূল বার্তা, আর সেটি কখনোই ভুললে চলবে না।
আপনার কমেন্ট