হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পবিত্র রমজান মাস সমাগত। এটি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ মাস, যা আধ্যাত্মিক রূপান্তর এবং পারিবারিক ও সামাজিক সংহতি জোরদারের লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমী সময়।
আমাদের প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর যথার্থ বক্তব্য অনুযায়ী, সত্যিই সারা বছরে রমজান মাসের মতো ব্যতিক্রমী সুযোগ আর নেই। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “সারা বছর ধরে আল্লাহর দিকে আমাদের দীর্ঘ পথচলায় আমরা নফসের খেয়াল-খুশির সাথে লড়াই, পাপাচার এবং নিজেদের হাতে সৃষ্ট অন্ধকার পরিবেশের মতো সমস্যার সম্মুখীন হই। রমজান মাস পাপ থেকে তওবা করার এবং মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়।”
শ্রেষ্ঠ মাসে তাকওয়ার রত্ন অর্জন
মূলত এ মাসে রোজা রাখার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়ার রত্ন অর্জনের পথে প্রচেষ্টা চালানো। যেমন পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থাৎ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা: ১৮৩)
অবশ্যই কুরআন, হাদিস ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে অসংখ্য নির্দেশনা রয়েছে যা তাকওয়া গঠন ও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। যেমন ধর্মীয় সমাবেশ, মসজিদে উপস্থিতির মতো স্থানগত সুযোগ অথবা ঈদে গাদির, ঈদুল আযহা, মহররম-সফর, ফাতেমীয়া ইত্যাদি সময়গত সুযোগ। তবে রমজান মাসে মানুষের জন্য এমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় যা তাকে দয়াময় স্রষ্টার ইবাদতের পথে আরও নিবিড়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের পথ সুগম করে।
ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে আধ্যাত্মিকতার মাত্রা বৃদ্ধির সুযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক গবেষক ড. তাহেরাহ হোমিজ বলেন, রমজান মাস জীবনপথ পুনর্বিবেচনা এবং মানবিক সম্পর্ক মজবুত করার এক অমূল্য সুযোগ। তিনি আরও বলেন, রমজানের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো এ মাসে বিরাজমান আধ্যাত্মিক শান্তি।
ইসলামী শিক্ষায় আমরা পাই, এ মাসে নেতিবাচক কুমন্ত্রণার পরিবেশ হ্রাস পায়। এই বিষয়টি মানুষের জন্য এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রশান্তি সৃষ্টি করে। এমনকি কিছু পরিসংখ্যান অনুসারে, এ সময় অপরাধ ও সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে আধ্যাত্মিকতার মাত্রা বৃদ্ধির জন্য রমজান মাস অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও উত্তম সুযোগ বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আধ্যাত্মিক পরিবেশ যেন রমজানের এক মাসের বাইরেও আমাদের অন্তরে শিকড় গাড়ে এবং বছরের অন্যান্য মাসেও তা অব্যাহত থাকে। একটি পরিচিত উক্তি আছে যে, রোজাদারের ঘুমও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এই বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে এই বরকতময় মাসে দৈনন্দিন কাজকর্মের মর্যাদা কতটা বৃদ্ধি পায়।
তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আত্মার সকল কলুষতা থেকে পবিত্রতা
সাংস্কৃতিক কর্মী ও হাওজায়ে ইলমিয়ার গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম হাবিব বাবায়ীর মতে, রমজান মাস আত্মাকে বিশুদ্ধ করার এবং বার্ষিক আত্মপরিশোধনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পরীক্ষা। বছরের অন্যান্য মাসে রমজানের মতো এক মাস ধরে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার দরজা তাঁর বান্দাদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না।
তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং অন্যান্য মাসুম ইমাম (আ.)-এর দীপ্তিময় নির্দেশনা অনুযায়ী, যদি কোনো বান্দা এই আত্মপরিশোধন কর্মসূচির আওতায় আসে, তবে মহান আল্লাহ তাকে নবজাতকের ন্যায় পবিত্র করে দেন। অর্থাৎ তার আত্মার সকল কলুষতা, পাপ ও গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
এভাবে তার অন্তরের সমস্ত কালিমা দূরীভূত হয়ে আত্মা নির্মল হয় এবং তার সৎকর্মসমূহ উজ্জ্বল ও মহীয়ান রূপ লাভ করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম বাবায়ী বলেন, কোনো কোন বড় আলেমের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রিয় ও অতুলনীয় মাসে আমাদের উচিত উচ্চ শিখরে পৌঁছানোর কথা ভাবা। শুধু আত্মিক পরিশোধন নয়, বরং উন্নতি ও পরিপূর্ণতাও গুরুত্বপূর্ণ। আর ধন্য সেই বান্দারা, যারা এই সোনালি সুযোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আত্মগঠনের পথে প্রচেষ্টা চালান এবং আল্লাহর তাকওয়ার বিশুদ্ধ রত্ন লাভ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দীপ্তিময় বাণী
তিনি বলেন, মহানবী (সা.) এক দীপ্তিময় হাদিসে বলেছেন,
> الصِّيَامَ ابْتِلَاءٌ لِإِخْلَاصِ الْخَلْقِ
অর্থাৎ, রোজা এক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে বান্দার একনিষ্ঠতা যাচাই করা হয়।
এটি আমাদের বড়দের সেই উক্তিরই প্রতিধ্বনি যে, কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়া মানুষ কলুষতা থেকে মুক্তি পেতে পারে না এবং তার অন্তর নির্মল ও পরিশুদ্ধ হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, বাস্তবিকই যদি জীবনের ধারা একইভাবে এগিয়ে চলে—মানুষ যেমন সারা বছর খায়, পান করে এবং জীবনযাপন করে, রমজানেও যদি তাই করে, তাহলে কিছুই বদলায় না। শারীরিক অসুস্থতার সময় খাদ্য পরিহার রোগমুক্তির অন্যতম পথ। যেমন কেউ অসুস্থ হলে তাকে বলা হয় কোন খাবার খেতে হবে আর কোনটি বর্জন করতে হবে, ওষুধ সেবন করতে হয়। রমজানে যেসব বিষয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা আত্মিক ও শারীরিক পরিশুদ্ধির জন্য, আন্তরিকতা ও বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য। আর যদি আমরা এ পথে আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করি এবং কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর নির্দেশনা মেনে চলি, তবে প্রকৃত কল্যাণ ও শান্তি লাভ করব।
এই সাংস্কৃতিক কর্মী নিজের বক্তব্যের শেষে বলেন, এ ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ইমাম খোমেনী (রহ.) রমজান উপলক্ষে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “এই সম্মানিত মাসে যখন আপনাকে আল্লাহর মেহমানদারিতে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, যদি আপনি মহান সত্য আল্লাহর সাথে সঠিক পরিচয় (মারেফাত) লাভ না করেন বা আপনার মারেফাত বৃদ্ধি না পায়, তাহলে জেনে রাখুন আপনি আল্লাহর মেহমানদানায় সঠিকভাবে প্রবেশ করতে পারেননি এবং মেহমানদারির হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারেননি।”
প্রতিবেদন: সাইয়্যেদ মোহাম্মদ মাহদী মুসাভী
আপনার কমেন্ট