বুধবার ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৩:০৪
ইসলামী জ্ঞানের অঙ্গনে স্মার্ট প্রযুক্তির প্রবেশের ছয়টি মূল অক্ষ

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি ইসলামী জ্ঞানের স্মার্ট ও জ্ঞানভিত্তিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেন: যে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন, তার একটি হলো কগনিটিভ সায়েন্স ও স্মার্ট প্রযুক্তির পরিবর্তনসমূহ। আজ এই প্রযুক্তিগুলো আর কেবল যন্ত্র নয়; বরং চিন্তা ও মতের অঙ্গনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, যা ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। আমাদের দ্রুত নিজেদের এসব পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে তা থেকে উপকার নিতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আ’রাফি, হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক, “ইলম, সভ্যতা ও আধ্যাত্মিকতা” ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত ইসলামী জ্ঞানের স্মার্ট ও জ্ঞানভিত্তিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে—যা কোমের জামে‘আতুল আল-বাইত (আ.) সম্মেলন হলে অনুষ্ঠিত হয়—সাম্প্রতিক কগনিটিভ সায়েন্স ও আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ধারার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: যে ধারণার আংশিক ফল আজ উন্মোচিত হচ্ছে, তা প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে শুরু হওয়া একটি বৃহত্তর চিন্তার অংশ। এই পরিকল্পনা গঠিত হয়েছিল জ্ঞানের সীমান্তে এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, বিশেষত ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপনের লক্ষ্যে।

কগনিটিভ সায়েন্সের পরিবর্তন

তিনি বলেন: এই আন্দোলন প্রথমে জামে‘আতুল মুস্তাফা (সা.) এবং বিভিন্ন হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে শুরু হলেও, পূর্বানুমিত গতিতে এগোনো সম্ভব হয়নি। তবে ধাপে ধাপে লক্ষ্যপানে অগ্রসর হয়েছি এবং এখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সহযোগিতা প্রত্যক্ষ করছি।

গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকীহ সদস্য হিসেবে তিনি কগনিটিভ সায়েন্সের আসন্ন পরিবর্তন প্রসঙ্গে বলেন: এর কিছু অংশ আজ দৃশ্যমান হয়েছে এবং সামনে বিশাল পরিবর্তন আসছে, যা নিঃসন্দেহে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাওজা বিষয়ক ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলবে। এসব পরিবর্তন যেমন এক বিশাল সুযোগ, তেমনি সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা হুমকিও হতে পারে।

তিনি আরও যোগ করেন: একদিকে এই পরিবর্তন ইসলামী জ্ঞান ও মারিফাতের ক্ষেত্রে বিশাল রূপান্তরের ঢেউ আনতে পারে—যা মুসলিম সমাজের জন্য বড় সুযোগ। অন্যদিকে, সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে তা বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।


আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তনে ইসলামী জ্ঞানের প্রভাব
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি ইসলামী জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির পারস্পরিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন: যেমন স্মার্ট প্রযুক্তি ইসলামী জ্ঞানে প্রভাব ফেলছে, তেমনি ইসলামী জ্ঞান, যুক্তি ও ইসলামী ডিসকোর্সও কগনিটিভ সায়েন্স ও স্মার্ট প্রযুক্তির বিকাশে প্রভাব রাখতে সক্ষম—এ বিষয়টিও আমাদের বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন: আমাদের লক্ষ্য বিশ্বপরিসরে কগনিটিভ সায়েন্স ও স্মার্ট প্রযুক্তিতে সক্রিয় হওয়া, তবে তা অবশ্যই ইসলামী চিন্তা, আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শ এবং ইসলামী বিপ্লবের যুক্তির আলোকে হতে হবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিসরে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আশা করা হচ্ছে।

ইসলামী জ্ঞান বিকাশে স্মার্ট প্রযুক্তির কার্যকর ভূমিকা

কোম শহরের ইসলামী জ্ঞানের অগ্রসর অবস্থান এবং স্মার্ট প্রযুক্তির কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: নূর গবেষণা কেন্দ্র—যা সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত—বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা ক্ষেত্রে বড় সাফল্য অর্জন করেছে এবং এখনও বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

তিনি বলেন: এই বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসলামী গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়া এবং ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় ডিসকোর্সভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তোলা। গত ২০ বছরে কিছু বিলম্ব থাকলেও, আগামী বছরের মধ্যে এই বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের প্রথম কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইসলামী জ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল অক্ষসমূহ

তিনি স্মার্ট প্রযুক্তির ইসলামী জ্ঞানে প্রবেশ প্রসঙ্গে ছয়টি মূল অক্ষ তুলে ধরেন:
১. স্মার্ট প্রযুক্তি ও ইসলামের প্রাথমিক উৎসসমূহ:
পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর মতো মূল উৎস বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ইসলামী জ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

২. স্মার্ট প্রযুক্তি ও গৌণ উৎসসমূহ:
প্রাথমিক উৎসের ভিত্তিতে রচিত হাজারো দার্শনিক, কালাম, হাদিস, তাফসির ও ফিকহ বিষয়ক গ্রন্থ স্মার্ট প্রযুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

৩. স্মার্ট প্রযুক্তি ও ইসলামী শাস্ত্রসমূহ:
দর্শন, কালাম, তাফসির ও ফিকহের অগ্রগতিতে স্মার্ট প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং গবেষণাকে অধিক আধুনিক ও কার্যকর করতে পারে।

৪. মানবজীবনে ইসলামী চিন্তার বাস্তবায়ন:
ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইসলামী চিন্তার প্রয়োগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্মার্ট প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন মডেল উপস্থাপন করতে পারে।

৫. ইরান ও বিশ্বে ইসলামী ডিসকোর্সের প্রসার:
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞান প্রচার, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদার করা সম্ভব।

৬. ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইসলামী ইতিহাস ও সভ্যতা সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি উপসংহারে বলেন: এসব অক্ষ বাস্তবায়নে গবেষক ও আলেমদের সম্মিলিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। স্মার্ট প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করতে হবে এবং সমকালীন মানবজাতিকে ইসলামী মারিফাত আরও গভীরভাবে অনুধাবনে সহায়তা করতে হবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha