শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৭:৪৫
রমজানের বরকত লাভের শর্ত: আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ব্যবহারিক আনুগত্য

ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও নৈতিক শিক্ষার উস্তাদ আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসের বরকতসমূহ থেকে পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়া কেবল খাওয়া-পানাহার ত্যাগ করার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং রোজার প্রকৃত শর্তসমূহ পালন ও আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ব্যবহারিক আনুগত্য এই মাসের আমলসমূহ কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তেহরানের চিদর এলাকায় অবস্থিত হযরত কায়েম (আ.) হাওজায় ইলমিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া, পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে আয়োজিত প্রথম বক্তৃতানুষ্ঠানে মাসটি শুরুর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন: এই মাসের বরকতসমূহ লাভ করা নির্ভর করে সঠিক ব্যবহার, রোজার শর্তাবলি পরিপূর্ণ পালন এবং আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ব্যবহারিক অনুগত্যের ওপর।

তিনি আরও বলেন, রমজান নিজের মধ্যে বরকতময়; কিন্তু মানুষের জন্য এর বরকতময় হওয়া নির্ভর করে এর সদ্ব্যবহারের ওপর। যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা বরকতময় হয়; নতুবা শুধু 'বরকতময়' নামে অভিহিত করাই যথেষ্ট নয়।

এই ধর্মীয় আলেম পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলি তুলে ধরে বলেন:

• ৬ই রমজান: মামুন আব্বাসি ইমাম রেজা (আ.)-এর যুগ্ম-খিলাফতের জন্য জনগণের কাছে বাইআত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন।
• ৭ই রমজান: হযরত আবু তালিব (আ.)-এর ইন্তেকাল, যিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর চাচা ও অন্যতম রক্ষক।
• ১০ই রমজান: হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ইন্তেকাল, যিনি ইসলামি উম্মাহর ওপর বিরাট হক রাখেন। এই দুজনের ইন্তেকালের বছরটি 'আমুল হুজন' (দুঃখের বর্ষ) নামে পরিচিত, কারণ নবী করিম (সা.)-এর দুই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক একই বছরে ইন্তেকাল করেন।
• ১৫ই রমজান: ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর পবিত্র জন্মদিন।
• ১৭ই রমজান: বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
• ১৯শে রমজান: আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) ইবনে মুলজিমের আঘাতে আহত হন।
• ২০শে রমজান: মক্কা বিজয় এবং মহানবী (সা.)-এর কাঁধে উঠে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর মূর্তি ভাঙার ঐতিহাসিক ঘটনা।
• ২১শে রমজান: আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর শাহাদাত বরণ।
• ২২শে রমজান: হযরত ঈসা (আ.)-কে উঠিয়ে নেওয়া এবং হযরত মুসা (আ.) ও ইউশা (আ.)-এর ইন্তেকাল।
• ২৩শে রমজান: পবিত্র কুরআন নাজিলের রাত (লাইলাতুল কদর)।
• ২৬শে রমজান: হুনাইন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া জোর দিয়ে বলেন যে, রমজান আল্লাহরই একটি নাম। একে শুধু 'মাহে রমজান' (রমজান মাস) না বলে 'শাহরুল্লাহ' (আল্লাহর মাস) বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব বরকত কুরআনে নাজিল হয়েছে এবং এই কুরআনই নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম লাইলাতুল কদরও এই মাসেই নিহিত।

এই আলেম রমজান মাসকে স্বাগত জানিয়ে মহানবী (সা.)-এর বিখ্যাত খুতবার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:শাহরুন দু'ইতুম ফিহি ইলা জিয়াফাতিল্লাহ" (এমন মাস যাতে তোমাদের আল্লাহর মেহমানদারিতে আহ্বান করা হয়েছে)। তিনি আরও বলেন, রোজার বিশেষত্ব হলো এটি সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত এবং এটি জাহান্নামের আগুন ও দৈহিক-মানসিক বিপর্যয় থেকে ঢালস্বরূপ। এমনকি রোজাদারের ঘুমও যদি ইবাদতের শক্তি জোগাতে সহায়তা করে এবং তা হয় নিষ্ঠার সাথে, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

রোজা কবুলের শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন রোজা রাখো, তখন কান, চোখ, জিহ্বা ও সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও রোজাদার হতে হবে। রোজা শুধু খাওয়া-পানাহার ত্যাগের নাম নয়। তিনি নবী করিম (সা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে রোজা রেখে নিজ দাসীকে গালমন্দ করছিল এমন এক নারীকে নবী (সা.) বলেছিলেন: “তুমি কীভাবে রোজা রাখছ, অথচ গালি দিচ্ছ?”

আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে বলেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে ক্ষমা লাভ করতে পারেনি, আগামী বছর রমজান আসা পর্যন্ত তার ক্ষমা লাভের সম্ভাবনা নেই—যদি না সে আরাফার দিন (আরাফার ময়দানে) উপস্থিত থেকে ক্ষমা লাভ করে।” তিনি আল্লাহকে 'যুল ফাদলিল আজিম' (মহা অনুগ্রহশীল) হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, যে যত বেশি আল্লাহর জিকির (স্মরণ) করবে, সে তত বেশি অনুগ্রহ লাভে ধন্য হতে পারবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha