হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রোথিত এই মহান ইবাদতের তাৎপর্য নিয়ে হাজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আয়াতুল্লাহ আহমাদী, ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর বিশেষজ্ঞের সঙ্গে এক আলাপচারিতার সারাংশ নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাবা শরিফ তাওয়াফের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?
হুজ্জাতুল ইসলাম আহমাদীর উত্তর: তাওয়াফ সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা যায়—
১. তাওয়াফের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
তাওয়াফ শব্দের অর্থ হলো পবিত্র কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করা। এটি হজ ও উমরাহর অন্যতম প্রধান ও মৌলিক ইবাদত।
২. তাওয়াফের আধ্যাত্মিক দিক
তাওয়াফ কেবল বাহ্যিকভাবে ঘোরার নাম নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। হজের গোপন রহস্য ও অন্তর্নিহিত শিক্ষার সঙ্গে এ বিষয়টি সম্পর্কিত। এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো—
• আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ মনোনিবেশ ও তাওহিদের চেতনা
• মহান প্রতিপালকের সামনে বিনয় ও আত্মসমর্পণ
• অন্তরের উপস্থিতি ও নিষ্ঠা
• আত্মিক পবিত্রতা ও অন্তরের পরিচ্ছন্নতা
এসব আধ্যাত্মিক মাত্রা তাওয়াফকে শুধু শারীরিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে উন্নীত করে এক পূর্ণাঙ্গ ইবাদতে পরিণত করেছে।
তাওয়াফের ইতিহাস ও সূচনা
মূল প্রশ্ন হলো—তাওয়াফের সূচনা কখন এবং কীভাবে? ইতিহাসের আলোকে বিষয়টি কয়েকটি ধাপে ব্যাখ্যা করা যায়।
১. ইসলামের যুগে
তাওয়াফের পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক বিধান হিজরতের দশম বছরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের সময় মুসলমানদের শিক্ষা দেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ ফরজ হজ। সেই সফরেই তিনি উম্মতকে কাবা ঘরের চারদিকে সাতবার তাওয়াফসহ হজের যাবতীয় বিধান শিক্ষা দেন।
২. হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর যুগে
আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কাবা ঘর নির্মাণের পর তাওয়াফকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পবিত্র কোরআনেও এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে:
“আর আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম—আমার ঘরকে তাওয়াফকারীদের, ইতিকাফকারীদের ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।”
সে সময় তাওয়াফ ছিল হজের মূল ও কেন্দ্রীয় ইবাদত; অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেত।
৩. হযরত আদম (আ.)-এর যুগে
বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, পৃথিবীতে আগমনের পর হযরত আদম (আ.)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি আল্লাহর ঘর নির্মাণের নির্দেশ পান এবং সেটিকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করেন। বলা হয়, তাঁর তাওয়াফ ছিল আরশে ইলাহির চারপাশে ফেরেশতাদের তাওয়াফের অনুরূপ।
৪. মানব সৃষ্টির আগেও: ফেরেশতাদের তাওয়াফ
ইসলামী বর্ণনায় এসেছে, মানবজাতি সৃষ্টির পূর্বে ফেরেশতারা আসমানে “বাইতুল মামুর” নামক এক পবিত্র স্থানের চারপাশে তাওয়াফ করতেন। এটি চতুর্থ আসমানে অবস্থিত এবং কাবা শরিফের সমান্তরালে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফেরেশতারা এভাবেই আল্লাহর ইবাদত করতেন।
কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, পৃথিবীর কাবা সেই আসমানি ঘরের আদলে নির্মিত হয়েছে এবং তাওয়াফের বিধানও ফেরেশতাদের সেই ইবাদত থেকেই উৎসারিত।
অতএব, তাওয়াফের ইতিহাসকে চারটি প্রধান ধাপে দেখা যায়—ফেরেশতাদের যুগ, হযরত আদম (আ.), হযরত ইবরাহিম (আ.) এবং পরবর্তীতে ইসলামের মাধ্যমে এর পূর্ণাঙ্গ বিধিবদ্ধ রূপ।
জাহেলি যুগেও তাওয়াফের ধারাবাহিকতা
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তাওয়াফের এ ঐতিহ্য অব্যাহত ছিল। এমনকি জাহেলি যুগেও মুশরিকরা নানা ভ্রান্ত বিশ্বাসে নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বেও কাবা ঘরের প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করত এবং তাওয়াফ করত। এটি প্রমাণ করে যে, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রবর্তিত মূল ঐতিহ্যের ভিত্তি তখনও টিকে ছিল, যদিও তা বিভিন্ন কুসংস্কার ও মূর্তিপূজার উপাদানের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
আপনার কমেন্ট