শুক্রবার ১৫ মে ২০২৬ - ০৯:৩৮
কীভাবে বিরোধ ছাড়াই বাবা-মায়ের সঙ্গে বিশ্বাসের সেতু গড়ে তোলা যায়?

সন্তান ও বাবা-মায়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ধর্মীয় বিশ্লেষক সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও পারিবারিক সন্তুষ্টির মাঝে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “স্বাধীনতা কখনোই বিরোধ বা সংঘাতের নাম নয়। বরং বিশ্বাসের সেতু গড়ে তোলা এবং সহনশীলতার শিল্প আয়ত্ত করার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেও বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি ও মানসিক প্রশান্তি অর্জন করতে পারে।”

হাওজা নিউজ এজেন্সি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্তান ও বাবা-মায়ের সম্পর্ক সবসময়ই ‘সম্মান’ ও ‘স্বাধীনতা’র সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক তরুণ-তরুণী যখন নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় খুঁজে পেতে চায়, তখন তারা বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণ, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার দেয়ালের মুখোমুখি হয়। এর ফলে মানসিক দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি ও পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন হলো— বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেও কি ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব? আর শরয়ী দায়িত্ব ও স্বাধীনতার প্রয়োজনের মধ্যে কীভাবে স্থায়ী ভারসাম্য তৈরি করা যায়?

এ প্রসঙ্গে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন তরুণদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রশ্ন “আমার পরিবার, বিশেষ করে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বহু বছর ধরে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। কৈশোর থেকেই এই টানাপোড়েন শুরু হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও তীব্র হয়েছে। আমাদের মাঝে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

আমার মা সবসময় চান আমি যেন তাঁর ইচ্ছামতো চলি। কিন্তু আমি তা পারি না, আবার সবসময় মানিয়েও নিতে চাই না। এই দ্বন্দ্ব আমাদের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এখন আমি স্বাধীনভাবে জীবন গড়ার কথা ভাবছি।”

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন তারাশিয়ুনের উত্তর
তিনি বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই— আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো, সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের আনুগত্য করা আবশ্যক; তবে যদি তারা কোনো গুনাহ বা আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে আনুগত্য বৈধ নয়। বরং তখন তা অমান্য করাই শরয়ি ও নৈতিক দায়িত্ব।

আমার এই বিশ্বাস গভীর ঈমান থেকে উৎসারিত। আমি মনে করি, মহান আল্লাহ আমাদের জীবনে এসব চ্যালেঞ্জ রেখেছেন কোনো না কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্যে।”

তিনি আরও বলেন, এ প্রসঙ্গে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে, যা অনুধাবনের জন্য কিছু প্রাথমিক আলোচনা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত উৎকর্ষ ও বাবা-মায়ের সন্তুষ্টির ভারসাম্য
ধরা যাক, একজন তরুণ বা তরুণী মানবিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। সে তাহাজ্জুদ পড়ে, আরবাঈন পদযাত্রা-এ অংশ নেয়, সময়মতো নামাজ আদায় করে, পূর্ণ হিজাব মেনে চলে এবং ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ।

বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, তার মধ্যে সব ধরনের নেক আমল একত্র হয়েছে। কিন্তু তার আমলনামা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে— বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি।

বহু বর্ণনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যদি বাবা-মা সন্তানের ওপর অসন্তুষ্ট থাকেন, তবে সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।

এসব বর্ণনা একটি গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে— কেন আল্লাহ আমাদের বাবা-মায়ের কথা শুনতে বলেছেন? কারণ, এই আনুগত্যই প্রকৃত আত্মগঠনের পথ তৈরি করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, সন্তানরা চিন্তাশক্তিহীন যন্ত্রের মতো বাবা-মায়ের সব কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে। একজন তরুণের আচরণগত, চিন্তাগত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকার অধিকার রয়েছে। বরং এগুলোই মানসিক পরিপক্বতার অংশ।

কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা রয়েছে। যদি বাবা-মা সন্তানকে নিজের ইচ্ছার যন্ত্রে পরিণত করতে চান, অথবা তাদের নির্দেশ শরিয়ত ও বিবেকের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে আনুগত্য আবশ্যক নয়।

এমন পরিস্থিতিতে সংযমের সঙ্গে ভাবতে হবে: “বাবা-মাও মানুষ। তারাও কখনো ভুল করতে পারেন। তবে কখনো কখনো তারা এমন কিছু দেখতে পান, যা আমাদের অবস্থান থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।”

বিশ্বাস — সম্পর্কের দ্বিমুখী সেতু
কয়েকদিন আগে এক বক্তৃতা শেষে প্রায় ১৬-১৭ বছর বয়সী এক কিশোর উদ্বিগ্ন মুখে এসে বলল, “হুজুর, আমি বুঝতে পারি না কেন আমার বাবা-মা আমাকে বিশ্বাস করেন না!”

তার প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমি তাকে পাল্টা একটি মৌলিক প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি নিজেও তাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছ?”

আসলে বিশ্বাস একটি দ্বিমুখী বিষয়। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই বাবা-মা সন্তানের ওপর অন্ধভাবে আস্থা রাখবেন— এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

যেমন বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের ওপর আস্থা রাখা, তেমনি সন্তানেরও উচিত নিজের আচরণের মাধ্যমে সেই আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।

আমি যখন বিষয়টি ছেলেটিকে বুঝিয়ে বললাম, সে গভীর নীরবতায় ডুবে গেল। মনে হলো, তার সামনে নতুন একটি দিগন্ত খুলে গেছে। সে বুঝতে পারল— বিশ্বাস কীভাবে গড়ে তুলতে হয়।

আমি তাকে উদাহরণ দিয়ে বললাম: যখন তুমি বাসা থেকে বের হবে আর মা জিজ্ঞেস করবেন, “কোথায় যাচ্ছ?”, তখন শুধু “একটু বাইরে যাচ্ছি” বললে হবে না। এমন অস্পষ্ট উত্তর মায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

বরং আন্তরিকতার সঙ্গে বলো: “মা, মনটা একটু খারাপ লাগছে। তাই পার্কে একটু হাঁটতে যাচ্ছি। আধা ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব, ইনশাআল্লাহ।”

এই স্বচ্ছতাই বিশ্বাসের সেতু গড়ার ছোট কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

যখন সন্তান সততা ও স্পষ্টতার সঙ্গে নিজের অবস্থান জানায়, তখন উদ্বেগের জায়গা দখল করে নেয় আশ্বাস ও প্রশান্তি। আর এই প্রশান্তিই সুস্থ স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করে।

স্বচ্ছতা — প্রশান্তি ও স্বাধীনতার চাবিকাঠি
যখন সন্তান খোলামেলা কথা বলে, তখন মা দুশ্চিন্তামুক্ত হন। কিন্তু উত্তর অস্পষ্ট হলে মায়ের মনে নানা নেতিবাচক চিন্তা জন্ম নেয়:
— “হয়তো খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে।”
— “হয়তো অনুপযুক্ত কোথাও যাচ্ছে।”
— “হয়তো এমন কিছু করছে, যা আমরা জানি না।”

একটি অস্পষ্ট বাক্য বাবা-মায়ের মনে সন্দেহ ও উদ্বেগের দরজা খুলে দিতে পারে।

অন্যদিকে সন্তান যদি আগে থেকেই বিস্তারিতভাবে জানিয়ে রাখে, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যায়। যেমন: “মা, মোবাইল সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে। যখন প্রয়োজন হবে ফোন করবে। আর ফেরার সময়ও জানিয়ে দেব।”

এ ধরনের সাধারণ কথাই মায়ের মন থেকে বড় ধরনের দুশ্চিন্তা দূর করে দেয়। তখন আর বারবার জিজ্ঞেস করতে হয় না:
— “কখন ফিরবে?”
— “কোথায় যাচ্ছ?”
— “কার সঙ্গে যাচ্ছ?”

যখন সন্তান নিজ থেকেই বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে, তখন—
• মা মানসিক শান্তি পান
• সন্তানও নিরাপদ ও স্বস্তিকর পরিবেশে চলাফেরা করতে পারে
• ব্যক্তিস্বাধীনতাও অক্ষুণ্ণ থাকে

অতএব, প্রথম মূলনীতি হলো: “স্বচ্ছতা কখনো স্বাধীনতার বাধা নয়; বরং সুস্থ স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।”

সহনশীলতা— অন্যকে বদলানোর নয়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর শিল্প
হুজ্জাতুল ইসলাম তারাশিয়ুন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির ওপর জোর দেন, তা হলো ‘মুদারা’ বা সহনশীলতা শেখা।

সহনশীলতার অর্থ হলো— বাবা-মায়ের মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কখনো সমাধান বয়ে আনে না; বরং তা উভয় পক্ষের কষ্ট বাড়ায়। কারণ, আমরা সবসময় বাবা-মাকে পরিবর্তন করতে পারব না।

তবে একটি অস্বীকার করা যায় না এমন সত্য হলো— বাবা-মা পদ্ধতিগত ভুল করলেও সাধারণত সন্তানের কল্যাণই চান।

এমনকি কখনো তারা কঠোর আচরণ করলেও— যেমন রাগারাগি বা শারীরিক শাস্তি— তবুও এটা মনে করা ঠিক নয় যে তারা সন্তানের ক্ষতি চান।

বরং অনেক সময় তারা জানেন না কীভাবে সঠিকভাবে আচরণ করতে হয়। নিজেদের সীমিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে তারা যেটিকে সঠিক মনে করেন, সেটিই করার চেষ্টা করেন— যদিও তা সন্তানের জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha