শিশু-প্রতিপালনে পিতামাতা যে ১০টি সাধারণ ভুল করেন

সন্তান প্রতিপালনে পিতামাতার দশটি সাধারণ ভুল — যেমন তিরস্কার, শারীরিক শাস্তি, হুমকি ও ঘুষ — শিশুর সঠিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং পিতামাতা-সন্তানের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কার্যকর প্রতিপালন মূলত উৎসাহ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণের ওপর ভিত্তি করে স্থাপিত হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কখনও কখনও পিতামাতা অতিরিক্ত স্নেহ বা ক্লান্তির বশবর্তী হয়ে এমন আচরণ করেন যা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভালোবাসার বন্ধন দুর্বল করে দেয়। সচেতন প্রতিপালন মানে এই ছোট ছোট ভুলগুলো বড় হওয়ার আগেই চিহ্নিত করা।

প্রশ্ন: শিশু প্রতিপালনে পিতামাতার সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলো কী কী?

উত্তর: আপনার সন্তান কি আপনার কথা শোনে না? আপনি নির্ধারিত নিয়ম ও সীমা অমান্য করে? এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে আপনি কী করবেন? অকার্যকর প্রতিক্রিয়া ব্যবহার পিতামাতার মধ্যে খুবই সাধারণ। এসব প্রতিক্রিয়া কখনও কখনও উল্টো কাজ করে এবং শিশুকে আরও মনোযোগ আকর্ষণের লড়াইয়ে উসকে দেয়।

আপনার গৃহীত পদ্ধতি কার্যকর না হওয়া চিহ্নিত করা উন্নতির প্রথম পদক্ষেপ। নিচে ১০টি সাধারণ প্রতিপালনগত ভুল উল্লেখ করা হলো:

১. তিরস্কার:
আপনি সন্তানকে তার আচরণের জন্য তিরস্কার করেন। যেমন: “তুই এখনো তোর ঘর গুছিয়ে নিসনি?" আপনার সন্তান কি এই ধরনের তিরস্কার শুনে তার আচরণ পরিবর্তন করেছে? আপনি শিশুকে ঠিক সেই কাজটির কথাই বলছেন যা সে সেই মুহূর্তে করছে, অথচ শিশু তার কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। আচরণটি অনুপযুক্ত তা জানানো সাধারণত কোনো লাভ করে না। শিশুর কাছে এই তিরস্কার শুধু দোষারোপের মতো শোনায়। শিশু ভাবে: “সে আমাকে পছন্দ করে না। তাই তার মনোযোগ পেতে আমাকে লড়তে হবে।” বিশেষ করে যদি তিরস্কারের সঙ্গে অপমানজনক বাক্য থাকে, তবে শিশুর এই অনুভূতি আরও তীব্র হয়।

মনে রাখবেন: আপনার সন্তানের ওপর আপনি যত আঘাতই করুন না কেন, তা আপনার ও সন্তানের সম্পর্কের ওপর আঘাত হিসেবে পড়বে।

২. শারীরিক শাস্তি:
আপনিও কি কখনও ধৈর্য হারিয়েছেন? কখনও সন্তানের গায়ে নিজের হাতের চিহ্ন দেখেছেন? তাকে ভালো করে মেরেছেন? প্রায় প্রতিটি পিতামাতাই অন্তত একবার জেনে বা না জেনে সন্তানকে শারীরিক শাস্তি দিয়েছেন। শারীরিক শাস্তির প্রভাব শিশুর ওপর কেমন হয় তা বোঝা সহজ। যেসব শিশু নিয়মিত মার খায়, সময়ের সঙ্গে তাদের ব্যথা সহিষ্ণুতা বাড়ে। এসব শিশুর মধ্যে পিতামাতার অন্যান্য বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের মতো প্রতিশোধপরায়ণতা তীব্র হয়। পাশাপাশি ভুলবেন না, শিশুরা আমাদের যা শেখে, তা নিজেরা পরবর্তী প্রজন্মকে দেয়। শারীরিক শাস্তি অপমানজনক এবং শিশু প্রতিপালনে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।

সঠিক প্রতিপালনের নীতি: আপনি ভবিষ্যতে যে আচরণগুলো আরও বেশি দেখতে চান, সেগুলোতে উৎসাহ ও মনোযোগ দিন।

৩. ভালো আচরণ উপেক্ষা করা:
কিছু শিশুর আচরণগত সমস্যা বেশি থাকে, কারণ তাদের পিতামাতা ভালো আচরণের দিকে খুব কম মনোযোগ দেন, কিন্তু ভুল করলেই কঠোর শাস্তি দেন। প্রশংসনীয় আচরণ যদি উপেক্ষিত ও অবহেলিত হয়, ভবিষ্যতে তা কমে যাবে — এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সঠিক প্রতিপালনের নীতি: আপনি ভবিষ্যতে যে আচরণগুলো আরও বেশি দেখতে চান, সেগুলোতে উৎসাহ ও মনোযোগ দিন।

৪. অপমানসূচক নাম ডাকা (চরিত্র হেয় করা):
পিতামাতা যখন সন্তানকে 'বোকা', 'নির্বোধ', 'গাধা', 'অক্ষম', 'জড়বুদ্ধি', 'বিরক্তিকর' ইত্যাদি নামে ডাকেন, তখন শিশুর মানসিক ও আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কখনও কখনও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, আবার কখনও রাগের বশে এসব বলা হয়। তবে এসব শব্দ পরিস্থিতির উন্নতি না করে বরং আরও খারাপ করে।

৫. অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া (বাচ্চালো করা):
এই ধরনের পিতামাতা কোনো সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেন না, আর যেগুলো করেন সেগুলো প্রায়ই তুলে নেন। সন্তান যা চায়, তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এসব সন্তান কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়া বেড়ে ওঠে এবং সাধারণত 'নষ্ট' বা 'অতিরিক্ত আদুরে' হয়ে থাকে। ফলে অন্যের সঙ্গে মেশার সময় তাদের সমস্যা হয়।

৬. অতিরঞ্জন ও অতিসুরক্ষা:
একটি সাধারণ বিষয়কে জটিল সমস্যায় রূপান্তরিত করা, শিশু সামান্য জ্বরে আতঙ্কিত হয়ে পড়া, নিজে তার সব কাজ করে দেওয়া, প্রতিটি খুঁটিনাটিতে হস্তক্ষেপ করা — এগুলো অতিসুরক্ষার লক্ষণ। এতে শিশু জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা অর্জন করে না এবং বড় হয়েও দায়িত্ব নিতে চায় না।

৭. অতিরিক্ত প্রত্যাশা:
শিশুর বয়স ও বিকাশের স্তর অনুযায়ী যৌক্তিক প্রত্যাশা জরুরি। সামর্থ্যের বাইরে দাবি করলে শিশু প্রতিরোধ ও ঘৃণা দেখাতে পারে। উদাহরণ: তিন বছরের শিশুকে অন্যের সাহায্য ছাড়া পুরো ঘর গোছাতে বলা।

৮. ঘুষ:
“যদি তুমি এমন করো, তাহলে ওটা দেব” — এ পদ্ধতি ব্যর্থ হয়। এতে শিশু তাৎক্ষণিক পুরস্কারের জন্য কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী আচরণ পরিবর্তন হয় না। বরং এটি শিশুকে বোঝায় যে তার সামর্থ্যের ওপর আপনার আস্থা নেই। আগে থেকে না জানিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে পুরস্কার দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর ও আনন্দদায়ক।

৯. হুমকি:
“আবার করলে মেরে দেব”, “বাবা আসা পর্যন্ত... — বারবার হুমকি শুনেও যদি শিশু পরিণতি না দেখে, তাহাবে হুমকি অকার্যকর হয়ে যায়। বরং এতে শিশু সাহস পেয়ে আপনার ধৈর্য যাচাই করতে পারে।

১০. ঝগড়া ও অশান্তি:
প্রতিটি শিশুর মানসিক নিরাপত্তা প্রয়োজন। দোষারোপ, জেদ, তিরস্কার, চিৎকার, অশ্লীল ভাষা ও শিশুর সঙ্গে ঝগড়া নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি করে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা নষ্ট হয় এবং পিতামাতা তাদের কর্তৃত্ব হারান।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha