হাওজা নিউজ এজেন্সি: ড. তাবারাই বলেন, সমসাময়িক গণমাধ্যম ধীরে ধীরে পিতাকে হাস্যকর, অক্ষম কিংবা অনির্ভরযোগ্য চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাঁর মতে, পারিবারিক ধারাবাহিক নাটক ও কৌতুকধর্মী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রবণতা এখন কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পরিবারে পিতার অবস্থান দুর্বল করার এক সাংস্কৃতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ও ইরানি সংস্কৃতিতে পিতা পরিবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হতেন। পিতা কোনো কর্তৃত্ববাদী চরিত্র নন; বরং তিনি জ্ঞানী, বিশ্বস্ত এবং জীবন–অভিজ্ঞতা সন্তানদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। সন্তানরা তাঁর কাছ থেকেই জীবনদক্ষতা, সামাজিক বোধ ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি অর্জন করত।
আধুনিক জীবনধারার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে সন্তানরা পিতার সঙ্গে কাজ, বাজার কিংবা বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিবেশে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করত। কিন্তু আধুনিক গণমাধ্যমের বিস্তারের ফলে সেই বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন গণমাধ্যম সমাজের পরিচয় নির্মাণকারী উপাদানগুলোকে লক্ষ্য করে অনেক সময় পিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকেও দুর্বলভাবে উপস্থাপন করে। শিশুতোষ অনুষ্ঠান, টেলিভিশন সিরিয়াল এমনকি বিজ্ঞাপনেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ড. তাবারাই বলেন, এর ফলে পিতার ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং পিতা–সন্তানের আবেগীয় ও শিক্ষামূলক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ নারী–পুরুষ উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা যথাযথ পারিবারিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মিডিয়ার যুগে পিতার ভূমিকা আরও জটিল হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের পিতাদের শুধু সামাজিক সচেতনতা থাকলেই চলবে না; তাদের মিডিয়া–সাক্ষরতাও থাকতে হবে, যাতে তারা সন্তানের জন্য উপযুক্ত মিডিয়া নির্বাচন ও ব্যবহারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, সচেতনভাবে মিডিয়া কনটেন্ট নির্বাচন, সন্তানের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা এবং কেবল নিষেধাজ্ঞামূলক আচরণ এড়িয়ে চলা বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।
বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিশুদের দূরে সরে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এর ফলে ব্যবহারিক দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে, বাস্তব জীবন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা বাড়ছে এবং অতিরিক্তভাবে গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে।
সমাধান হিসেবে তিনি মিডিয়া ব্যবহারে সংযম, সন্তানদের মিডিয়া–সাক্ষরতা বৃদ্ধি, কনটেন্ট সম্পর্কে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং পরিবারের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ড. তাবারাই বলেন, সন্তানের দৈনন্দিন জীবনে পিতার নৈতিক, সামাজিক ও মানসিক উপস্থিতি তার ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষে তিনি বলেন, যদিও শিশুর লালন–পালন ও শিক্ষা বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব, তবুও পরিবারে পরিচয় নির্মাণে পিতার ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। মিডিয়া–সচেতনতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে পরিবারে পিতার মর্যাদা ও অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।
আপনার কমেন্ট