অনুভূতি প্রকাশের ধরনকে ভালোবাসার ঘাটতি মনে করা ঠিক নয়

মানুষের ব্যক্তিত্বগত পার্থক্য— বিশেষ করে অনুভূতি প্রকাশ ও চিন্তাভাবনার ধরনে ভিন্নতা— ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বহু ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় কেউ কম আবেগ প্রকাশ করলে তা ভুলভাবে ভালোবাসার অভাব বা নেতিবাচক মনোভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ এটি প্রায়ই ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বিবাহ ও সন্তান প্রতিপালন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা ইউসুফজাদেহ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা ইউসুফজাদেহ বলেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের ভূমিকা সঠিকভাবে বোঝা এবং একই সঙ্গে অন্যদের দায়িত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কেও সচেতন থাকা। যেমন, ফুটবল দলে একজন ডিফেন্ডারের কাছে ফরোয়ার্ডের মতো গোল করার প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আবার যদি আশা করা হয় যে দলের সব খেলোয়াড়ই বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারের মতো খেলবে, তাহলে সেই দলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ভিন্নতা এবং নিজ নিজ অবস্থানে সঠিক ভূমিকা পালনই একটি সফল ও টেকসই ব্যবস্থার ভিত্তি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।

ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা বোঝা জরুরি
তিনি আরও বলেন, নারী-পুরুষের সম্পর্কসহ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো “আন্তঃক্রিয়ামূলক স্বভাব”। মানুষের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যের মাত্রা একেক রকম হয়। কেউ তুলনামূলক কম, কেউ মাঝারি, আবার কেউ অত্যন্ত বেশি মাত্রায় এ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন।

যারা বেশি আন্তঃক্রিয়ামূলক স্বভাবের, তারা সাধারণত বহির্মুখী হন এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা থেকে শক্তি ও উদ্দীপনা পান। অন্যদিকে, যাদের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য কম, তারা সীমিত যোগাযোগ, ব্যক্তিগত আলাপ কিংবা একাকিত্ব থেকে মানসিক স্বস্তি ও শক্তি অর্জন করেন।

কম আবেগপ্রকাশ মানেই ভালোবাসাহীনতা নয়
তিনি বলেন, বেশি আন্তঃক্রিয়ামূলক মানুষ সাধারণত নিজেদের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করেন, আবেগকে তীব্রভাবে অনুভব করেন এবং দ্রুত আবেগগত প্রতিক্রিয়া দেখান। তারা নিজেদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহী হন এবং সাধারণত আনন্দ ও সন্তুষ্টি প্রকাশেও স্বতঃস্ফূর্ত থাকেন।

অন্যদিকে, যাদের মধ্যে আন্তঃক্রিয়ামূলক বৈশিষ্ট্য কম, তারা সাধারণত অনুভূতি কম প্রকাশ করেন। তবে এটিকে কখনোই ভালোবাসার অভাব বা অনাগ্রহ হিসেবে দেখা উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কম আবেগ প্রকাশ করলে এ কথা বলা ঠিক নয় যে, “তুমি আমাকে ভালোবাসো না।” বরং এটি তার ব্যক্তিত্বের একটি স্বাভাবিক ধরন; অর্থাৎ তিনি অনুভূতি প্রকাশে তুলনামূলক কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

“উচ্চস্বরে চিন্তা করা” ও নীরবে ভাবনার পার্থক্য
এই পার্থক্য শুধু আবেগের ক্ষেত্রেই নয়, চিন্তাভাবনার ধরনেও প্রকাশ পায়। যারা বেশি আন্তঃক্রিয়ামূলক, তারা প্রায়ই কথা বলার মাধ্যমে চিন্তা গুছিয়ে নেন। সহজ ভাষায় বলা যায়, তারা “উচ্চস্বরে চিন্তা করেন”। অর্থাৎ, মনে যা আসে তা বলতে বলতে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

এ ধরনের মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে তাদের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া জরুরি। তাদের প্রাথমিক কথাগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরে নিয়ে সমালোচনা বা দোষারোপ করা উচিত নয়। কারণ, তাদের জন্য কথা বলা আসলে চিন্তা প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

তিনি বলেন, সাধারণত বহির্মুখী মানুষ বেশি আলোচনাপ্রবণ হন এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক অন্তর্মুখী বা কম আন্তঃক্রিয়ামূলক ব্যক্তিরা আগে নিজের মনে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেন, এরপর সিদ্ধান্ত বা মতামত প্রকাশ করেন।

তাই কাউকে “তুমি পরামর্শ করো না” বা “তুমি আলোচনা পছন্দ করো না”— এ ধরনের অভিযোগ করা সব সময় ন্যায়সঙ্গত নয়। কারণ, অনেক মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের ভেতরে চিন্তা করার জন্য কিছুটা ব্যক্তিগত মানসিক পরিসর প্রয়োজন মনে করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha