কিশোর সন্তানকে কি কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে একা রাখা যেতে পারে?

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন সন্তান ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যায় এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করে। তবে এই সময়টিই আবার মানসিক, আবেগিক ও আচরণগত নানা পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনেক অভিভাবক বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন পরীক্ষা, চাকরি, ভ্রমণ বা পারিবারিক প্রয়োজনে—কিশোর সন্তানকে কিছু সময়ের জন্য বাড়িতে একা রেখে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি হন। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত? একজন কিশোর কতটা সময় একা থাকতে পারে?

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এ বিষয়ে পরিবার ও সন্তান প্রতিপালন-বিষয়ক পরামর্শক হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা ইউসুফজাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রশ্ন:
একজন অভিভাবক জানতে চেয়ে লিখেন: “আমরা একটি ধর্মপ্রাণ পরিবার। আমাদের পাঁচটি সন্তান। বড় ছেলের বয়স ১৫ বছর। বর্তমানে তার পরীক্ষা চলছে। আমরা পারিবারিকভাবে গ্রামের বাড়ি যেতে চাই, কিন্তু পরীক্ষার কারণে তাকে বাড়িতে রেখে যাওয়ার কথা ভাবছি। সে নিজেও এতে সম্মত। স্বভাবগতভাবে সে শান্ত, মসজিদমুখী এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপনার মতে, তাকে কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে একা রেখে যাওয়া কি সমীচীন হবে?”

কিশোর সন্তানকে কি কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে একা রাখা যেতে পারে?

উত্তর:
হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা ইউসুফজাদে বলেন, কৈশোরকাল মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। আপনার ছেলে বর্তমানে এই পর্যায়ের মধ্যভাগে রয়েছে। তাই তাকে একা রেখে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ সতর্কতা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন।

পরীক্ষা বা অন্য কোনো কারণে কিশোর সন্তানকে বাড়িতে একা রেখে যাওয়ার বিষয়ে সবার জন্য একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি সন্তান এবং তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভিন্ন। তবে এ ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি সব সময় মনে রাখতে হবে—সতর্কতা অবলম্বন করা।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা বিবেচনা করতে হবে
প্রথমত, পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সন্তানের মানসিক পরিপক্বতা, ব্যক্তিত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হবে।

তৃতীয়ত, তার বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক যোগাযোগ, দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং জীবনযাপনের ধরন সম্পর্কে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হবে।

এছাড়া তার খোঁজখবর রাখার জন্য কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয়, প্রতিবেশী বা তত্ত্বাবধায়ক ব্যক্তি রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সে কত সময়ের জন্য একা থাকবে এবং সেই সময়ের দায়িত্ব পালনের জন্য বাস্তবিক অর্থে প্রস্তুত কি না।

একা থাকার ইতিবাচক দিক
কৈশোরে সন্তানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। তাই স্বল্প সময়ের জন্য একা থাকা বা কিছু কাজ নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করা সবসময় নেতিবাচক নয়।

বরং এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করে, আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলে এবং মানসিক পরিপক্বতা অর্জনে সহায়তা করে। পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্কও আরও সুদৃঢ় হয়।

সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়
তবে এর সঙ্গে কিছু বাস্তব উদ্বেগও জড়িত। বাড়ির নিরাপত্তা, সন্তানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কখনোই উপেক্ষা করা যায় না।

কিশোররা শারীরিকভাবে বড় হয়ে উঠলেও তাদের অভিজ্ঞতা এখনও সীমিত থাকে। ফলে কোনো কোনো পরিস্থিতিতে তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, যা মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি তাদের নাও থাকতে পারে।

অভিভাবকদের করণীয়
সন্তানকে একা রেখে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে সে মানসিক, নৈতিক ও আচরণগতভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত।

পাশাপাশি কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তিকে তার খোঁজখবর রাখার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তিনি যেন জানেন যে সন্তান বাড়িতে একা রয়েছে এবং নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বা প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন।

সম্ভব হলে রাতে তাকে কোনো নিকট আত্মীয়ের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করা উত্তম। কারণ কিশোরদের কল্পনাশক্তি সাধারণত প্রবল হয়। রাতের নিঃসঙ্গতা কখনো কখনো তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক অস্বস্তির সৃষ্টি করতে পারে।

কিছু নিয়ম আগে থেকেই নির্ধারণ করুন
সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে একা থাকার সময়ের জন্য কিছু স্পষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সে কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, কারা বাড়িতে আসতে পারবে, জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবে—এসব বিষয় আগেই পরিষ্কার করে দিতে হবে। একা থাকার সময় যত দীর্ঘ হবে, সতর্কতার মাত্রাও তত বাড়াতে হবে।

তার প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ, অর্থ, যোগাযোগের মাধ্যম এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নম্বরগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে।

এ ছাড়া নিয়মিত ফোনকল, ভিডিও কল বা অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রেখে তার সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া উচিত।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বিশেষ প্রয়োজন না হলে কোনো কিশোরকে একটানা এক দিন-রাত বা তার বেশি সময় সম্পূর্ণ একা রেখে যাওয়া সমীচীন নয়। তবে কয়েক ঘণ্টার জন্য একা থাকা, যথাযথ প্রস্তুতি, তত্ত্বাবধান এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে সাধারণত তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, কৈশোর এমন একটি সময়, যখন সন্তান শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে অগ্রসর হয়। তাই এই সময়ে তাদের স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি যথাযথ দিকনির্দেশনা, তদারকি এবং মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha