বুধবার ৩ জুন ২০২৬ - ১১:৫৩
কুরআন পড়ি: আল্লাহর আনুগত্য কি রাসূলের আনুগত্য ছাড়া সম্ভব?

হাওজা / আয়াত «وَأَطِیعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّکُمْ تُرْحَمُونَ» (আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করো, যাতে তোমাদের উপর রহমত করা হয়)-এ আয়াতটি আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর একসঙ্গে আনুগত্যের ওপর জোর দেয়; যে আনুগত্য ইবাদত-বন্দেগি পালন এবং রাসূলের আদেশের সামনে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় এবং যা আল্লাহর রহমত লাভ ও সম্মানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার পথ উন্মুক্ত করে। এই পথটি আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ‘প্রতিযোগিতার’ আহ্বানের মাধ্যমে চিত্রিত করা হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কুরআন পড়ি’ বিশেষ ফাইলটি শহীদ নেতার (রহ.) কুরআনি তাফসির আলোচনা করে। এই সংখ্যায় আমরা ‘পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামি চিন্তার ভিত্তি’ শিরোনামটি পর্যালোচনা করব, যা আপনার জন্য, বিদগ্ধজন, উপস্থাপন করা হলো।

وَأَطِیعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّکُمْ تُرْحَمُونَ

রাসূলের আনুগত্য করো, সম্ভবত তোমরা তোমাদের প্রভুর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হবে।

প্রশ্ন হলো, যেখানে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য বাহ্যিকভাবে আলাদা কিছু নয়, সেখানে কুরআন এ প্রসঙ্গে কেন বলছে: «اطیعوا الله و اطیعوا الرسول»?

উভয় পদ একসঙ্গে উল্লেখ করা কি অপ্রয়োজনীয়?

না; কারণ শুধু আল্লাহর আনুগত্যের কথা উল্লেখ করলে রাসূলের শত্রুরাও দাবি করতে পারত যে তারা আল্লাহর অনুগত। তাই এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে আল্লাহর আনুগত্য আসলে কী অর্থ বহন করে।

যারা নিজেদের আল্লাহর বান্দা বলে দাবি করে, কিন্তু আল্লাহর আদেশ ও বিধানের অনুগত নয়, তারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করে না এবং এই বান্দাত্বের প্রয়োজনীয়তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, তারা কীভাবে বলতে পারে আমরা আল্লাহর বান্দা?

«أَطِیعُوا اللّهَ وَ الرَّسول»

আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলেরও আনুগত্য করো,

«لَعَلَّکُمْ تُرْحَمُون»

যাতে তোমরা আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হও।

কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য হলো এই যে, আমরা সব ইবাদত-বন্দেগির ভার কাঁধে নেব এবং আমাদের ওপর যা অর্পিত হয়েছে তা পুরোপুরি পালন করব।

যেমন পবিত্র কুরআনের আয়াত বলছে: মুমিনরা তারাই, যাদের মধ্যে কোনো বিরোধ ঘটলে তারা তোমার কাছে (হে রাসূল) ফিরে আসে; আর যখন তুমি কোন রায় দাও, তখন তারা তা সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নেয়।

«.. و یُسلِّموا تَسلیماً»; (তোমার আদেশের কাছে) সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী হয়।

তুমি যে আদেশই দাও না কেন, তা আত্মা ও অন্তরে সামান্যতম অস্বস্তির ধুলোও রেখে যায় না। এভাবে তোমার আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করা হলো প্রকৃত লেনদেন। কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী যদি এভাবে আল্লাহর নির্দেশের অধীন হয়, তাহলে তাদের প্রতি তাদের প্রভুর অসীম রহমত বর্ষিত হবে।

যখন উম্মত সম্মানের চূড়ান্ত সোপানে পৌঁছে, যখন এই জাতি মানবিক পরিপূর্ণতা লাভ করে, তখনই তার পা থেকে শৃঙ্খল ও বেড়ি খুলে যায় এবং আল্লাহর রহমত তাকে আচ্ছন্ন করে।

«وَ سَارِعُوا إِلَی مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّکُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا کَعَرْضِ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِینَ»

এই মাঠ হলো প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতার মাঠ। তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও, যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের মত এবং যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

এই আয়াত বলে না ‘তোমাদের শক্তি থামাও’; বরং বলে: ‘দ্রুত অগ্রসর হও! যত বেশি প্রতিযোগিতা করো!’

কিন্তু কিসের দিকে? যা তোমার উপযুক্ত, এক বিঘত পানি-কাদার দিকে নয়, সেই সামান্য অর্থের দিকে নয়, পার্থিব বস্তুজগতের দিকে নয়, যা তোমার জন্য, হে মহান মানুষ, খুবই ক্ষুদ্র; বরং সেই দিকে, যা তোমার মর্যাদা ও মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; কেননা মানুষ এই জগতের সর্বোত্তম সৃষ্টি।

মহত্ত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো, প্রভুর পর, এই ক্ষুদ্র ও সীমিত মানুষের দেহেই নিহিত।

হে মানুষ, দ্রুত অগ্রসর হও, প্রতিযোগিতা করো; কিন্তু কিসের দিকে?

তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রস্থ আসমান ও জমিন।

তোমার দ্রুত অগ্রসর হওয়া যেন তোমার প্রভুর দিকে, সেই উচ্চতর জান্নাতের দিকে হয়; সেই জান্নাত যার মহত্ত্বের সামনে সব আসমান ছোট ও সব জমিন তুচ্ছ।

যদি আমরা রূপকভাবে তোমার রূহকে একটি দেহ কল্পনা করি, তাহলে তুমি যে পাপই করো না কেন, তা রূহের উপর এক ঘা বসায় এবং তোমার অস্তিত্বে একটি জখম সৃষ্টি করে।

পাপকে আমরা রূহের ওপর আঘাত কেন বলি?

কারণ মানুষের রূহের পরিপূর্ণতা ও উন্নতি প্রয়োজন, আর পাপ হলো সেসব বাধা যা রূহের এই কাক্সিক্ষত পরিপূর্ণতা ও উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে। বর্ণনা ও উপমার পর্যায়ে, পাপ রূহের দেহে আঘাত, ফাটল ও জখম সৃষ্টি করার মতো।

যখন কোনো মানুষ অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করে, মদ পান করে, সুদ খায়, ব্যভিচার করে, মিথ্যা বলে বা অপবাদ দেয়, সে এসব কাজের প্রতিটির মাধ্যমে নিজের রূহ ও মনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে। এই রূহ জখম ও অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। শেষ লক্ষ্য হলো ক্ষমা (মাগফিরাত) লাভ করা; ‘গফরান’ অর্থ এই শূন্যতা পূরণ করা, এই রূহের অভাব পূরণ করা, এই মানসিক জখম নিরাময় করা এবং মানুষের আত্মায় সৃষ্ট এই ঘাটতি দূর করা।

পাপের মাধ্যমে তোমার রূহে সৃষ্ট এই ঘাটতি কীভাবে দূর হয়? কি প্রতিদানের মাধ্যমে?

হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পাপের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে মানবতার পথ থেকে বিচ্যুত করে ও পরিপূর্ণতার মূল উৎস ও মানবতার উড্ডয়নের বিন্দু থেকে দূরে সরে যায়, যখন তার এই পশ্চাৎপদতা পূরণ হয় ও তার রূহ পরিপূর্ণতা লাভ করে, তখন সে তার প্রকৃত অবস্থানের কাছে পৌঁছে যাবে।

«وَالَّذِینَ یُنفِقُونَ فِی الضَّرَّاءِ (যারা কষ্টে ও স্বাচ্ছন্দ্যে দান করে) -

মুত্তাকি বা খোদাভীরু কারা?

তারাই যারা কষ্টে ও স্বাচ্ছন্দ্যে দান করে। খোদাভীরু হওয়ার শর্ত শুধু দান করা নয়, বরং সঠিক ও লক্ষ্যভিত্তিক দান করা; এমন দান যার মাধ্যমে শূন্যতা পূরণ হয় এবং প্রকৃত প্রয়োজন মেটে।

এবং «وَالْکَاظِمِینَ الْغَیْظَ» - অর্থাৎ যারা তাদের ক্রোধ গিলে ফেলে।

এর অর্থ এই নয় যে মানুষ অত্যাচার ও অসত্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না; বরং উদ্দেশ্য হলো, কাজ যেন ক্রোধ ও তাৎক্ষণিক আবেগের ভিত্তিতে না করা হয়। মানুষকে সব সময় বুদ্ধি ও বিবেকের অনুসরণ করতে হবে।

কুরআনে আরো বলা হয়েছে: «أَشِدَّاءُ عَلَی الْکُفَّارِ رُحَمَاءُ بَیْنَهُمْ» - অর্থাৎ মুমিনরা সত্যের শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃঢ়, কিন্তু নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ালু ও ক্ষমাশীল।

সুতরাং, ‘কাজিমিনাল গাইজ’-এর অর্থ এই নয় যে শত্রুতা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ক্রোধ বন্ধ করে দিতে হবে; বরং এর অর্থ হলো মানুষ যেন ক্রোধ ও আবেগের বশবর্তী না হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় বিবেক ও সত্যের ভিত্তিতে।

এবং «وَالْعَافِینَ عَنِ النَّاسِ» - অর্থাৎ যারা মানুষের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়, তাদের ভুলগুলো উপেক্ষা করে এবং তাদের পিছলপনা মোচন করে দেয়।

অবশ্য খেয়াল রাখতে হবে যে ইচ্ছাকৃত, জেদ ও একগুঁয়েমির ভিত্তিতে করা পাপ সহজে উপেক্ষা করা উচিত নয়; কিন্তু মানুষের সাধারণ ভুল-ত্রুটি, যা দৈনন্দিন জীবনে অনেক ঘটে, তা ক্ষমা ও মোচনীয়।

وَالَّذِینَ یُنفِقُونَ فِی الضَّرَّاءِ وَالسَّرَّاءِ وَالْکَاظِمِینَ الْغَیْظَ وَالْعَافِینَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِینَ ﴿١٣٤﴾ وَالَّذِینَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَکَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن یَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ یُصِرُّوا عَلَیٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ یَعْلَمُونَ ﴿١٣٥﴾ أُولَٰئِکَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِی مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِینَ فِیهَا ۚ وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِینَ ﴿١٣٦﴾

অনুবাদ

আর যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (১৩৪)

আর যারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে; আর আল্লাহ ছাড়া গুনাহ কে ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনে-বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জিদ করতে থাকে না। (১৩৫)

এদের প্রতিদান হলো তাদের প্রভুর ক্ষমা ও এমন জান্নাত যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আর আমলকারীদের জন্য এ কত উত্তম প্রতিদান! (১৩৬)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha