হাওজা নিউজ এজেন্সি: 'চল্লিশ দিনের যুদ্ধ' শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল জোটের মধ্যে একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল সেই অভিঘাত, যাতে অঞ্চলের লুকানো বাস্তবতাগুলো উন্মোচিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাওয়া অনেক আঞ্চলিক শক্তি এই বড় পরীক্ষায় কঠিন ভূ–রাজনৈতিক সত্যের মুখোমুখি হয়েছে। এদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে—যে দেশটি গত দুই দশক ধরে তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের জোরে নিজের স্বাভাবিক মর্যাদার চেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে চেয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আবুধাবির শাসকেরা ধরে নিয়েছিলেন, বহিরাগত সমর্থনের মাধ্যমে তারা তাদের ভূ–রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। ফলে ইউএই–এর বৈদেশিক নীতি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ ছেড়ে বহিরাগত শক্তির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রকল্পে অংশগ্রহণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। লিবিয়া ও সুদান থেকে ইয়েমেন ও আফ্রিকার শৃঙ্গ পর্যন্ত এই নীতির ছাপ সুস্পষ্ট। কিন্তু চল্লিশ দিনের যুদ্ধ দেখিয়ে দিল, বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কোনো টেকসই নিরাপত্তা বা প্রকৃত প্রভাব তৈরি করে না।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বড় শক্তিরা তখনই তাদের মিত্রদের পাশে দাঁড়ায় যখন তা তাদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খায়। সংকটের মুহূর্তে আঞ্চলিক অংশীদারদের নিরাপত্তার চেয়ে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষাই অগ্রাধিকার পায়। পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক দশকগুলোর অভিজ্ঞতা বারবার এই বাস্তবতা নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, কৌশলগত প্রয়োজনে সে তার নিকটতম মিত্রদেরও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না।
তবে মনে হয়, ইউএই–এর রাজনৈতিক অভিজাত একটি অংশ এখনও বিশ্বাস করেন যে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠতা একধরনের কৌশলগত অনাক্রম্যতা এনে দিতে পারে। নিরাপত্তা চুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ—এই সবকিছুই সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। কিন্তু চল্লিশ দিনের যুদ্ধ দেখিয়েছে, এই ধারণা আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
যুদ্ধ জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মূল লক্ষ্যই ছিল আঞ্চলিক ভারসাম্য পরিবর্তন করা। তারা মনে করেছিল ব্যাপক সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অবস্থান দুর্বল করে অঞ্চলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিছু আঞ্চলিক শক্তিও ধরে নিয়েছিল যে এই পরিকল্পনার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করলে তারা ক্ষমতা ও প্রভাবে বড় অংশ পাবে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
যুদ্ধের ঘোষিত ও অঘোষিত লক্ষ্যের ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে যে অঞ্চলের ক্ষমতার কাঠামো সামরিক অভিযান বা বিদেশি জোটের মাধ্যমে সহজে বদলানোর মতো নয়। এই বাস্তবতা ইউএই–এর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বৈদেশিক নীতির একটি বড় অংশই এই ধারণার ওপর গড়ে উঠেছিল যে বহিরাগত শক্তির সমর্থনে আঞ্চলিক ভারসাম্য বদলে ফেলা সম্ভব।
কিন্তু ভূগোলের নিজস্ব যুক্তি আছে। ইউএই এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে তার নিরাপত্তা সর্বোপরি আশপাশের পরিবেশের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির কাছে বিস্তৃত কৌশলগত গভীরতা নেই, নেই বড় জনসংখ্যা, নেই অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর মতো সামরিক সক্ষমতা। ইউএই–এর অধিকাংশ শক্তি মূলত তার অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ট্রানজিট ভূমিকার ওপর দাঁড়িয়ে। তাই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের অস্থিরতা আবুধাবির স্বার্থকে অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি আঘাত করতে বাধ্য।
এই কারণেই উত্তেজনাপূর্ণ প্রকল্প ও বিদেশি সামরিক জোটের সঙ্গে দেশটির ভবিষ্যৎ বেঁধে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে ইউএই–এর জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। চল্লিশ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে কোনো বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে বিপর্যস্ত করতে পারে—যেসব খাতই ইউএই–এর শক্তির মূল ভিত্তি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করেছে যে পশ্চিম এশিয়ায় আসল শক্তি কেবল অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বা বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে আসে না। জাতীয় ইচ্ছাশক্তি, নিজস্ব সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং বাহ্যিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা এখনও শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা বড় শক্তির সমর্থন—এসব ভিত্তিক অনেক হিসাব–নিকাশ এই যুদ্ধে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
ইউএই–এর জন্য এই বাস্তবতা একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। যে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা মূলত তার চারপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল, সে অনির্দিষ্টকাল ধরে সংঘাতমুখর নীতি চালিয়ে যেতে পারে না। আবুধাবির নীতি ও অঞ্চলের ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান যত বাড়বে, সেই ব্যবধানের মূল্যও তত বেশি বাড়বে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউএই–এর বৈদেশিক নীতির কিছু দিক পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেখা গেছে। কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর প্রচেষ্টা এই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে চল্লিশ দিনের যুদ্ধ দেখিয়েছে যে এই প্রক্রিয়াকে আরও গভীর ও জোরালো হতে হবে।
পারস্য উপসাগরে টেকসই নিরাপত্তা বিদেশি জোটের মাধ্যমে নয়, বরং অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে বহিরাগত শক্তির উপস্থিতি সাধারণত সংকট কমানোর বদলে আরও জটিল করে তুলেছে। যখনই আঞ্চলিক দেশগুলো সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের পার্থক্য মেটাতে সক্ষম হয়েছে, তখন স্থিতিশীলতা বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, ইউএই–এর জন্য এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিরাপত্তা কেনা যায় না। কোনো অস্ত্র চুক্তি, নিরাপত্তা চুক্তি বা বিদেশি সমর্থন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। যে রাষ্ট্রগুলো কৃত্রিম ভারসাম্যের ওপর নিজেদের নিরাপত্তা গড়ে তোলে, তারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে গুরুতর দুর্বলতার মুখে পড়ে।
আজ আবুধাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে। প্রথম পথটি হলো এমন নীতি অব্যাহত রাখা যা তাকে বহিরাগত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যয়বহুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলে। দ্বিতীয় পথটি হলো আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়া, ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান জানানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলা।
চল্লিশ দিনের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ বহিরাগত শক্তি নয়, অঞ্চলের জনগণই নির্ধারণ করবে। যে কোনো দেশ যত দ্রুত এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, তার দিতে হবে তত কম মূল্য, আর সে পাবে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার তত বেশি সুযোগ। ইউএই–এর জন্য সম্ভবত এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বার্তা এটি: এই অঞ্চলে টেকসই অবস্থান অর্জন করতে হলে দূরের রাজধানীতে নির্ধারিত প্রকল্পের অনুগামী না হয়ে বরং সহযোগিতা ও সমম্বয়ের পথে হাঁটতে হয়।
আবুধাবির শাসকেরা যদি এই বার্তাটি গুরুত্ব সহকারে নেন, তাহলে চল্লিশ দিনের যুদ্ধ হতে পারে তাদের বৈদেশিক নীতির কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের সূচনা বিন্দু—যা কেবল ইউএই–এর জন্যই নয়, সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবে।
আপনার কমেন্ট